স্মার্টকার্ড তৈরিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠান, ওবার্থুর বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত

শেষের পাতা

সিরাজুস সালেকিন | ১২ আগস্ট ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:০৮
 ফ্রান্সের ওবার্র্থু টেকনোলজি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতায় ডুবেছে স্মার্টকার্ড প্রকল্প। কয়েকদফা সময় বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানটিকে সব ধরনের সহায়তার পরও ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি সংস্থাটি। যে কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কয়েকশ’ কোটি টাকা। চুক্তি লঙ্ঘন, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন, প্রতিষ্ঠানকে ইমেজ সংকটে ফেলে দেয়া এবং আর্থিক ক্ষতি, এই চার কারণে ওবার্থু সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের পর আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইডিয়া   
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। সরকারি অর্থায়নে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নাগরিকদের হাতে এটি পৌঁছে দিতে ২৪ ঘণ্টা তিন শিফটে কাজ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এর জন্য আরো ৭০-৮০ জন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োগ করা হবে। প্রকল্পের মেয়াদ আসছে ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও স্মাটকার্ড প্রিন্ট আপাতত বন্ধ থাকার কারণে সেটি আগামী বছরের জুন-জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। আর নির্বাচন  কমিশনের (ইসি) অধীনে আসন্ন ঈদুল আজহা’র পর পুরোদমে এই কাজটি শুরু হবে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় নিবন্ধন অনুবিভাগের ডিজি এবং আইডিয়া প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, ওবার্থু চুক্তি লঙ্ঘন করেছে, ব্যর্থতা আছে। সবকিছু মিলিয়ে এখন পর্যন্ত কাজ স্মার্ট প্রিন্ট (পারসোনাইলেজেশন) হয়েছে মাত্র ১২.৪১ শতাংশ। তাদের যে ব্যর্থতা কোন ভাবেই ওবার্থুকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। চুক্তি ভঙ্গের কারণে রাষ্ট্রের সঙ্গে যে প্রতারণা করেছে সেজন্য তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে যেখানে যাওয়া দরকার সেখানে যাওয়া হবে। তবে, প্রতিষ্ঠানটি যদি সহজে আসে তাহলে সহজে মীমাংসা হবে এবং তারা যদি জটিল পথে যায় তখন প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা। ডিজি বলেন, স্মার্টকার্ড পারসোনাইজেশনসহ সমস্ত কাজ এখন দেশেই করা হবে। এর জন্য কাজটি যেভাবে করা যায় সেভাবেই আমরা অগ্রসর হচ্ছি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্মার্টকার্ড প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয় ১৩৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্মার্টকার্ড মুদ্রণ থেকে বিতরণ পর্যন্ত হিসাব ধরেই অর্থ বরাদ্দ করা হয়। আর ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান ওবার্থু টেকনোলজির সঙ্গে চুক্তি করা হয় ব্লাংক কার্ড উৎপাদন, সাপ্লাই এবং মুদ্রণ ও বিতরণে চুক্তি হয় ৮০৯টি কোটি টাকার। ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি চুক্তি অনুযায়ী দেড় বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৬ সালের ৩০শে জুলাইয়ের মধ্যে ফ্রান্সের ভিতথ্রি থেকে ৯ কোটি কার্ড উৎপাদন করে বাংলাদেশে আমদানিকরণ, ইসি’র পারসো সেন্টারে মুদ্রণ করে উপজেলা-থানা পর্যায়ে বিতরণ করা এবং সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের এ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান ও ডকুমেন্টেশন হস্তান্তর করা।
কিন্তু ওবার্থু কার্যক্রম সম্পাদনে বিভিন্ন সমস্যা, অজুহাত উপস্থাপন করতে থাকে। একপর্যায়ে কার্ডের হলোগ্রাম সমস্যার জন্য দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে এবং ২য় পক্ষের সঙ্গে চুক্তির নামে প্রকল্পের অনুমোদন গ্রহণ করে। চুক্তির মেয়াদের দেড় বছরে  ৯ কোটির মধ্যে ৩.১৪৪ মিলিয়ন যার হার ছিল মাত্র ৩.৪৯ শতাংশ, ব্লাংক কার্ড উৎপাদন ও সাপ্লাই বাকি ৯৬.৫০ শতাংশ যা পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। একই ভাবে, কার্ড মুদ্রণ হয় ১.৫১ শতাংশ। এক্ষেত্রেও ব্যর্থতা ৯৮.৪৯ শতাংশ এবং উপজেলা-থানা পর্যায়ে বিতরণ হয় মাত্র ১.১৩ শতাংশ এবং ব্যর্থতা ছিল সংস্থার ৯৮.৮৭ শতাংশ।
