ছুটির দিনে পঙ্গুতে দালাল দৌরাত্ম্য

এক্সক্লুসিভ

স্টাফ রিপোর্টার | ১৩ আগস্ট ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:০৯
সরকারি ছুটির দিন মানে ওদের খুশির দিন। তাই ছুটির দিনের অপেক্ষায় থাকে তারা। ওই দিন ভিড় জমায় হাসপাতালে। ডাক্তার না থাকার সুযোগকে কাজে লাগাতে রোগী এলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ওরা দালাল। রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্লিনিক।
বিশেষ করে পঙ্গু হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে ওঠা এসব ক্লিনিক চেয়ে থাকে এই হাসপাতালের দিকে। তাই ক্লিনিকগুলো কমিশনের বিনিময়ে নিয়োগ দিয়েছে দালাল। পুরুষের পাশাপাশি কোনো কোনো ক্লিনিক মহিলা দালালও রেখেছে। অন্যদিকে হাসপাতালে ভর্তি ও সিট পাইয়ে দেয়ার নামে দালালতো রয়েছেই। আর এসব দালাল প্রতিদিনই পঙ্গু হাসপাতালের প্রধান ফটকে ওত পেতে থাকে। তবে সরকারি ছুটি শুক্রবার তাদের জন্য সুযোগের দিন। এদিন রোগী এলে ডাক্তার না থাকায় তারা সহজেই পেয়ে যান রোগী। লোভনীয় অফার, সহজেই ভালো হয়ে যাওয়ার গ্যারান্টি, কম খরচে চিকিৎসার কথা বলে রোগী টানে তারা। এমন দৃশ্য দেখা গেছে সরজমিন। শুক্রবার বেলা ১১টা। রাজশাহী থেকে রোগী নিয়ে পঙ্গু হাসপাতালে এসেছেন খোরশেদ আলম। ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনে যেতেই এগিয়ে আসেন একজন মহিলা দালাল। অভয় দিয়ে বলেন, আপনার চিন্তা করা লাগবে না। যা করার আমি কইরা দিমু। তবে আগে টিকিট কাইটা লন। তারপর দেখছি। শুধু আমাকে একটু খুশি কইরেন। অপর এক দালাল বিল্লাল হোসেন। রোগীর অভিভাবক সেজে কথা বললে দালাল প্রথমে জানতে চান, রোগী কোথায়। রাস্তায় আছে জানালে বলেন, আগে আসুক। আপনার কিছু করা লাগবে না। সবই আমি করে দিবো। কোথায় কোন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে তা আমি দেখবো। প্রতিদিন জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) ইমার্জেন্সি বিভাগে আসা রোগীদের জন্য এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে শতশত দালাল। বিশেষ করে ছুটির দিনে হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার অনুপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সহযোগিতার নাম করে ওত পেতে থাকা ওয়ার্ড বয় ও মহিলারা রোগীর স্বজনদের থেকে হাতিয়ে নেন হাজার হাজার টাকা।
রাজশাহী থেকে আসা হাড় ভাঙা রোগীর অভিভাবক খোরশেদ আলম মানবজমিনকে বলেন, রোগীকে ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে। কোথায় গিয়ে কিভাবে কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তখন এক মহিলা আমাকে সহযোগিতার কথা বলেছেন। তবে বিনিময়ে খুশি করতে বলেছেন। আরেক রোগী রমজান এসেছেন পা ভেঙে। তিনি কদিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। কুড়িগ্রামের রমজানকে নিয়ে এসেছেন তার ভাই আমিন। হাসপাতালের গেইটে আসতেই ঘিরে ধরে দালালরা। দীর্ঘ আলোচনার পর এক দালাল হাসিমুখে তাদের নিয়ে চলে যান প্রাইভেট ক্লিনিকে। এভাবে প্রতিদিন রোগীরা হচ্ছেন ঘায়েল। হাসপাতালের অভ্যন্তরে গিয়ে দেখা গেছে শত শত দুর্ঘটনার শিকার রোগী বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন। তাদের কারো কারো চিৎকারে বাতাস ভারি হলেও নার্স কিংবা অন্য কেউ এগিয়ে আসছেন না। একজন নার্স এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা স্বাভাবিক। রোগীরা জানান, সপ্তাহের যে কোনো দুইদিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের দেখা পান। বাকি দিনগুলো নার্স ও আয়া বা ওয়ার্ড বয়ের উপর নির্ভর করতে হয়। রোগীদের অনেকেই অভিযোগ করেন জরুরি বিভাগে রোগীদের সব ওষুধ ফ্রি দেয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হয় না। ঢাকার জিরানী থেকে আসা রোগীর অভিভাবক আবদুল বাছেদ মানবজমিনকে জানান, আমার বাচ্চা মেয়ের হাত ভেঙেছে। ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ায় ইমার্জেন্সি বিভাগে ভর্তি নেয়নি। বলেছে, শুক্রবার তাই আউটডোরে দেখাতে হবে। তবে বিল্লাল হোসেন নামের এক দালাল এসে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পঙ্গু হাসপাতালেরই বড় ডাক্তারদের মাধ্যমে চিকিৎসা করানোর প্রস্তাব দিয়েছে। পরে বাচ্চার চিকিৎসার কথা ভেবে তার কথায় রাজি হয়েছি।
ইমার্জেন্সি বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, একজন ডাক্তার চিকিৎসা দিচ্ছেন। সঙ্গে রয়েছেন  একজন সহকারী। রোগীদের ওষুধ, ব্যান্ডেজ বাঁধার কাজে রয়েছেন কয়েকজন চিকিৎসাকর্মী। তবে কাউন্টার  থেকে টিকিট কেটে একের পর এক রোগী ভর্তি হলেও জরুরি বিভাগের ওয়ার্ডে হাতেগোনা কয়েকজন ভর্তি রোগী ছাড়া বাকি আসন ছিল ফাঁকা। কাউন্টারে দায়িত্বরত ঊর্ধ্বতন একজন নার্স বলেন, ছুটির দিনসহ সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন সারা দেশ থেকে ১৫০ থেকে ১৭০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসে জরুরি বিভাগে। অনুসন্ধানে জানা যায়, জরুরি বিভাগে যারা চিকিৎসার জন্য আসেন তাদের অধিকাংশ জটিল ও কঠিন হাড় ভাঙার রোগী। রোগী ভর্তির পর্যাপ্ত আসন না থাকায় অনেককেই ফিরিয়ে দিতে হয়। এ সুযোগটিও নেয় দালালরা। শুক্রবার বহির্বিভাগ বন্ধ থাকায় কিছু রোগী জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে যাচ্ছেন। তাদের বেশির ভাগ রোগীকে দালালরা ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পঙ্গু হাসপাতালেরই বড় বড় ডাক্তারের কথা বলে ক্লিনিকে। দ্বিতীয় তলায় পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ইকবাল হোসেন সুস্থতার ব্যাপারে হতাশ হয়ে বলেন, শুক্রবার কোনো ডাক্তার নাই। এমনকি সপ্তাহে মাত্র দু’দিন বড় ডাক্তার দেখতে আসলেও বাকি দিনে ডাক্তারের চেহারা দেখতে পাই না। এভাবে প্রায় একমাস ধরে বিছানায় শুয়ে আছি। অপারেশন কবে হবে তাও জানি না। তার পাশেই কোমর ভাঙা অবস্থায় শুয়ে আছেন লক্ষ্মীপুরের আলম মিয়া। মানবজমিনকে তিনি জানান, সরকারি হাসপাতাল থেকে সব ধরনের ওষুধ পাওয়ার কথা থাকলেও এখানে কিনতে হচ্ছে বাইরের ফার্মেসি থেকে। এমনকি গোটা সাতদিনের দুইদিনে কিছু সময়ের জন্য ডাক্তার আসলেও চিকিৎসায় কোনো অগ্রগতি বুঝতে পারছি না। প্রতিদিন ওষুধ ক্রয় ও সিট ভাড়ায় অনেক টাকা খরচ হচ্ছে বলে তার অভিযোগ। নিচ তলায় অনুসন্ধান কক্ষের পাশে মহিলা ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, হাত ভাঙা ১০ বছরের আছিয়ার মাথা বুলিয়ে দিচ্ছেন তার মা-বাবা। মানবজমিনের কাছে তাদের অভিযোগ, হালকা কিছু ওষুধ হাসপাতাল থেকে দিলেও সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এদিকে বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে ওয়ার্ডে কর্মরত নার্স বলেন, দুইদিন ছাড়া বাকি দিনগুলোতে  ডাক্তার না আসলেও ফোন দিলে রোগী দেখতে আসেন বড় ডাক্তার। হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে ইমার্জেন্সিতে রেডিওলজি বিভাগের এক অধ্যাপক হাসপাতালে দালালদের আনাগোনা স্বীকার করে বলেন,  বহির্বিভাগ থেকে আগত এই দালালের হার ১ থেকে ২ শতাংশ। তবে এ হার খুব কম বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

বিজয় দিবসে দেশ গড়ার দৃপ্ত শপথ

বঙ্গবন্ধুর গৃহবন্দি পরিবারকে যেভাবে উদ্ধার করেছিলেন কর্নেল তারা

থ্যাংক ইউ জেনারেল, উই আর অলরেডি বার্নিং, ডোন্ট অফার আস ফায়ার

রাহুল গান্ধীর অভিষেক

চাল-পিয়াজের দামে অসহায় ক্রেতারা

সিলেটে চার বন্ধুর একসঙ্গে বিদায়

রহস্য ভূমিকায় জামায়াত

শোকে মলিন চট্টলা

কিশোরগঞ্জে ২ সাংবাদিক ও বান্দরবানে ৪ পুলিশকে পেটালো ছাত্রলীগ

জৈন্তাপুরে লিয়াকত আলীই এখন শেষকথা

রাজধানীতে আওয়ামী লীগের বর্ণাঢ্য র‌্যালি

বড় দু’দলেই একাধিক প্রার্থী

ছায়েদুল হকের জন্য কাঁদছে নাসিরনগর

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ

উৎসবের আমেজে সারাদেশ