মুক্তামণির স্বপ্ন পুরণ হবে তো?

এক্সক্লুসিভ

স্টাফ রিপোর্টার | ১২ আগস্ট ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৫৫
 স্বপ্ন আছে সুস্থ হয়ে প্রথমে আদরের ভাইটাকে কোলে নিবে। ছোট বোন হীরামণির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আবার স্কুলে যাবে। লেখাপড়া শেষ করে ভালো চিকিৎসক হবে। প্রজাপতির পাখনা মেলে ঘুরে বেড়াবে এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি। সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলায় আবার মেতে উঠবে। কদিন পরে কোরবানি ঈদ। গরুর মাংসের ঝোল দিয়ে ইচ্ছেমতো ভাত খাবে। রক্ত নালির টিউমারে আক্রান্ত মুক্তামণি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের কেবিন ব্লকে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাধীন আছে। তার হাত দিয়ে ছবি আঁকার শক্তি না পেলেও মনের ক্যানভাসে এঁকে চলে নানান ছবি। কণ্ঠে আছে গানের সুর। কিন্তু একটুতেই হাঁপিয়ে যায়। সাতক্ষীরায় মেয়ে মুক্তামণির জন্মের দেড়বছর বয়স থেকে ডান হাতের সমস্যার শুরু হয়। প্রথমে হাতে টিউমারের মতো হয়। ছয়বছর বয়স পর্যন্ত টিউমারটি তেমন বড় হয়নি। কিন্তু পরে তার ডান হাতটি ফুলে অনেকটা কোলবালিশের মতো হয়ে যায়। সে বিছানাবন্দি হয়ে পড়ে। মুক্তামণির রোগ নিয়ে সমপ্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। গত ১১ই জুলাই মুক্তামণিকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।
মুক্তামণি এখন সবার কাছে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন। সব ধরনের  খোঁজখবর নিচ্ছেন। এ পর্যন্ত মুক্তামণিকে একটু দেখার জন্য, শুভকামনা জানানোর জন্য বার্ন ইউনিটে এসেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী  মোহাম্মদ নাসিম, ক্রিকেট দলের টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমসহ অনেকেই। মুক্তামণির এখন যে অবস্থা, তাতে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরই প্রয়োজন সবার দোয়া। সবার ভালোবাসা ও দোয়ায় সৃষ্টিকর্তা হয়তো মুখ তুলে চাইবেন বলেই ভরসা করে আছেন চিকিৎসকেরাও। আজ শনিবার সকালে মুক্তামণির হাতে অস্ত্রোপচার হবে। মুক্তামণির বাবা ইব্রাহিম হোসেন জানান, ‘আপনারা সবাই দোয়া করবেন, আমার মেয়েটা যাতে আবার আমার বুকে ফিরে আসতে পারে। আমি তার সব বায়না মেটানোর জন্য  তৈরি।’
মুক্তামণির অস্ত্রোপচারের জন্য সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার কথা হয়েছিল। তবে সেখানকার চিকিৎসকেরা ভিডিও কনফারেন্স করে ও বিভিন্ন রিপোর্ট দেখে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা মুক্তামণির অস্ত্রোপচার করতে পারবেন না। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বিশেষ করে বার্ন ইউনিটের বার্ন অ্যান্ড প্লাাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবুল কালামসহ অন্যরা হাল ছাড়েননি। তাঁরা সাহস করে এগিয়ে এসেছেন। তা না হলে মুক্তামণিকে হয়তো এ পৃথিবী থেকেই বিদায় জানাতে হবে। অস্ত্রোপচারেও সে ঝুঁকি আছে। জীবন বাঁচানোর জন্য ওর হাত কেটে ফেলতে হতে পারে। কিন্তু চেষ্টা তো করতে হবে। মুক্তামণির অস্ত্রোপচারের জন্য বার্ন ইউনিটের দুটো অপারেশন থিয়েটার প্রস্তুত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, অস্ত্রোপচারের পরবর্তী তিনদিন মুক্তামণিকে দেখার জন্য দল গঠন করা হয়েছে। এই দলের চিকিৎসক, নার্সরা শুধু মুক্তামণিকে দেখবেন। গতকাল সকালে মুক্তামণির জ্বর এসেছে। বার্ন ও প্লাাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বলেন, সন্ধ্যা নাগাদ জ্বর ভালো না হলে হয়তো অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হতে পারে। তিনি বলেন, ‘মুক্তামণির শরীরের যে অবস্থা তাতে করে জ্বর হবে, এটা-ওটা সমস্যা হবে, তা আমরা মাথায় রেখেই অগ্রসর হচ্ছি। রক্তনালির টিউমার কোনো বিরল রোগ নয়। কিন্তু মুক্তামণিকে আমরা যে অবস্থায় পেয়েছি তাকে বিরল না বলে উপায় নেই। টিউমার ছড়িয়েছে অনেক দূর। তার লিভার বড়। একটা ফুসফুস কাজ করে না। সমস্যা অনেক। এ পথে না গিয়ে আমাদের আর কোনো উপায় নেই। তা না হলে ওকে ছেড়ে দিতে হবে। মুক্তামণির অস্ত্রোপচারে শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নয়, অন্য হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কয়েকজন সার্জনও অংশ নেবেন। মুক্তামণির মা আসমা খাতুন স্বপ্ন দেখছেন মেয়ে হাতের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। কিশোরী মেয়ে যখন-তখন দুই হাত দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে আদর করবে। এখন তো হাতসহ মেয়ের ওজন ২৪ কেজি। এর অর্ধেক ওজনই হবে হাতের ওজন।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন