আমার প্রেমিক পার্সি ছিলেন, এটা কেউ সহ্য করতে পারেনি

বই থেকে নেয়া

| ৪ আগস্ট ২০১৭, শুক্রবার
ও ফা : আর মহাত্মা গান্ধী?
ই গা : তার মৃত্যুর পর অনেক কথা বলা হচ্ছে। তিনি একজন ব্যতিক্রমধর্মী লোক ছিলেন। অসাধাণ বুদ্ধিমান, জনগণের জন্য অসম্ভব রকমের দরদ এবং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণের একাগ্রতা ছিল তার। তিনি বলতেন, ভারতের প্রথম প্রেসিডেন্ট হওয়া উচিত একজন হরিজন অস্পৃশ্য মেয়ের। শ্রেণী-প্রথার বিরুদ্ধে তিনি কঠোর ছিলেন। নারীর ওপর নির্যাতন তিনি সহ্য করতে পারতেন না।
তিনি যখন আমাদের বাড়িতে আসতেন তখন তার সঙ্গে মিশতাম। স্বাধীনতার পর তার সঙ্গে বহু কাজ করেছিÑ হিন্দু-মুসলিম সমস্যা যখন চরমে তখন। মুসলমানদের প্রতি দৃষ্টি রাখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমার ওপর। তাদের রক্ষার দায়িত্ব। তিনি মহান ছিলেন। আমার পিতা ও আমার মধ্যে যে সমঝোতা ছিল, মহাত্মা ও আমার মধ্যে সে সমঝোতা ছিল না। তিনি সব সময় ধর্মের কথা বলতেন এবং সেটাই সঠিক বলে মনে করতেন। অনেক ব্যাপারেই আমরা তরুণরা তার সঙ্গে একমত হতাম না।
ও ফা : আবার আপনার প্রসঙ্গে ফিরে আসি মিসেস গান্ধী। এটা কি সত্য যে, আপনি বিয়ে করতে চাননি?
ই গা : হ্যাঁ, আঠার বছর পর্যন্ত চাইনি। কারণ, আমি আমার পুরো শক্তি নিয়োজিত করতে চেয়েছিলাম ভারত স্বাধীন করার সংগ্রামে। আমার ধারণা ছিল, বিয়ে করলে আমি সে দায়িত্ব পালন করতে পারবো না। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার মন পরিবর্তন করলাম এবং আমার বয়স যখন আঠারো তখন বিয়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে শুরু করলাম। স্বামী পাওয়ার জন্য নয়, সন্তান লাভের জন্য। আমি সব সময় সন্তান কামনা করতামÑ যদি আমার ওপর নির্ভর করতো, তাহলে আমার ১১টা সন্তান হতো। আমার স্বামী চাইতেন মাত্র দুটো।
তোমাকে আরো একটা কথা বলি। আমার ডাক্তাররা পরামর্শ দিয়েছিল যাতে আমি একটা সন্তানও ধারণ না করি। আমার স্বাস্থ্য ভালো ছিল না এবং তারা বলতো, গর্ভধারণ করলে খুবই বিপজ্জনক হতে পারে। তারা যদি এ কথা না বলতো, তাহলে হয়তো আমি বিয়েই করতাম না। কিন্তু তাদের ব্যবস্থাপত্র আমাকে প্ররোচিত করলো। আমি বললাম, ‘তাহলে এ কথা কেন ভাবছেন যে বিয়ে করবো, অথচ সন্তান নিতে পারবো না। আমি শুনতে চাই না যে, আমার সন্তান হতে পারবে না। আমাকে বলুন সন্তান পাওয়ার জন্য আমাকে কী করতে হবে।’ তারা কাঁধ বাঁকাল এবং মত ব্যক্ত করলো যে, এজন্য আমাকে কিছু ওজন বাড়াতে হবে। এত শুকনো অবস্থায় আমার পক্ষে কখনো গর্ভ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। আমি ওজন বাড়াতে থাকলাম। কডলিভার অয়েল খাওয়া শুরু করলাম। খাবার পরিমাণ দ্বিগুণ হলো। এক আউন্স ওজনও বাড়লো না। এরপর আমি স্বাস্থ্য নিবাস মুসুরিতে গেলাম এবং ডাক্তারদের নির্দেশ অগ্রাহ্য করলাম। নিজস্ব পদ্ধতি পালন করে আমার ওজন বাড়লো। অথচ এখন উল্টো করতে হচ্ছে। এখন শুকনো থাকাটাই সমস্যা হয়ে গেছে। কিন্তু আমার পক্ষে ম্যানেজ করা অসম্ভব হয় না। আমি খুব দৃঢ়চিত্তের লোক।
ও ফা : হ্যাঁ আমি তা উপলব্ধি করেছি এবং আপনি বিয়ে করে আপনার দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন।
ই গা : বাস্তবিকই তাই। কেউ সে বিয়ে চায়নি। কেউ না। মহাত্মা গান্ধীও এতে সুখি হননি। আমার পিতা এই বিয়ের বিরোধিতা করেছিলেন, এ কথা সত্য নয়। তিনি খুব আগ্রহ দেখাননি। আমার মনে হয় যে, সব পিতার মেয়ে একটাই তারা চান মেয়ের বিয়ে একটু দেরিতে হোক। যাই হোক, আমার প্রেমিক ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তিনি একজন পার্সি। এটা কেউ সহ্য করতে পারেনিÑ গোটা ভারত আমাদের বিরুদ্ধে ছিল। তারা মহাত্মার কাছে, আমার পিতার কাছে লিখেছে। অপমান করেছে। হত্যার হুমকি দিয়েছে। প্রতিদিন ডাকপিয়ন আসতো বিরাট একটা বস্তা নিয়ে এবং মেঝের ওপর চিঠির স্তূপটা রাখতো। আমরা চিঠি পড়াও বাদ দিয়েছিলাম। আমার কিছু বন্ধুকে সেগুলো পড়ে আমাদের জানাতে বললাম, ‘একজন তোমাকে টুকরো টুকরো করে কাটতে চেয়েছে। একজন তার স্ত্রী থাকার পরও তোমাকে বিয়ে করতে চেয়েছে কারণ সে হিন্দু।’ একপর্যায়ে মহাত্মা গান্ধী এই বিতর্কে অংশ নিলেনÑ তার পত্রিকায় এ ব্যাপারে একটা নিবন্ধ দেখেছিলাম। তাতে তিনি লোকজনের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন তাকে শান্তিতে থাকতে দেয়ার জন্য এবং সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করার জন্য। এসবের মধ্যে আমি ফিরোজ গান্ধীকে বিয়ে করলাম। আমার মাথায় একবার কিছু ঢুকলে দুনিয়ার কেউই তা আর বদলাতে পারবে না।
ও ফা : আশা করি আপনার পুত্র রাজীব গান্ধী একজন ইতালীয় মেয়েকে বিয়ে করার কারণে সে ধরনের কিছু ঘটেনি?
ই গা : সময় বদলেছে। আমাকে যে ক্রোধ অতিক্রম করতে হয়েছে ওদের তা হয়নি। ১৯৬৫ সালে রাজীব লন্ডন থেকে আমাকে লিখলো, ‘তুমি সব সময় আমাকে মেয়ের ব্যাপারে বলতে যে, আমার কোনো বিশেষ মেয়ে আছে কি না, ইত্যাদি। আমি একটি বিশেষ মেয়ের দেখা পেয়েছি। আমি তাকে প্রস্তাব দেইনি। কিন্তু এই সে মেয়ে, আমি যাকে বিয়ে করতে চাই।’ এক বছর পর আমি যখন লন্ডন গেলাম, মেয়েটির সঙ্গে দেখা হলো। রাজীব ভারতে ফিরে এলে তাকে বললাম, ‘তুমি কি এখনো আগের মতোই মেয়েটিকে নিয়ে চিন্তা করো?’ রাজীব হ্যাঁ বললো। কিন্তু একুশ বছর না হওয়া পর্যন্ত সে মেয়ে বিয়ে করতে পারবে না এবং যে পর্যন্ত না সে নিশ্চিত হয় যে সে ভারতে বাস করতে পারবে। আমরা তার একুশ বছর পূর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। সে ভারতে এলো এবং বললো ভারতকে তার ভালো লেগেছে। আমরা বিয়ের পাকা কথা ঘোষণা করলাম। দু’মাস পর তারা স্বামী-স্ত্রী হলো। সোনিয়া এখন পুরোপুরি ভারতীয় হয়ে গেছে, যদিও সে সব সময় শাড়ি পরে না। আমিও সব সময় শাড়ি পরি না। আমি যখন ল-নে ছাত্রী ছিলাম, কখনো কখনো পাশ্চাত্যের পোশাক পরতাম। ঠাকুর মা হওয়ার খুব শখ ছিল আমার এবং দুজনের ঠাকুরমা আমি। রাজীব ও সোনিয়ার এক ছেলে ও এক মেয়ে।
ও ফা : আপনার স্বামী বেশ ক’বছর পূর্বে গত হয়েছেন। আপনি কি কখনো পুনরায় বিয়ের কথা ভেবেছেন?
ই গা : না, কারো সঙ্গে বসবাস করতে ভালো লাগবে এমন কারো সঙ্গে যদি দেখা হতো, তাহলে হয়তো সমস্যাটার কথা ভাবা যেতো। কিন্তু তেমন কারো দেখা পাইনি আমি। আমি সুনিশ্চিত যে, আমি আর বিয়ে করবো না। আমি কেন আবার বিয়ে করবো, আমার জীবন তো পরিপূর্ণ। এ প্রশ্নই উঠে না।
ও ফা : তাছাড়া, আমি আপনাকে একজন গৃহবধূ হিসেবে কল্পনা করতেই পারি না।
ই গা : তোমার ধারণা ভুল। আমি একজন খাঁটি গৃহবধূ। মা হওয়ার কারণে যেসব কাজ তা আমি সব সময় পছন্দ করতাম। মা হতে, গৃহবধূ হতে আমাকে কোনো ত্যাগ করতে হয়নি। আমার ছেলেদের প্রতি ভালোবাসা বাড়াবাড়ি গোছের এবং আমার মনে হয় ওদের লালন পালন করে এক বিরাট দায়িত্ব পালন করেছি। এখন দুজনই ভালো এবং দক্ষ মানুষ। আমি অনেক মেয়ে মানুষকে বুঝতে পারি না, যারা তাদের সন্তানদের কারণে নিজেদের অসহায় মনে করে না। তোমার সময়কে যদি গুছিয়ে নিতে পারো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাহলে দুটো দিকের সমন্বয়সাধন খুব কঠিন নয়। আমার ছেলেরা যখন ছোট ছিল, তখন আমি কাজ করেছি। ইন্ডিয়ার কাউন্সিল ফর চাইল্ড ওয়েলফেয়ারের একজন কর্মী ছিলাম আমি। একটা ঘটনা বলি তোমাকে। রাজীবের বয়স যখন মোটে চার বছর এবং কিন্ডারগার্টেনে যাচ্ছিল তখন ওর এক ছোট্ট বন্ধুর মা আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসে বললো, ‘এটা খুব দুঃখের ব্যাপার যে, ছোট্ট ছেলেটির সঙ্গে কাটানোর মতো সময় আপনার নেই।’ রাজীব সিংহের মতো গর্জে উঠলো, ‘আপনি আপনার ছেলের সঙ্গে যতটা সময় কাটান, আমার মা তার চেয়ে অনেক বেশি সময় কাটান আমার সঙ্গে। আপনার ছেলে তো বলে যে আপনি ওকে সব সময় একা রেখে ব্রিজ খেলতে যান।’ যে নারী কিছু না করে ব্রিজ খেলে তাকে আমার পছন্দ নয়।
