দু’দলেই হেভিওয়েট প্রার্থী

শেষের পাতা

আসলাম-উদ-দৌলা, রাজশাহী থেকে | ২০ আগস্ট ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৫১
রাজশাহী বিভাগে রাজনৈতিক অংকের হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজশাহী-১ আসনটি। তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসন। চার জাতীয় নেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামরুজ্জামান হেনা এ আসনেরই এমপি ছিলেন। বর্তমান সংসদ সদস্য হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে পরিচিত জেলা আওয়ামী লীগের দু’বারের সভাপতি সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুক চৌধুরী, বিএনপিতে ডাকসাইটে নেতা কেন্দ্রীয় ভাইস-চেয়ারম্যান সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক। জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমানও এক সময় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরিসংখ্যান যা-ই বলুক হেভিওয়েট প্রার্থীর বিপরীতে মনোনয়ন দৌড়ে যারা আছেন তাদের পাটাতনও শক্ত। তারা কোনোভাবে ছাড় দিতে চান না। গত নির্বাচনেও এসব প্রার্থীদের মনোনয়ন দৌড়ে সরব ভূমিকায় দেখা গেছে।
সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী। মানবজমিনকে জানান, ‘অন্যান্য সংসদীয় আসনের চেয়ে তুলনামূলকভাবে তিনিই এলাকায় বেশি সময় কাটান। সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার সময়ে প্রচুর উন্নয়ন কাজ হয়েছে। যার সুফল আওয়ামী লীগের ঘরে যাবে। বিগত ১৫ বছরে বিএনপি’র ব্যারিস্টার আমিনুল হক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে যেসব কাজ করেছেন তিনি সাড়ে ৮ বছরে তারচেয়ে অনেক বেশি উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছেন। এলজিআরডি, রোডস্‌ অ্যান্ড হাইওয়ে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রাণালয়ের কাজের হিসাব নিলেই তা ফুটে ওঠবে। বর্তমানে প্রচুর উন্নয়মূলক প্রকল্প চলমান। সামনের দিনে তা দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।’         
ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, অদ্যাবধি সাড়ে ৪০০ কিলোমিটার পাকা রাস্তা হয়েছে। ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার করা হয়েছে। আরো ৪০০ কিলোমিটার রাস্তা করতে হবে। শিক্ষার দিকে অনেক উন্নতি করেছি। আগামী নির্বাচনে ব্যারিস্টার আমিনুল হক তার শক্ত প্রতিপক্ষ নন উল্লেখ করে বলেন, ‘আমিনুল হক বাংলা ভাইয়ের সহযোগী ছিলেন। মামলায় ৪৫ বছরের সাজা হয়েছে। সে হিসাবে আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার কোনো যোগ্যতা তার নেই। বিএনপিও তাকে মনোনয়ন দেবে বলে মনে হয় না।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই ওমর ফারুক চৌধুরীর বিপরীতে মাঠে আছেন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজি মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান। এবারও নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় তিনি নিজপক্ষের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করছেন। সমপ্রতি তানোর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেছেন। গত ২৬শে মার্চ গোদাগাড়ী উপজেলা সদরে বর্তমান এমপি’র সামনেই তার বলয়ের নেতাকর্মীকে নিয়ে বিশাল শোডাউন দিয়েছেন মতিউর রহমান। আওয়ামী লীগ প্রীতির কারণে ২০০১ সালে তিনি চাকরিচ্যুত হন। ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জেলা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার দল তাকে মনোনয়ন দেবে বলে আশা করছেন মতিউর রহমান। এছাড়া নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা রাজশাহী জেলার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাতীয় পরিষদ সদস্য আতাউর রহমান খান, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মকবুল খান ও তানোর আওয়ামী লীগ সভাপতি মুণ্ডমালার পৌর মেয়র গোলাম রাব্বানী।
গোদাগাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম বলেন, ‘বর্তমান সংসদ সদস্য দলকে সংগঠিত করতে পারেননি। এখনো গোদাগাড়ী উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেননি। নেতাকর্মীদের সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি করে রেখেছেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা পরিবর্তন চান।’ একই কথা বলেন ঋষিকুল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মখলেসুর রহমান মুকুল।
এক সময় রাজশাহী-১ আওয়ামী লীগের আসন থাকলেও তা বিএনপি’র শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত হয়ে ওঠে। জামায়াতের শক্ত একটা ভোট ব্যাংক আছে আসনটিতে। আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী এডভোকেট এহাসিন, আলাল উদ্দিন বিএনপি প্রার্থীর কাছে পরাজয় বরণ করেন। ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় নির্বাচনে সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক টানা তৃতীয় বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে তার বড় ভাই সাবেক আইজিপি ড. এনামুল হক নির্বাচনের মাঠে নামেন। সে সময় মহাজোট সরকারের গণজোয়ারের মধ্যেও প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার ভোটারের এই আসনে মাত্র ১৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে বর্তমান সংসদ সদস্য ওমর ফরুক চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন ড. এনামুল।
তবে সম্ভাবনার কথা জানিয়ে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ইয়াসির আরাফাত সৈকত বলেন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, থোক বরাদ্দ থেকে মসজিদ-মাদ্‌রাসায় পর্যাপ্ত সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যা ভালো ফলাফল বয়ে আনে। এই আসনের ৪টি পৌরসভার মধ্যে ৩টিতেই আওয়ামী লীগের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। বড় ভোট ব্যাংক হিসেবে আদিবাসীদের ৪০ হাজার ভোট রয়েছে, যার দুই তৃতীয়াংশ আওয়ামী লীগের ঘরে আসে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করা গেলে আবারো এই আসনটি জননেত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দেয়া যাবে।
এদিকে ব্যারিস্টার আমিনুলের দীর্ঘদিনের সাজানো মাঠের দখল নিতে মনোনয়ন দৌড়ে নেমেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা সাবেক সচিব এসএম জহুরুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাবেক যুগ্ম-সচিব গোলাম মর্তুজা, জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান মার্কনী ও প্রবাসী বিএনপি নেতা অধ্যাপক শাহাদাৎ হোসেন শাহীন। এদের মধ্যে সাবেক সচিব জহুরুল ইসলাম এবং সাবেক যুগ্ম-সচিব গোলাম মর্তুজা ওয়ান-ইলেভেনের সময় দলের দুর্দিনে নেতাকর্মীদের দমন-পীড়ন থেকে রক্ষা করেছিলেন। যার কারণে তারা নেত্রীর গুড বুকে আছেন। নির্বাচনী এলাকার অলিতে-গলিতে পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন প্রবাসী নেতা অধ্যাপক শাহাদাৎ হোসেন শাহীন। আরেক প্রার্থী সাজেদুর রহমান মার্কনী ব্যারিস্টার বিরোধী লবি বলে পরিচিত নেতাকর্মীদের নিয়ে তৃণমূলে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। বিপরীতে মাঠের দখল ধরে রাখতে ব্যারিস্টার আমিনুল হক প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নেতাকর্মী নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ঈদকে সামনে রেখে সে প্রচারণা আরো বেগমান করেন।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন মানবজমিনকে বলেন, বড় দলে কিছু মতপার্থক্য থাকে। এটা জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তানোর-গোদাগাড়ী উপজেলায় ব্যারিস্টার আমিনুল হক ব্যাপক উন্নয়মূলক কাজ করেছেন। যার ধারে কাছেও যেতে পারেননি বতর্মান সরকার দলীয় সংসদ সদস্য। ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারলেও কথা ছিলো। এই আসন থেকে ব্যারিস্টার আমিনুল হকই মনোনয়ন পাবেন বলে তৃণমূল বিশ্বাস করে। অন্য যেসব প্রার্থী রয়েছেন তারা কেউ জনসম্পৃক্ত না। তাদের দৌড় ডাইনিং রুম পর্যন্ত। ওয়ান- ইলেভেনের যে কথা বলা হয়, সে সময় ব্যারিস্টার আমিনুল বিএনপি’র বড় নেতা হিসেবে প্রেসারের ভেতর ছিলেন। তার সে অর্থে ভূমিকা নেয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না। আর বাংলাভাই ইস্যুতে যে ধুয়াটা আওয়ামী লীগ তুলছে তা ধোপে টিকবে না। রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে ওই মামলায় তাকে জড়ানো হয়েছে।

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন