রোমান্টিক না হলে রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না

বই থেকে নেয়া

| ২৯ জুলাই ২০১৭, শনিবার
ও. ফা. : না?
জু. আ. ভু. : না। আপনার কাছে বিত্তবান অর্থ ডুপন্ট বা একজন রকফেলার হওয়া। আমাদের কাছে আরো অনেক কম। এদেশে যারা ধনী তারা বিস্তর জমির মালিক, কিন্তু আসলে সে ইউরোপীয় ব্যারনদের চেয়ে ধনী নয়। ব্যারনদের জাঁকজমকপূর্ণ ভিলা থাকে এবং বেঁচে থাকার জন্যে গিগোলা খেলে। আমার ভূমি শুষ্ক এবং এতে উৎপাদন হয় কম।
অতএব ধনী বলার চেয়ে বলুন, আমি তুলনামূলকভাবে ধনী। আমি ভালোভাবে বাস করি। আমার বোনেরা ভালোভাবে থাকে, আমার ভাইদের অবস্থানও ভালো। অবস্থা ভালো হলেও আমরা অর্থ অপচয় করি না। আমি কখনো প্লেবয় ছিলাম না। যখন আমি আমেরিকায় এবং অক্সফোর্ডে ছাত্র ছিলাম, আমি কখনো গাড়ি কিনিনি। আমি বুদ্ধিমানের মতোই অর্থ ব্যয় করেছি, যেমন; গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করতে ও বই কেনার মতো কাজে। আপনি যদি আমার লাইব্রেরিটা দেখেন, তাহলেই দেখবেন আমার অর্থের একটা ভালো অংশ আমি কোথায় ব্যয় করেছি: বই কিনতে। আমার হাজার হাজার বই আছে। অনেক বই পুরনো এবং সুন্দর। আমি সব সময় পড়তে দারুণ ভালোবাসি। খেলাধুলার মতো। ভালো পোশাক পরার জন্য অনেকে আমার দোষারোপ করে। কথাটা সত্য। কিন্তু তাদের অভিযোগ পোশাকে আমার অর্থব্যয়ের কারণে নয়, আমি পরিচ্ছন্ন থাকি সে জন্যে। আমি গোসল করতে এবং পোশাক পাল্টাতে পছন্দ করি। আমার পক্ষে কখনো ভারতীয় ও পাকিস্তানী রাজপুত্রদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নিÑ কারণ তারা নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। আমার বাড়িগুলো সুন্দর ও আরামদায়কÑ এটাও সত্য। কিন্তু দীর্ঘদিন আমার বাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না। আমি আপ্যায়ন করতে ভালোবাসিÑ কিন্তু কখনো বাজে লোককে নয়। আমি নাচতে জানি, কারণ আমি সংগীত পছন্দ করি এবং অন্যেরা যখন নাচে তখন দেয়ালে টানানো ফুলের মতো থাকতে ঘৃণা করি বলে। এবং ...।
ও. ফা. : এবং একজন লেডিকিলার হিসেবে আপনার সুনাম আছে বলেÑ একজন ডন জুয়ান। এটা কি সত্য মি. প্রেসিডেন্ট?
জু. আ. ভু. : এ কথাটাও একটু অতিরঞ্জিত। আমি একজন রোমান্টিক- আমি মনে করি না যে, রোমান্টিক হওয়া ছাড়া আপনার পক্ষে রাজনীতিবিদ হওয়া সম্ভব। একজন রোমান্টিক হিসেবে আমি মনে করি প্রেম ছাড়া অনুপ্রেরণামূলক আর কিছু হতে পারে না। প্রেমে পড়া এবং একজন রমণীর হৃদয় জয় করার মধ্যে দোষ কোথায়Ñ তার জন্যে আমার দারুণ দুঃখ হয়, যে প্রেমে পড়ে না। আপনি শতবার প্রেমে পড়তে পারেন। আমিও প্রেমে পড়ি। কিন্তু আমি অত্যন্ত নৈতিক মানুষ এবং নারীদের শ্রদ্ধা করি। মানুষ ভাবে যে মুসলমানরা নারীদের শ্রদ্ধা করে না। এটা মারাত্মক ভুল। নারীকে শ্রদ্ধা করা ও তাদের রক্ষা করা নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর শিক্ষার অন্যতম। একবার আমি এক লোককে বেত্রাঘাত করেছিলাম, যদিও আমি নিজেকে দৈহিক নির্যাতনের পক্ষে মনে করি না কিন্তু খুব নির্দয়ভাবে বেত মেরেছিলাম, রক্তপাত না হওয়া পর্যন্ত। আপনি বলতে পারেন, কেন? কারণ সে একটি ছোট্ট বালিকাকে ধর্ষণ করেছিল। আজ সকালেও যখন আমি পড়লাম যে কয়েকশ’ ছাত্র করাচির সমুদ্র সৈকতে কিছু সংখ্যক ছাত্রীর ওপর হামলা ও তাদের কাপড় খুলে ফেলেছে, আমি রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। স্ক্রাউন্ড্রেল। আমি ওদেরকে সামরিক আইন বিধির আওতায় ফেলবো। আপনাকে কথাটা বলতে চাই। আমি যদি নিশ্চিত হই যে, আমাদের সৈন্যরা সত্যি সত্যিই বাংলাদেশের নারীদের ওপর অত্যাচার করেছে তাহলে আমি অবশ্য তাদের বিচার করবো ও শাস্তি দেব।
ও. ফা.: অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক মি. প্রেসিডেন্ট। আপনার মার্ক্সবাদের কথাই বলি। আপনার যে সুযোগ-সুবিধা এবং মুসলিম হিসেবে আপনার যে বিশ্বাস তার সাথে কি করে এর সঙ্গে আপোস করেন?
