‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত মামুনের ভয়ে বাড়ি ছেড়েছিল মা ও ভাই

এক্সক্লুসিভ

সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি | ১২ আগস্ট ২০১৭, শনিবার
 সরাইলে বন্দুকযুদ্ধে নিহত মামুনের ভয়ে একবছর আগে বাড়ি ছেড়েছিল তার মা শাহেনা বেগম ও বড় ভাই মাসুদ মিয়া। শুধু তাই নয়, প্রতিবেশীরা ছিলেন অতিষ্ঠ। ওদিকে হাসপাতাল থেকে মামুনের লাশ গ্রহণ করেন তার বড় বোন রিপা বেগম। লাশ দাফন করা হয়েছে শ্বশুরবাড়ি জেলা শহরের শেরপুর কবরস্থানে। মামুনের মূল বাড়ি সরাইল সদর ইউনিয়নের উচালিয়া পাড়া গ্রামে। দেওড়ায় তার নানার বাড়িতেই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন তার পরিবার। পুলিশের দাবি, মামুন মাদক ডাকাতি হত্যা ছিনতাইসহ নানা অপকর্মের জাল বিস্তার করে চষে বেড়াচ্ছিল সমগ্র জেলায়। দেড় বছর আগে ঢাকায় মাদকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। পরে বেশ কয়েক মাস জেল খাটে। গত কয়েক মাস আগে দেওড়ায় মামুন প্রকাশ্যে গ্রামীণ ব্যাংকের স্থানীয় ম্যানেজার ও এক সহকর্মীকে মারধর করে দেড় লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছিল। এ ঘটনায় মামলা হলে মামুন দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে আসে। তারপরও থেমে থাকেনি তার অপরাধ। গত ২রা আগস্ট রাতে মামুনের পাশের বাড়ি আবদুল হান্নান চৌধুরীর (৭০) ঘরে সংঘবদ্ধ একদল ডাকাত প্রবেশ করে। তখন ঘরে ঘুমিয়ে ছিল বৃদ্ধ হান্নান ও তার স্ত্রী ধনা বেগম (৬৫)। মালামাল লুট করে যাওয়ার সময় ডাকাতদের চিনে ফেলায় তারা গৃহকর্তা হান্নান চৌধুরীকে নির্মম ভাবে খুন করে। আর বেধড়ক মারপিটের পর মৃত্যু হয়েছে ভেবে ধনা বেগমকে সঃজ্ঞাহীন অবস্থায় ফেলে যায়। সকালে স্বজনরা হান্নানের মৃত দেহ দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়। আর গুরুতর আহত ধনা বেগমকে হাসপাতালে ভর্তি করে। সকালে সরাইল থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা লোকদের আসামি করে ৪ঠা আগস্ট সরাইল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন নিহতের ছেলে দাগন চৌধুরী। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডাকাতির ঘটনায় জড়িত মামুনকে গত ৯ই আগস্ট নবীনগর উপজেলার ভুলাচং ইউনিয়নের দাসপাড়া এলাকা থেকে তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামার গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তারকালে মামুনের কাছ থেকে হান্নান চৌধুরীর খুনের কাজে ব্যবহৃত একাধিক দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মামুন ডাকাতি ও হান্নান চৌধুরী খুন করার ঘটনায় সম্পৃক্ততা স্বীকার করে। পরে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তার দলের সকল সদস্যের নামও জানায়। এ ছাড়া দেওড়া গ্রামে ও জেলার অন্যান্য জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে করা তার সকল অপকর্মের দায় স্বীকার করেছে। বুধবার গভীর রাতে মামুনের দেয়া তথ্যানুসারে লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারের জন্য দেওড়া গ্রামে রওনা দেয় পুলিশ। রাত দেড়টার  দিকে শাহবাজপুর-শাহজাদাপুর সড়কের কামাল শাহ’র মাজারের কাছে যাওয়া মাত্র পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা সংঘবদ্ধ ১৫-২০ জনের ডাকাতদল পুলিশের গাড়ি আটক করে ধস্তাধস্তি করে মামুনকে ছিনিয়ে নেয়। পুলিশ ডাকাত মামুনকে নিজেদের কব্জায় আনার চেষ্টা করলে ডাকাতদল পুলিশকে লক্ষ করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। আত্ম রক্ষার্থে পুলিশও চালায় পাল্টা গুলি করে। আধা ঘণ্টাব্যাপী ডাকাত ও পুলিশের মধ্যে চলে গুলি বিনিময়। ডাকাতরা ছুঁড়ে ৩০-৩৫ রাউন্ড আর পুলিশ ছুঁড়ে ১৬ রাউন্ড গুলি। একপর্যায়ে নিজ দলের লোকদের গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মামুন। ভয়ে ডাকাতদল পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ডাকাতদের ফেলে যাওয়া ১টি পাইপগান, ১টি রামদা, ১টি ছোরা, ২ রাউন্ড তাজা গুলি ও গুলির ৮টি খোসা উদ্ধার করে। বন্দুকযুদ্ধে আহত হয় এস আই অহিদুর রহমান, কনস্টেবল শাহাদাৎ, আজিজ ও মিজান। তারা সকলেই সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। স্থানীয়রা জানায়, মামুনরা ২ ভাই। বড় ভাই মাসুদ মিয়া সৌদি প্রবাসী। ছোট ভাইয়ের উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন তাদের পরিবারে বিশাল অশান্তির জন্ম দিয়েছিল। দেওড়ায় পাকা ভবন করেও মামুনের যন্ত্রণায় মাসুদ সেখানে থাকতে পারেনি। বাধ্য হয়ে দীর্ঘদিন ধরে জেলা সদরের উলচা পাড়ায় মাকে নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করছে। মামুনের মামা মো. শাহজাহান চৌধুরী বলেন, তার বাবার বাড়ি সরাইল সদর ইউনিয়নের উচালিয়া পাড়া গ্রামে। মামুন জুতার কারখানায় কাজ করতো আর প্রচুর নেশা করত। ডাকাতি করত কিনা আমার জানা নেই। মামুনের স্ত্রী তানিয়া বেগম বলেন, গ্রেপ্তারের খবর শুনে স্বামীকে দেখতে থানায় গিয়েছিলাম। পুলিশ বলেছে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ওইদিন তারা আমার স্বামীকে হত্যা করে ফেলে গেছে। সরাইল থানার অফিসার ইনচার্জ রুপক কুমার সাহা বলেন, ডাকাত মামুন শুধু হান্নান চৌধুরীকেই খুন করেনি। সে দেওড়া গ্রামে ও জেলার অনেক জায়গায় ডাকাতিসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িত। তার রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট। তার বিরুদ্ধে শুধু সরাইল থানায় ২টি ডাকাতি ও ২টি মাদক সহ ৫টি মামলা রয়েছে।

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন