ছাত্রজীবনে রোমান্টিক ছিলাম

এক্সক্লুসিভ

রুদ্র মিজান | ১২ আগস্ট ২০১৭, শনিবার
তিনি আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ। ছাত্রনেতা হিসেবেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। দল পরিবর্তন করেছেন। বারবার কারাভোগ করেছেন। তিনি মাহমুদুর রহমান মান্না। ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, বাসদ, আওয়ামী লীগ হয়ে এখন তিনি নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক।
সবুজ পাহাড় ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিলো। রাজনৈতিক সংগ্রাম করতে গিয়ে শিখেছিলেন বিপ্লবীদের স্ত্রী থাকতে নেই। সংসার করতে নেই। নিজের সিদ্ধান্তটা এমনই ছিলো। কিন্তু পারলেন না। বড় বোন ও ভাই অনেকটা কৌশলেই বিয়ে করালেন মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। তারপর থেকে এই বিপ্লবী একজন সংসারিও।
এ বিষয়ে মান্না বলেন, ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পরই বিয়ে করি। বাধ্য হয়েই করতে হয়েছে। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। বড় বোনের বাসার পাশে থাকতেন তারা (শ্বশুরের পরিবার)। আপা খুব জেদ ধরলেন আমাকে বিয়ে করাবেন। তারা আমাকে একটা প্যাচের মধ্যে ফেলে বিয়ে করালেন। বিয়ে করার কথা মাথায় ছিলো না। তখনতো শুধু বিপ্লবের কথা ভাবতাম। বিপ্লবের জন্য নিবেদিত ছিলাম। প্রেম করার মতো মানসিকতা ছিলো না। ছাত্রনেতা হিসেবে যখনই রোকেয়া হলে, শামসুন্নাহার হলে গিয়েছি মেয়েদের ভীড় হতো। মেয়েরা খুব পছন্দ করতো আমাকে। কিন্তু কারও সঙ্গে প্রেম হয়নি। এসব কথা ভাবতেই পারতাম না। পরে জেনেছি মেয়েরা পছন্দ করলেও প্রস্তাব দেয়ার সাহস পেতো না। মেয়েরা তাকে খুব পছন্দ করার কারণ হিসেবে মান্না জানান, রোমান্টিক ছিলাম। বক্তব্য দিতে খুব পছন্দ করতাম। তারা অনেকে আমার বক্তব্য পছন্দ করতো।
মাহমুদুর রহমান মান্নার স্ত্রী মেহের নিগার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই ছাত্রীকে জীবন সঙ্গী করেছেন তিনি। নানাভাবে মান্নাকে সহযোগিতা করেন স্ত্রী। বাসায় অল্প-স্বল্প হলেও স্ত্রীকেও সহযোগিতা করেন মান্না। তবে রাজনীতির ব্যাপারে তেমন আগ্রহী না মেহের নিগার। রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা ভালো না হলেও রাজনীতিবিদ মান্না সম্পর্কে মেহের নিগারের ধারণা অনেক ভালো। মান্না বলেন, দুটি দলের বাইরে নতুন একটা শক্তি গড়ে উঠুক। আমি সেই কাজটি করছি। তিনি আশাবাদী। এই দম্পতির দুই সন্তান। ছেলে নিলয় মান্না ও নীলম মান্না। লেখাপড়া করছেন কানাডায়। পাশাপাশি সেখানে কাজ করছেন তারা।
মা-বাবার ১১ সন্তানের মধ্যে মাহমুদুর রহমান মান্না চতুর্থ। তারা সাত ভাই, চার বোন। বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। সার্টিফিকেট অনুসারে ১৯৫১ সালে বগুড়া শহরের চকলোকমানে জন্ম মান্নার। পিতা আফসার উদ্দিন আহমদের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জের বিহার ফকিরপাড়া। বগুড়া শহরের সূত্রাপপুরের মালতিনগর ফ্রি প্রাইমারি স্কুল ও বগুড়া জেলা স্কুলে পড়েছেন মান্না।
১৯৬৪ সালে ঢাকায় এসে ভর্তি হন আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে।  পরবর্তীতে ঢাকা কলেজে পড়েছেন। এইচএসসি শেষে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে। জড়িয়ে যান ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। ১৯৬৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের আহবায়ক হন। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনে ছাত্রলীগের পক্ষে জিএস নির্বাচিত হন মান্না। যদিও তখন জিএস পদে মান্না ছাড়া ছাত্রলীগের পুরো প্যানেল ফেল করেছিল।
স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগে শুরু হয় মতভেদ। ১৯৭২ সালের পর ছাত্রলীগের কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ দ্বিধা বিভক্ত হয়ে যায়। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অংশকে সমর্থনকারীদের অংশগ্রহণে ১৯৭২ সালের ৩১শে অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করে। মাহমুদুর রহমান মান্না তখন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পক্ষে। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ)’র সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন মাহমুদুর রহমান মান্না। ১৯৭৬ সালে হন কেন্দ্রীয় সভাপতি। পরবর্তীতে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যাথমেটিক্স এবং লাইব্রেরি সায়েন্সে। সেখানে দুই বার কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)’র ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৭৯-৮০, ১৯৮০-৮১ মেয়াদে। রাজনীতিতে এতোটাই আচ্ছন্ন হয়ে যান যে মাস্টার্স করা আর হয়নি। ছাত্র রাজনীতি শেষে ১৯৮০ সালে মান্নাসহ সমাজতান্ত্রিক চেতনার উল্লেখযোগ্য কিছু নেতাকর্মী মিলে গঠন করেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলটিও ছাড়েন। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দেন তিনি। যোগ দেন আওয়ামী লীগে। দলটির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। ১/১১ পর সংস্কারের অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। যদিও এক এগারোর দুঃসময়ে শেখ হাসিনার মুক্তিও দাবি করেছিলেন তিনি। তারপর বাদ পড়েন দলের দায়িত্ব থেকে। দূর্‌ত্ব সৃষ্টি হয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে। এরমধ্যেই গঠন করেন নাগরিক ঐক্য। বর্তমানে এটি একটি রাজনৈতিক দল।
মাহমুদুর রহমান মান্নার সমাজ-দর্শনের ভিত্তিকে গড়া এই সংগঠনটি  নিয়ে নতুন শক্তি-জাগরণের স্বপ্ন দেখেন তিনি। বলেন, আমি কিছুদিন আগেও কারাগারে ছিলাম। সেখানে যখন কিছুই করার ছিলো না তখনও বই পড়েছি, লিখেছি। মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। জেলে থাকা মানুষের কথা শুনেছি। আমি মনে করি যথেষ্ট উপকার হয়েছে। জেল থেকে বের হয়ে দেখলাম দু’ বছর আগে যে দেশটি রেখে গিয়েছিলাম সেই দেশটি পাচ্ছি না। পুরো দেশ যেন ভয়ের চাদরে ঢাকা। কেউ কথা বলতে সাহস পায় না। অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেছে। এরকম করা হয়েছে যে- বহু মিডিয়া নিজে নিজেই সেন্সর আরোপ করেছে। গণতন্ত্র যদি চর্চা করতে হয় তাহলেতো কথা বলতে হবে, কথা বলতে দিতে হবে। আমি এখন দেখছি- যে স্যোশাল মিডিয়া অনেক এগিয়ে আছে। ফেসবুকে ব্যক্তিগত ইন্টারটেনইমেন্ট বেশি যায়। আবার একই জিনিস তাহরির স্কয়ারের উত্থানে কাজ করেছে। এটিকে মতামত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আমি এখন ফেসবুকে কবিতা লিখছি। সাড়াও পাচ্ছি।
কবিতা লেখা সম্পর্কে তিনি বলেন, এক সময়ে কবি মোহন রায়হান আমাকে অনুপ্রেরণা দিতো কবিতা লিখতে, উৎসবে পাঠ করতে। দেশে অনেক অমানবিক ঘটনা ঘটছে। এটা নিয়ে কেউ কবিতা লিখলে তাকেতো কেউ রাজনৈতিক দোষ দিতে পারে না। সাহিত্যিকদের কাজ হতে পারে সমাজ সচেতনতা তৈরি করা। আমি জেলে থেকে লিখেছি। কিন্তু জেলের লেখাগুলো অনেকে ছাপতে সাহস পান না। তবে কবিতা ছাপাতে চান প্রকাশকরা।
নানা রোগে আক্রান্ত মাহমুদুর রহমান মান্না। ঘাড়ে ক্ষয় হয়েছে। ঘুম থেকে উঠতে প্রায়ই দেরি হয়। ঘাড় থেকে পুরো শরীরে ব্যথা ছড়িয়ে যায়। মান্না বলেন, ঘুম থেকে উঠে নাস্তা, গোসল করি। ফেসবুকে কিছু সময় থাকি। পত্রিকা পড়ি, বই পড়ি। লেখা-পড়ায় সকাল-দুপুর কাটে। বিকালে পার্টি অফিসে যাই। যারা ফেসবুকে আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান আমি তাদের কাছে জানতে চাই, কেন আমার বন্ধু হতে চান? তখন তাদের সঙ্গে চ্যাট হয়। এভাবে তাদের সঙ্গে আমার মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করি। গান শুনি। গাড়িতে-বাসায়। পুরনো দিনের গান, রবীন্দ্র সঙ্গীত, ফোক গান বেশি শোনা হয়।
আমার কিছু বন্ধু রয়েছেন। যাদের দেখা পেলে এই বয়সেও তাদের সঙ্গে আড্ডা দিলে পুরো রাত কাটিয়ে দিতে পারি। রাতে কিছু কিছু গোলটেবিল, টকশোতে যাই। রাত ১২টার দিকে ঘুমাতে চেষ্টা করি। এভাবেই ব্যস্ততায় সময় কাটে। বর্তমানে রাজনৈতিক সঙ্কট অত্যন্ত গভীর দাবি করে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমাদের প্রতি জনগণের আস্থা রয়েছে। কিন্তু সাংগঠনিক শক্তির প্রশ্ন আছে। এখন গুমের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। মানুষ ভয় পায়। তবে আমরা আশাবাদী।
গত ১৩ই জুলাই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ( জেএসডি)’র সভাপতি আ স ম আবদুর রবের বাসায় রাজনীতিবিদদের বৈঠকে সম্পর্কে তিনি বলেন, আ স ম রবের বাসায় দাওয়াত ছিলো। আমরা যারা সেখানে বসেছি তারাতো রাজনৈতিক আলাপ করবোই। বামপন্থীরা কখনও ডানপন্থীদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা ভাবে না। কিন্তু তারা এখন ভাবছেন। দেশে উদার গণতন্ত্র’র জন্য তারা এটা ভাবছেন। কিন্তু মোর্চ বা প্ল্যাটর্ফমে না। সিপিবি বাসদ ও বাম মোর্চা আছে। এর বাইরে একটা কর্মসূচির কথা ভাবা হচ্ছে। সেখানে আমরা সবাই কর্মসূচিতে অংশ নেব। তার মানে তারা (বামপন্থীরা) কোনো জোটের প্রস্তাব দেননি। আমরা বসি, কথা বলি-এই। আমরা মনে করি একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন রাজনৈতিক সঙ্কটের একমাত্র সমাধান।
 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ

উৎসবের আমেজে সারাদেশ

জনগণের দেয়া রায় মেনে নেবে বিএনপি: ফখরুল

কংগ্রেস সভাপতি পদে রাহুল গান্ধীর আনুষ্ঠানিক অভিষেক

দুই নারীর একজন স্বামী, অন্যজন স্ত্রী

আ’লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ১৫

নওগাঁয় যুবককে কুপিয়ে হত্যা

গার্মেন্টে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করছে এইচ অ্যান্ড এম

নাশকতার অভিযোগে ২০ শিবিরকর্মী আটক

বিএনপির বিজয় র‌্যালিতে যুবলীগ-ছাত্রলীগের হামলা

বিজয় উৎসব পালন করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ মুক্তিযোদ্ধাসহ আহত ৯

আমৃত্যু এক যোদ্ধার কথা

ছাত্রদলের পুষ্পস্তবক ছিঁড়লো ছাত্রলীগ

বঙ্গবন্ধুর গৃহবন্দি পরিবারকে যেভাবে উদ্ধার করেছিলেন কর্নেল তারা

ভারতে তিন তালাক বিরোধী খসড়া আইনে সরকারের অনুমোদন