মিয়ানমারে যৌন বাণিজ্য

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ১২ আগস্ট ২০১৭, শনিবার
হ্লাইং তায়ার টাউনের পাশে একটি নদীর পাড়ে কোনো রকম এক রুমের একটি ঘর। ছালা, চট দিয়ে তৈরি। সেখানে বাস মা ই পাই-এর। দু’সন্তান ও তার স্বামীকে নিয়ে এই ঘরেই একসঙ্গে থাকতেন তিনি। কাঠামো বাঁশের তৈরি। তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে কোনোমতে এ ঘরখানা।
নিচে দূষিত পানি। ভয়ঙ্কর দুর্গন্ধ। ঘরের বাইরে বসে শাকসবজি বিক্রি করেন মা ই পাই। তার স্বামী বিদেশে জেলে হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এক পর্যায়ে তার পিতা ও স্বামী দু’জনেই মারা যান। ফলে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। মিয়ানমারে মারা যাওয়াও যেন এক খরুচে ব্যবসা। হাসপাতাল চার্জ ও অন্যান্য খরচ মিলে একটি মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা ও মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করতে খরচ হয় কমপক্ষে এক লাখ কিয়াত (৭৪ ডলার)। স্বামী মারা যাওয়ায় কিছু ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন মা ই পাই। কিন্তু তারপর যখন তার পিতা মারা যান তখন তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করতে তাকে ৫০ হাজার কিয়াত (৩৭ ডলার) ধার করতে হয়েছিল। কিন্তু শতকরা ৫ কিয়াত হার সুদ শোধ করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে তার ঋণের বোঝা দ্রুত তিনগুণ হয়ে যায়। জীবনের করুণ কাহিনী বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা ই পাই। তিনি বলেন, এখানে আপনি যদি পরিবারে একজন নারী হন এবং অশিক্ষিত হন তাহলে আপনার সামনে একমাত্র পথ হলো যৌন ব্যবসা। মিয়ানমারে, বিশেষ করে ইয়াঙ্গুনে জীবন অত্যন্ত কঠিন। এখানে পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতে আমাদের অর্থের পিছনে ছুটতে হয়। এই দেহ বিক্রি করে আমি অনেক অর্থ উপার্জন করতে পারি। তা দিয়ে ঋণের অনেকটাই শোধ করতে পারি। সন্তানদের খাওয়াতে পারি। এ এলাকায় অন্যরা যা না পারে তার চেয়ে ভালো খাবার দিতে পারি সন্তানদের সামনে। পরিবারকে সাপোর্ট দিতে পারি। প্রতিবেশীদের পরামর্শে এই অন্ধকার জগতে পা বাড়িয়েছেন মা ই পাই।
২০১৫ সালে মিয়ানমারের দুটি বড় শহর ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ে নারী যৌনকর্মীদের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল। তাতে দেখা গেছে, ঋণের বোঝা বাড়ার কারণে নারীরা এই অন্ধকার জগতে পা রাখছেন। এ সমস্যা সমাধান হওয়ার মতো নয়। কারণ, পরিবারের সদস্যরা ভবিষ্যৎ কাজের জন্য অর্থ ঋণ নেন। আর সেই ঋণের দায়মুক্তির জন্য নারীদের ঠেলে দেয়া হয় যৌন ব্যবসায়। তাই নিজের দু’সন্তানকে দেখাশোনার পাশাপাশি নিজের মা, তিন ভাইবোন, ননদ, ভাতিজা- সবার অন্ন যোগানদাতায় পরিণত হয়েছেন মা ই পাই। এরা সবাই মিলে এখন মা ই পাই-এর ওই এক রুমের ঘরে বসবাস করেন। গত মাসে তার ননদের সন্তান হয়েছে। সেই খাতে খরচ মেটাতে গিয়ে মা ই পাই’কে ঋণ নিতে হয়েছে আরো ৫০ হাজার কিয়াত (৩৭ ডলার)। এই ঋণ শোধ করার জন্য সংগ্রাম করছেন তিনি। মোট এক লাখ ৭০ হাজার কিয়াত (১২৬ ডলার) ঋণের বিপরীতে তাকে মাসে শোধ করতে হচ্ছে শতকরা ১০ ভাগ হারে সুদ। মা ই পাই বলেন, দাদন ব্যবসায়ীকে আমি জানি। তিনি যৌনকর্মীদের অর্থ ঋণ দেন। এতে তাদের এক রকম সন্তুষ্টি আছে। কারণ, তারা জানেন যে, আমার একটা ভালো উপার্জনের পথ আছে এবং তার অর্থ আমি ফেরত দেবো।