এতো ব্যর্থতার পরও  ফ্রান্সের ভিতথ্রি হতে ব্লাংক কার্ড উৎপাদন করে সাপ্লাই করা যথা সময়ে সম্ভব হবে না- এ অভিযোগ  হাজির করে আরও ১ বছর মেয়াদ বাড়িয়ে সময় নির্ধারণ হয় গত ৩০শে জুন ’১৭। হলোগ্রাম সমস্যার জন্য কার্ড উৎপাদন বন্ধ থাকায় যথাসময়ে কার্ড উৎপাদন ও পারসোনালাইজেশন নিশ্চিত করার স্বার্থে ফ্রান্সের ভিতথ্রির পাশাপাশি চীনের শেনজে-কে কার্ড উৎপাদনের অনুমতি দেয়া হয়।
কিন্তু প্রকল্প কর্তৃক সকল প্রকার সহযোগিতা করার পরও ওবার্থুর টেকনোলজি প্রকল্প শেষ করায় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি তাদের অপেশাদার আচরণের কারণে পরবর্তী মেয়াদ বাড়ানোর পরও গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মুদ্রণ বন্ধ ছিল। এতে মেশিনের উৎপাদন ক্ষমতা কমে মধ্য এপ্রিলে ৩টি মেশিনে নেমে আসে।
প্রকল্পের এই নাজুক অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে ইসি। পরিস্থিতি উত্তরণে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সিইসির সভাপতিত্বে কমিশন সচিব ও আইডিয়া প্রকল্প পরিচালক বৈঠক করে। পরবর্তীতে ২১শে এপ্রিলে সিইসি ওবার্থুর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আরেকটি বৈঠক করেন। সেখানেও রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের পর আরও কিছু পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার করে সংস্থাটি যার মধ্যে ১০টি মেশিনে সর্বোচ্চ থ্রু পুট করা, অতিরিক্ত ১৫টি মেশিন আনা, অন সাইট সাপোর্ট সার্ভিস নিশ্চিত করা, মেইনটেইনেন্স টিম ও ইকুইপমেন্ট সরবরাহ, ৩টি শিফট চালু ও অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং ট্রেনিং ডকুমেন্টেশন সম্পন্ন করা।  ইসি’র কাছে সংস্থাটির অঙ্গীকার ছিল গত ৩০ জুন তারিখের মধ্যে কাজ শেষ করা। এর আগে সংস্থাটিকে ১৫টি নোটিশ ও তাগিদপত্র দেয়া হলেও কোনটিই আমলে নেয়নি। আর প্রতিশ্রুত ১৫টি মেশিনের বদলে ৮টি আমদানির কথা থাকলেও সেটা পূরণ করেনি।
উল্টো ওবার্থু ই-মেইলের মাধ্যমে গত ১৩ মে’১৭ তারিখে ইসি’র তথ্য ভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার ও অডিট করার বিষয়ে আগ্রহ দেখায় এবং পুনরায় চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর তাগিদ জানায়। ফলে ৩০ জুন তারিখের মধ্যে কার্যকরী উন্নতি না করায় ওই সময়ই চুক্তি শেষ হয়।
 দেখা গেছে, সর্বশেষ বাড়ানো ১ বছর মেয়াদের মধ্যে কোন উন্নতি ঘটেনি বরং অবনতির চিত্রই ফুটে উঠে। গত ৩০শে জুন পর্যন্ত স্মার্টকার্ড বাস্তবায়নের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্ল্যাংক কার্ড উৎপাদন ও সাপ্লাইয়ের পরিমাণ ছিল ৬৬.৩৬ মিলিয়ন। অগ্রগতির হার ৭৩.৭৪, ব্ল্যাংক কার্ড উৎপাদন ও সাপ্লাই বাকি ছিল ২৩.৬৪ মিলিয়ন। এক্ষেত্রে কোম্পানির ব্যর্থতা ছিল ২৬.২৭ শতাংশ। একইভাবে, কার্ড মুদ্রণ মাত্র ১২.৪১ শতাংশ এবং ব্যর্থতা ৮৬.২১ শতাংশ এবং ওই সময়ে উপজেলা-থানা পর্যায়ে বিতরণে ব্যর্থতা ছিল সংস্থাটির ৮৭.৮০ শতাংশ।
এদিকে, ওবার্থুর এই ব্যর্থতা পুষিয়ে নিতে স্মার্টকার্ড মুদ্রণ ও বিতরণ কাজও দেশের অর্থায়ন এবং নিজস্ব উদ্যোগে সম্পন্ন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। পাশাপাশি, সংস্থাটির বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা ও প্রতিষ্ঠানের ইমেজ ও আর্থিক ক্ষতির কারণে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার বিষয়ে করছে। এর জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইন বিশেষজ্ঞ কিউসি আজমালুল হককে আইনি পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ।
নির্বাচন কমিশনের ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ফ্রান্সের ওবার্থুর কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। আমরা নিজেরাই জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্টকার্ড তৈরি করব। আশা করছি আগামী বছর জুনের মধ্যে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সব কার্ড ছাপিয়ে বিতরণ করতে পারব। চুক্তি বাতিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের নির্দিষ্ট সময় দেয়া হয়েছিল। ওই সময়ের মধ্যে তারা কাজ শেষ করতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবে তাদের মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি। এখন নিজেরাই স্মার্টকার্ড তৈরি করবে ইসি। ব্ল্যাংক স্মার্টকার্ড বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)’র মাধ্যমে স্মার্টকার্ড তৈরি করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন