রায়ে ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ১৪ আগস্ট ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:০৮
ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে ইতিহাস বিকৃতি ঘটেছে দাবি করে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক জানিয়েছেন অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যগুলো এক্সপাঞ্জের জন্য রিভিউ করা হবে। প্রধান বিচারপতি অসদাচরণ করেছেন কিনা সেটা খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে। সেই সঙ্গে দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং আইন বিভাগের মধ্য আলাপ-আলোচনা চলতে পারে। আলোচনার দরোজা কখনো বন্ধ হবে না। তবে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে দেশে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি জানান, হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য আইন করা হচ্ছে।
শেষ পর্যায়ে রয়েছে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার প্রক্রিয়া। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি আয়োজিত মিট দ্য রিপোর্টার্স-এ অংশ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে ‘এক ব্যক্তির নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি’ এমন বক্তব্যের কারণে সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্বের মধ্যদিয়ে কোনো সাংবিধানিক জটিলতা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, এখানে বঙ্গবন্ধু শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, তবে কোনো একক ব্যক্তির নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি বলে কথাটি আছে। ‘প্রথম কথা হচ্ছে এই মামলায় এটা অপ্রাসঙ্গিক। দ্বিতীয়ত, এটা ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তৃতীয়ত, এটা ইতিহাস বিকৃত করার সমান।’ মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জনগণের কাছে দিবালোকের মতো সত্য যে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে। তিনি জাতির পিতা। কোন দল কি বলল সেটা গৌণ, আমার কাছে মুখ্য হচ্ছে সত্য। তিনি বলেন, ষোড়শ সংশোধনীর মূল বিষয়টি হচ্ছে, বিচারকদের অপসারণ সংক্রান্ত। ১৯৭৩ সালের আইনে দুইটি কারণ উল্লেখ করা ছিল- প্রমাণিত অসদাচরণ ও অসমর্থ হওয়া। কে তাদের অপসারণ করবে এ নিয়ে বলা হয়েছিল সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে এটা হবে। পদ্ধতিটা আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে। সুপ্রিম কোর্টেরও একটি প্রক্রিয়া ছিল। তবে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে সাংবিধানিক সংকটের কোনো সুযোগই নেই। রায়ে ইতিহাস বিকৃতি হলে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হবে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং মুক্তিযুদ্ধ তার নেতৃত্বেই হয়েছে। এটা নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই। তবে অসদাচরণের ডেফিনেশন এখনও নেই। অসদাচরণ বা অন্য কিছু হয়েছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা হবে। এটার অথরিটি হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। সরকার ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের রিভিউ করবে কিনা এবং এ নিয়ে মন্ত্রীদের বক্তব্যে আদালত অবমাননার ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, রায়টি ৭৯৯ পাতার। রিভিও করতে গেলে পড়ে পয়েন্টগুলো বের করে রিভিউ করতে হবে। কোন কোন বিষয় রিভিউ করা হবে সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ শনাক্ত করা হচ্ছে। এর জন্য কিছু সময় প্রয়োজন। এ জন্য রায়টি বিষদভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অপ্রাসঙ্গিক কথাগুলো এক্সপাঞ্জ করার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কোনো রায়ের কোনো শব্দ বা মন্তব্য সরাসরি এক্সপাঞ্জের সুযোগ নেই। এক্সপাঞ্জ করার আবেদন করতে হয় এবং তা রিভিউ আবেদনের সঙ্গে করতে হয়। সেটাই করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, অটো রিভাইব নিয়ে দ্বিমত আছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী একটি গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অটোমেটিক্যালি রিভাইভ হয় না। আইন কমিশন চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকও বলেছেন, অটোমেটিক্যালি রিভাইব হয় না। সংসদের অধিকার আইন বানানো, তাদের আইন অটো রিভাইব হয় না। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রধান বিচারপতির ভূমিকা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়টি সরকার খতিয়ে দেখবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, জুডিশিয়াল, লেজিসলেটিভ এবং এক্সকিউটিভ- এই তিনটি বিভাগ হচ্ছে রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রেসিডেন্ট, প্রধান বিচারপতি, স্পিকারের কার্যালয় এক একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে ব্যক্তি গৌণ কিন্তু চেয়ার মুখ্য। চেয়ারটার ব্যাপারে আমাদের শ্রদ্ধা থাকতে হবে। তাই আমাদের চারপাশের অনেক বিষয়ে চোখ বন্ধ রাখতে হবে। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর ওবায়দুল কাদেরের বৈঠকের ব্যাপারে আনিসুল হক বলেন, এখনো সাক্ষাতের বিষয়বস্তু জানি না। তবে এটা ঠিক যে বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং আইন বিভাগের মধ্য আলাপ-আলোচনা চলতে পারে। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাবে সরকার। পথ চলতে গেলে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। সেটা সমাধানের জন্য শেখ হাসিনার সরকার কাজ করবে। আলোচনার দরোজা কখনো বন্ধ হবে না। আর ইতিহাস বিকৃতি যদি হয়ে থাকে তাহলে তা ধরিয়ে দেয়ার অধিকার কি নেই। কারও মনে আঘাত লাগতে পারে। তিনি কথা বললে তো গ্রহণ করতে হবে। ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে আইনজীবীদের দুইটি কর্মসূচির কারণে বিচার কার্যক্রমে সমস্যা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, এ ঘটনাগুলো কাঙ্ক্ষিত নয়। কিন্তু রায়ে উল্লিখিত কিছু বক্তব্যও প্রাসঙ্গিক ছিল না। রায়ে ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে। তবে আমি মনে করি, প্রতিবাদ করার অধিকার সবার আছে। বিচারিক কাজে বাধা না হলে অবশ্যই প্রতিবাদ হতে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রধান বিচারপতির চেয়ার কিন্তু প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিনির্ভর নয়। এ ব্যাপারে সবার সতর্ক হওয়া উচিত। এখন আবেগ তুঙ্গে অবস্থান করছে। শিগগিরই এটা প্রশমিত হবে। গেজেট প্রণয়ন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ নিয়ে একটি বৈঠকের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু সেদিন আমি অসুস্থ ছিলাম। শুনেছি, অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপও করা হয়েছে। তারপরও আমরা সবখানেই আলোচনা চালিয়ে যাবো। কিন্তু সংবিধানের বাইরে কিছু করতে পারবো না। হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে কোনো আইন করা হবে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, এ ব্যাপারে আইন হবে। এখন ড্রাফট হচ্ছে। বহুল আলোচিত ৫৭ ধারা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, এ ধারা নিয়ে আপনাদের মতের সঙ্গে আমার কিছুটা ভিন্নতা আছে। অন্যদিকে দেখে আপনারা কথা বলছেন। ১৯ ধারা যেটা হচ্ছে সেটা দেখেন, দেখবেন সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু হবে না। তবে ৫৭ ধারা থাকবে কিনা সেটা এ মাসের মধ্যেই জানতে পারবেন। গণমাধ্যমের জন্য বিদ্যমান আইনের সংস্কার না করে নতুন নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রচলিত আইনে অনেক অপরাধের বিচারে সীমাবদ্ধতা আছে। এ আইন দিয়ে সাইবার ক্রাইম কমব্যাট করা যায় না। সাইবার ক্রাইম কমব্যাট করার জন্য প্রচলিত আইন যথেষ্ট নয়। সাংবাদিকদের নবম ওয়েজ বোর্ড নিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, আমি ওয়েজ বোর্ডের বিষয়গুলো বুঝি না। তবে আপনাদের দাবি-দাওয়া জানানোর জন্য অবশ্যই প্ল্যাটফর্ম করে দেব। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যটি ফেলে দেয়ার মতো নয়। তার সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই কথা বলবো। আপনারা যদি ন্যায্য দাবি করে থাকেন তাহলে বিনা ফিতে দুটি কেন দশটি কথা বলবো। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে আনিসুল হক বলেন, আপনারা জানেন- বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কিন্তু একটি এফআইআরও হয়নি। বিচারের জন্য ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে, তদন্ত হচ্ছে। কিছু মামলা আছে সহজ, কিছু মামলা আছে কঠিন। সাগর-রুনীর মামলাটির তদন্ত কঠিন। এখন তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি বিচারিক আদালতে আসবে না। তবে বিশ্বাস রাখতে পারেন, এ মামলার তদন্ত শেষ হবে, বিচারও হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা ও ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচারের অগ্রগতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার সব প্রচেষ্টা ও প্রক্রিয়া চলমান। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমরা দুইজনের কথা জানি, রাশেদ চৌধুরী আমেরিকায় ও নুর চৌধুরী কানাডায় সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়ায় হেরেছেন। কিন্তু তারা সেখানে বলেছেন, দেশে ফিরলে তাদের ফাঁসি দেয়া হবে। মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত বিষয়ে কানাডার আইনগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের ফিরিয়ে আনতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে আমরা এ নিয়ে কাজ করছি। আর ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে। তবে সাবজুডিশ বিষয়ে এর বেশি কিছু বলবো না। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মুরসালিন নোমানীর পরিচালনায় মিট দ্য রিপোর্টার্সে সাংবাদিকদের ১৬টি প্রশ্নের সব উত্তর দেন আইনমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে সংগঠনের অর্থ সম্পাদক মানিক মুনতাসির, নারীবিষয়ক সম্পাদক দিনার সুলতানা, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক কাফি কামাল, কল্যাণ সম্পাদক আজাদ হোসেন সুমন, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হাবীবুর রহমান, সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে একই সাথে খুশি করা ভারতের জন্য কি কূটনীতির পরীক্ষা?

বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠক শুরু

রাজধানীতে ছাত্রদলের মিছিলে হামলা, আহত ৩

যশোরে জঙ্গি সন্দেহে বাড়ি ঘিরে রেখেছে পুলিশ

সুষমা কেন সহায়ক সরকারের কথা বলতে যাবেন: কাদের

আপস না করায় খালেদার বিরুদ্ধে ৩৯ মামলা: ফখরুল

আত্মবিশ্বাস থাকলে যে কোন কঠিন কাজ করা যায়: জয়

আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

৪ ঘণ্টায় হাজার মণ ইলিশ বিক্রি

সংবিধান বিরোধীদের নিবন্ধন বাতিলের দাবি

প্রতিবন্ধী স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা

‘রোহিঙ্গা নিধনে পরিকল্পিত নির্যাতন চালিয়েছে মিয়ানমার’

রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতীয় নীতি

অবস্থান পাল্টালো টিএসসি কর্তৃপক্ষ

রাখাইনে ১৭৭০ কোটি কিয়াতের বিশাল কর্মপরিকল্পনা

কেন উত্তরাধিকার বেছে নেবেন না শি জিনপিং?