ওই এলাকায় যৌন ব্যবসা লাভজনক। প্রতি সেশনে মা ই পাই উপার্জন করেন ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার কিয়াত (৭ থেকে ১১ ডলার)। হ্লাইং তায়ার এলাকার অখ্যাত গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে নারীরা প্রতিদিন গড়ে যে আয় করেন তার তিনগুণ এই অর্থ। কিন্তু মিয়ানমারে এই যৌনব্যবসা একটি ভয়ঙ্কর পেশা। ১৯৪৯ সাল থেকে এই পেশা নিষিদ্ধ সেখানে। মা ই পাই বলেন, গত নভেম্বর থেকে আমি যথেষ্ট খদ্দের পাচ্ছি না। কারণ, এ পেশার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানে আমরা কারা। তারা জানে আমরা কোথায় খদ্দের ধরি। তাই তারা সারাক্ষণ ওইসব স্থানে অপেক্ষা করে। আমাদের দেখলেই তারা হুমকি দেয়। যদি আমরা তাদেরকে অর্থ উৎকোচ না দিই তাহলে তারা আমাদের গ্রেপ্তার করে। আবার অনেক সময় পুলিশ অর্থও চায় না। একবার একই পেশায় জড়িত অন্য কয়েকজনের সঙ্গে আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে একটি গেস্ট হাউজে। সেখানে গ্রেপ্তার এড়াতে হলে আমাদের জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক গড়তে বাধ্য করা হয়। হ্লাইং তায়ার পুলিশ ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তা বলেছেন, অধিক থেকে অধিক হারে যৌনকর্মীদের গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। এর মধ্য দিয়ে তাদের কাজের গণ্ডি সংকীর্ণ করে আনা হচ্ছে। এখন হ্লাইং তায়ার শহর এলাকায় যৌনকর্মী নেই বললেই চলে। তাদের কাছ থেকে উৎকোচ নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা শুধু তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে আমাদের দায়িত্ব পালন করে চলেছি। কিন্তু  মা ই পাই বলেন অন্যকথা। তিনি বলেন, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে দালাল ধরতে হয়েছে তাদের। এ জন্য দালালকে কমিশন দিতে হয়। এ ছাড়া যে এলাকায় মা ই পাই বাস করেন তার আশপাশ থেকে কুমারী মেয়েদের এ পেশায় উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। মা ই পাই বলেন, খদ্দেররা সব সময়ই কম বয়সী ও সুন্দরী মেয়ে চায়। যদি এমন মেয়ে সরবরাহ দিতে পারি তাহলে আমাকে দেয়া হয় ৫০ হাজার কিয়াত (৩৭ ডলার)। তবে এভাবে এই পেশায় খুব কম মেয়েই আসে। আমি এ পেশাকে আর পছন্দ করি না। বিশেষ করে ঋণগ্রস্ত পরিবারগুলো তাদের কন্যাদের ঋণ শোধ করার জন্য এ পেশায় বিক্রি করে। ঋণ ও যৌন ব্যবসার মধ্যে সম্পর্ক এখানেই। একজন মেয়ের কুমারিত্ব বিক্রি করা হয় ৫ লাখ কিয়াতে (৩৭০ ডলার)। নিশ্চয়ই এই অর্থ বিশাল বড় অংকের। অন্য কোনো উপায়ে তো এ অর্থ উপার্জন করা যায় না। তাই যারা এ ব্যবসায় দালাল হিসেবে কাজ করে। সদস্য সংগ্রহ করে তাদের সঙ্গে দাদন ব্যবসায়ীদের একটি সম্পর্ক আছে। তারা দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তথ্য পেয়ে যায়- কোন পরিবার বেশি ঋণগ্রস্ত। সেই পরিবারে যদি কোনো যুবতী থাকে তাহলে তাকে ফাঁদে ফেলে তারা। তবে কাদের কাছে কুমারী মেয়ের চাহিদা বেশি বা কারা এ বাজার সৃষ্টি করেছে তা পরিষ্কার জানা যায়নি। অনেকেই আশঙ্কা করেন এর খদ্দের হলো চীনা ব্যবসায়ীরা। তারা বিশ্বাস করে, কুমারী মেয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে এইচআইভিসহ যৌন সংশ্লিষ্ট রোগের বিস্তার রোধ হয়। মা ই পাই বলেন, এখন আমার নিজের মেয়েদের নিয়েই আমি ভীষণ উদ্বিগ্ন। আমি চাই না ওরাও এই পেশায় আসুক। এ জন্যই ওদেরকে আমি স্কুলে পাঠিয়েছি। আমি চাই ওরা পড়াশোনা শেষ করুক।



 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

বিজয় দিবসে দেশ গড়ার দৃপ্ত শপথ

বঙ্গবন্ধুর গৃহবন্দি পরিবারকে যেভাবে উদ্ধার করেছিলেন কর্নেল তারা

থ্যাংক ইউ জেনারেল, উই আর অলরেডি বার্নিং, ডোন্ট অফার আস ফায়ার

রাহুল গান্ধীর অভিষেক

চাল-পিয়াজের দামে অসহায় ক্রেতারা

সিলেটে চার বন্ধুর একসঙ্গে বিদায়

রহস্য ভূমিকায় জামায়াত

শোকে মলিন চট্টলা

কিশোরগঞ্জে ২ সাংবাদিক ও বান্দরবানে ৪ পুলিশকে পেটালো ছাত্রলীগ

জৈন্তাপুরে লিয়াকত আলীই এখন শেষকথা

রাজধানীতে আওয়ামী লীগের বর্ণাঢ্য র‌্যালি

বড় দু’দলেই একাধিক প্রার্থী

ছায়েদুল হকের জন্য কাঁদছে নাসিরনগর

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ

উৎসবের আমেজে সারাদেশ