ও ফা : তাহলে আপনার জীবনে দীর্ঘ একটা সময় ছিল যখন আপনি রাজনীতির বাইরে ছিলেন। আপনি কি তা বিশ্বাস করেন না?
ই গা : রাজনীতি... দেখো, এটা নির্ভর করে কোন ধরনের রাজনীতি। আমার পিতার সময়ে আমরা যা করেছি সে ছিল কর্তব্য। এর লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা অর্জন। আমরা এখন যা করছি, তুমি মনে করো না যে, আমি এ ধরনের রাজনীতিতে উৎসাহী। আমার ছেলেদের এই রাজনীতির বাইরে রাখতে আমি সবকিছু করেছি এবং সফলও হয়েছি। স্বাধীনতার পর আমি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছিলাম। আমার ছেলেদের প্রয়োজন ছিল আমাকে। সমাজসেবী হিসেবে কাজ করতে আমি পছন্দ করতাম। যখন এটা আমার কাছে সুস্পষ্ট হলো যে, আমার পার্টি ঠিকভাবে চলছে না, তখনই আমি রাজনীতিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি যুক্তি খুঁজতাম। আমার পিতার সঙ্গে এবং সবার সঙ্গে, যাদেরকে আমি শৈশব থেকে জানতাম। ১৯৫৫ সালের একদিন নেতাদের একজন অবাক হয়ে আমাকে বললেন, ‘তুমি তো সমালোচনা ছাড়া আর কিছুই করছো না। তুমি যদি ভুল শোধরাতে পারো, তাহলে শোধরাও।’ আমি কখনো চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করতে পারি না। অতএব আমি প্রচেষ্টা চালালাম। কিন্তু আমার মনে হলো এটা সাময়িক এবং আমার পিতা, যিনি আমাকে তার কাজে জড়িত করার চেষ্টা করেননি, তিনিও আমার মতো অভিন্ন চিন্তা করতেন। লোকজন বলাবলি করতো, আমার পিতা আমাকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্যে প্রস্তুত করছেন। তিনি যখন আমাকে সাহায্য করতে বললেন, আমি তার পরিণতি সম্পর্কে ভাবিনি।
ও ফা : সবকিছু তাহলে তার কারণেই শুরু হয়েছিল?
ই গা : তা তো বটেই। তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং তার বাড়ির দায়িত্ব পালন করা, তার সেবা করার মানেই রাজনীতিতে আমার হাত পড়া। সরাসরি অভিজ্ঞতার ফাঁদে আটকে যাওয়াও  বোঝায়। ১৯৫৭ সালের এক সপ্তাহান্তে আমার পিতাকে উত্তরে যেতে হয়েছিল এক সমাবেশে। তার সঙ্গে গিয়েছিলাম আমি বরাবরের মতো। আমরা চাম্বায় পৌঁছে দেখলাম আমাদের সময়সূচির দায়িত্বে যে ভদ্রমহিলা তিনি ভিন্ন এক স্থানে পৃথক একটা বৈঠকের ব্যবস্থা রেখেছেন। আমার পিতা যদি চাম্বার সমাবেশ বাদ দেন তাহলে আমরা চাম্বার নির্বাচনে হেরে যাবো। পাঠান কোটের কাছে অন্য এক শহরের সমাবেশ বাদ দিলে সেখানে আমরা হারবো। পরামর্শ দিলাম, ‘যদি আমি গিয়ে বলি যে, একই সময়ে দুটো জায়গায় বক্তৃতা দেয়া সম্ভব নয়।’ তিনি উত্তর দিলেন যে, এটা অসম্ভব। আমাকে খারাপ রাস্তা দিয়ে তিনশ মাইল যেতে হবে এবং এখন রাত ২টা। শুভরাত্রি বলে বিছানায় এলাম। ধারণাটা আমার কাছে ভালো লাগছিল। ভোর সাড়ে পাঁচটায় ঘুম থেকে জেগে দরজার নিচে একটা নোট দেখলাম। এতে বলা হয়েছে, ‘একটা বিমান তোমাকে পাঠানকোট নিয়ে যাবে। সেখান থেকে গাড়িতে তিন ঘণ্টা যথাসময়েই তুমি পৌঁছবে।’ যথাসময়ে পৌঁছে আমি সমাবেশে যোগ দিলাম। এটা সফল হব এবং আমাকে আরো সমাবেশের জন্য ডাকা হলো। সেই ছিল সূচনা ...।
ও ফা : আপনি কি তখন বিবাহিতা ছিলেন, নাকি ইতিমধ্যে বিচ্ছেদ ঘটেছিল?
ই গা : আমি সব সময় বিবাহিতা অবস্থায়ই ছিলাম। সব সময় ... তার মৃত্যু পর্যন্ত। আমাদের বিচ্ছেদ হয়েছিল এটা ঠিক নয়। আমার স্বামী থাকতেন লক্ষেèৗতে এবং পিতা থাকতেন দিল্লিতে। আমাকে দিল্লি-লক্ষেèৗ দৌড়াতে হতো... দিল্লিতে থাকতে আমার স্বামীর যখন প্রয়োজন হতো আমি তখন লক্ষেèৗ ছুটতাম। আমি লক্ষেèৗ থাকলে আমার পিতার যখন আমাকে প্রয়োজন হতো ছুটে আসতাম দিল্লিতে। না, এটা খুব স্বাভাবিক পরিস্থিতি ছিল না। দিল্লি ও লক্ষেèৗর মধ্যে বেশ দূরত্ব। হ্যাঁ, আমার স্বামী রাগ করতেন এবং ঝগড়া করতেন। আমরা উভয়ে ঝগড়া করতাম। বহু ঝগড়া করেছি আমরাÑ এ কথা সত্য। আমরা উভয়ে সমানভাবে কঠোর লোক ছিলামÑ কেউ হারতে চাইতাম না। আমার মনে হয় ঝগড়া করে ভালোই হয়েছে, আমার জীবন প্রাণবন্ত হয়েছে। ঝগড়া ছাড়া আমাদের জীবনটা হতো স্বাভাবিক, একঘেয়ে ও বিরক্তিকর। আমাদের বিয়েটা তো চাপিয়ে দেয়া ছিল না, আমাকে সে পছন্দ করেছিল- আমি বলতে চাই, সেই আমাকে পছন্দ করেছিল, আমি করিনি। আমি জানি না বিয়ের কথা হওয়ার পর আমি ওর চেয়ে বেশি ভালোবেসেছিলাম কি না? পরে আমার মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমার পিতার জামাতা হওয়া তার পক্ষে সহজ ছিল না। কারো পক্ষেই তা সহজ ছিল না। এটা ভুললে চলবে না যে সেও পার্লামেন্টে ডেপুটি ছিল। এক সময় সে সিদ্ধান্ত নিল যে লক্ষেèৗ ছেড়ে দিল্লিতে থাকবে, আমার পিতার বাড়িতে। কিন্তু পার্লামেন্টের ডেপুটি হয়ে সে প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে কি করে লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাত করবে? খুব সহজে বুঝলো ব্যাপারটা এবং একটা ছোট্ট বাড়ি নিলো। খুব ভালো বাড়ি নয়। জীবন তার জন্য খুব সহজ ছিল না।
ও ফা : আপনি কি কখনো অনুতাপ করেছেন, দুঃখ করেছেন? কিংবা ভয়?
ই গা : না, কখনো না। যে কোনো ভয় আসলে সময়ের অপচয়, দুঃখবোধের মতোই। আমি যা কিছু করেছি, আমার ইচ্ছায় করেছি। যখন ছোট ছিলাম, বৃটিশের বিরুদ্ধে লড়েছি মাংকি বিগ্রেডে অথবা যখন বালিকা ছিলাম, সন্তান চেয়েছি এবং নারী হিসেবে যখন পিতার সেবা করেছি কিংবা স্বামীকে যখন ক্রোধান্বিত করেছি আমি সব সময় একটা বিশ্বাস থেকেই করেছি। যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তখন পরিণতিও মেনে নিয়েছি। এমনকি দেশের সঙ্গে জড়িত নয়, সে ক্ষেত্রেও একই ভূমিকা আমার। আমার মনে পড়ে, জাপান যখন চীনে অভিযান চালায় তখন আমি কেমন ক্রুদ্ধ হয়েছিলাম। আমি শিগগিরই একটি কমিটিতে যোগ দিয়ে অর্থ ও ওষুধপত্র সংগ্রহ শুরু করি এবং একটি আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের জন্য স্বাক্ষর করি। জাপানের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাই। আমার মতো একজন লোকের প্রথমে ভীতি ও পরে অনুতাপের কারণ থাকে না।
ও ফা : তাছাড়া আপনি ভুল করেননি। অনেকে বলে যুদ্ধ জয়ের পর কেউ আপনার বিরুদ্ধাচারণ করবে না এবং আপনি কমপক্ষে কুড়ি বছর ক্ষমতায় থাকবেন।
ই গা : আমি কত দিন থাকবো এ সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। এটা জানারও কোনো আগ্রহ নেই আমার। আমি প্রধানমন্ত্রী থাকবো কি না, তারও তোয়াক্কা করি না। আমি সব সময় ভালো কাজ করতে আগ্রহী, যতদিন আমি ক্লান্ত না হই। আমি ক্লান্ত নই। কাজ মানুষকে ক্লান্ত করে না। কোনো কিছুই চিরদিন টিকে থাকে না। কেউ বলতেও পারে না সুদৃঢ় বা নিকট ভবিষ্যতে আমার কী ঘটবে। আমি উচ্চাভিলাষী নই। একটুও না। আমি জানি, আমার এসব কথায় মানুষ অবাক হয়। কিন্তু এটাই সত্য। সম্মান কখনো আমাকে উত্তেজিত করে না।
প্রধানমন্ত্রীর কাজ আমি অবশ্যই পছন্দ করি। কিন্তু একজন বয়স্ক মানুষ হিসেবে আমার যা করার তার চেয়ে বেশি পছন্দ করি না। কিছুদিন আগে আমি বলেছিলাম, আমার পিতা রাজনীতিবিদ ছিলেন না। বরং আমি নিজেকে মনে করি রাজনীতিবিদ। রাজনৈতিক জীবন শুরু করতে আমার আগ্রহ ছিল না। আমি আমার স্বপ্নের ভারত গড়তেই আজ রাজনীতিতে। আমি যে ভারত চাই তা অত দরিদ্র নয় এবং বিদেশি প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি আমার মনে হয়, দেশটা সেই লক্ষ্যেই অগ্রসর হচ্ছে, তাহলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব এবং প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে অবসর নেব।
ও ফা : কী করবেন?
ই গা : যে কোনো কাজ। তোমাকে বলেছি যে কাজ আমি করি, সেটা আমি ভালোবাসি এবং চেষ্টা করি ভালো করতে। প্রধানমন্ত্রী হওয়া জীবনের একমাত্র কাজ না। আমি একটা গ্রামে বাস করেও সন্তুষ্ট থাকতে পারি। যখন আমাকে দেশ পরিচালনা করতে হবে না, তখন আমি শিশুদের পরিচর্যা করবো। অথবা আমি নৃতত্ত্বে পড়াশোনা করবো অথবা অক্সফোর্ড গিয়ে ইতিহাস পড়বো, যেখান থেকে আমি ইতিহাসে ডিগ্রি নিয়েছি। অথবা... আমি জানি না, উপজাতীয় সম্প্রদায় সম্পর্কে আমার যথেষ্ট আগ্রহ। হয়তো তাদের সঙ্গে ব্যস্ত থাকবো।
শোন, আমার জীবনটা নিশ্চয়ই শূন্য থাকবে না। ভবিষ্যৎ আমাকে ভীত করে না। যদি তা অন্যান্য সমস্যায় সংকুলও থাকে। ব্যক্তির, দেশের সমস্যা থাকেই। ব্যাপার হলো, তা মেনে নেয়া, সম্ভব হলে সমস্যা দূর করা অথবা সমস্যার মধ্যেই কাটানো। লড়াই করা সম্ভব হলে ভালো, অসম্ভব হলে আপস করাই উত্তম। যেসব লোক অভিযোগ করে তারা স্বার্থপর। তরুণ বয়সে আমি খুব স্বার্থপর ছিলাম। কিন্তু এখন আমি আর তা নই। অবাঞ্ছিত বিষয় এখন আর আমাকে বিরক্ত করে না। আমি জীবনের সঙ্গে সব সময় সমঝোতায় আসতে চাই।
ও ফা : আপনি কি একজন সুখী নারী মিসেস গান্ধী?
ই গা : আমি জানি না। সুখ এমন এক ধরনের চলমান অনুভব। নিস্তরঙ্গ বা বাধাহীন সুখ বলে কিছু নেই। সুখ হলো মুহূর্তের অনুভব। তৃপ্তি থেকে সুখ। সুখ দ্বারা যদি তুমি সাধারণ পরিতৃপ্তি বুঝাতে চাও তাহলে খুব বেশি সুখী নই। সন্তুষ্ট নই, তবে তৃপ্ত। আমার দেশের জন্য আমি কখনো সন্তুষ্ট হতে পারবো না। সে জন্য আমি বিপদসংকুল পথই বেছে নিই। একটি পাকা রাস্তা ও পার্বত্য পথে চলার মধ্যে আমি পায়ে চলা পথই বেছে নিই। আমার দেহরক্ষীরা তা পছন্দ করে না।
ওফা : ধন্যবাদ মিসেস গান্ধী।
ই গা : তোমাকেও ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা। সব সময় আমি যা বলি, তোমার জন্য খুব সহজ সময় আশা করি না। কিন্তু তোমার যে অসুবিধাই থাকুক আশা করি তুমি তা সমাধান করবে।
(নয়াদিল্লি, ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২)
(চলবে)

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

মসজিদে গুলি ছোড়ার পর পাল্টে গেল এক মার্কিনীর জীবন

দৃশ্যপট একই

আয় বৈষম্য বাড়ায় চাপে মধ্যবিত্ত

নকলা উপজেলা চেয়ারম্যানের লাশ উদ্ধার

রিভিউর প্রস্তুতি

বাংলাদেশির বীরত্বে ধর্ষকদের হাত থেকে রক্ষা পেলো ইতালীয় তরুণী

ঢাবিতে ‘ঘ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁস?

সিলেট টার্মিনালে গুলিবর্ষণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি

রোহিঙ্গা স্রোত থামছে না

বড় দুই দলেই প্রার্থীর ছড়াছড়ি

সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবেছে চট্টগ্রাম

টানা বৃষ্টিতে নগরজুড়ে দুর্ভোগ

নিম্নমানের কাগজে ছাপা হচ্ছে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই

দিনে গড়ে দেড় হাজার মামলা

‘বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে’

পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে রোহিঙ্গাদের উপর আক্রমণ: মতিয়া চৌধুরী