জু. আ. ভু.: আমি অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে আমাকে মার্ক্সবাদী বলি। তাহলো, আমি মার্ক্সবাদের ততটুকুই গ্রহণ করেছি, যতটুকু অর্থনীতির সাথে জড়িত। মার্ক্সের ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক ব্যাখ্যা, জীবন সম্পর্কিত তত্ত্ব, ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্নÑ এসবকে আমি মানি না। মুসলিম হিসেবে আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি। সঠিক হোক আর ভ্রান্তই হোক আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ আছেন। বিশ্বাস এমন একটি জিনিস তার অস্তিত্ব থাকুক আর নাই থাকুক তার বিশ্বাসে দুর্বলতা নেই। যদি তিনি থাকেন, তাহলে এ নিয়ে তর্ক করা বৃথা। তিনি আমার মধ্যে। মার্ক্সবাদের দার্শনিক অথবা কাল্পনিক ব্যাখ্যায় আমি আল্লাহর নিন্দা করতে পারি না। একই সাথে আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, একজন মার্ক্সবাদী এবং একজন মুসলিম পাশাপাশিই চলতে পারে বিশেষ করে পাকিস্তানের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ছাড়া আমি কোনো সমাধান দেখি না।
আমি পাকিস্তান বলছি এজন্যে যে, আন্তর্জাতিক ক্রুসেড শুরু করার মতো কোন প্রসঙ্গ উত্থাপন করছি না। আমি অন্যের ব্যাপারে নাক গলাচ্ছি না। আমি শুধু আমার দেশের বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই। না, আমি এও স্বীকার করছি যে, বিপ্লবের কোন প্রক্রিয়ায় নয়। আমি শপথ করে বলতে পারি আমি একজন বিপ্লবী। কিন্তু আমি হঠাৎ ও রক্তাক্ত একটি বিপ্লবের ভার বহন করতে পারি না। পাকিস্তান সে ধরনের বিপ্লবের ভার সইতে পারবে না, সেটা হবে বিপর্যয়। অতএব আমাকে অগ্রসর হতে হবে ধৈর্যের সাথে। সংস্কারের মাধ্যমে পরিমাপ করে ক্রমশ দেশকে নিতে হবে সমাজতন্ত্রের পথে। যখন সম্ভব হবে জাতীয়করণ করতে হবে এবং যখন প্রয়োজন হবে জাতীয়করণ বাদ দিতে হবে। বিদেশী পুঁজি যা আমাদের প্রয়োজন তাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। আমার সময়ের প্রয়োজন। একজন সার্জনের মতো সয়ে সয়ে ছুরি চালাতে হবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আমাদের সমাজটা অসুস্থ। যদি অস্ত্রোপচারে মরে না যায় তাহলে সতর্কতার সাথে তাই করতে হবে। একটি আঘাত সেরে উঠার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সংস্কারকে সংহত করতে হবে। বহু শতাব্দী আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। একটি ভূমিকম্পের আচমকা ধাক্কায় নিজেদের জাগাতে পারি না। লেনিনকেও শুরুতে আপোষ করতে হয়েছিল।
ও. ফা.: মি. প্রেসিডেন্ট, বহু মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করে না। তারা বলেন, আপনি শুধু ক্ষমতাই চান, আর কিছু নয় এবং ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যে আপনি সবই করতে পারেন।
জু. আ. ভু. : না, এটা সত্যি নয়। গত তিন মাসে আমি যে কৃষি সংস্কার করেছি তাতে আমার পরিবার পঁয়তাল্লিশ হাজার একর জমি হারিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি হারিয়েছি ছয় থেকে সাত হাজার একর। আমাকে আরো জমি হারাতে হবে। আমার সন্তানরাও হারাবে। আল্লাহ সাক্ষী যে, আমি সামজতন্ত্রের নামে খেলছি না এবং কোনো সংকীর্ণ স্বার্থ সামনে রেখে আমি ধীরে ধীরে অগ্রসর হই না। যেদিন থেকে আমি মার্ক্স পড়েছি সেদিন থেকে আমার মালিকানায় কোন কিছুই দান করতে আমি ভয় পাই না। এখনো তার স্থান ও সময় বলতে পারি: বোম্বে ১৯৪৫ সাল। আমি শুধু ক্ষমতার অভিলাষী এই অভিযোগ প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই যে আসলে আমরা ‘ক্ষমতা’ শব্দটির দ্বারা কি বুঝি। ইয়াহিয়া খানের যে ক্ষমতা ছিল ক্ষমতা দ্বারা আমি তা বুঝি না। ক্ষমতা দ্বারা আমি বুঝি যা ব্যবহার করে পর্বতকে সমতল করা যায়, মরুভূমিকে পুষ্পিত করে তোলা যায়, এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যায় যেখানে জনগণ ক্ষুধা ও অত্যাচারে মারা যাবে না। আমার কোন অসৎ উদ্দেশ্য নেই। আমি একনায়ক হতে চাই না। কিন্তু যতটুকু আমি বলতে পারি, তাহলো আমাকে অত্যন্ত শক্ত হতে হবে, এমনকি কর্তৃত্ববাদী হতে হবে। ভাঙ্গা জানালা আমি মেরামত করছি। জানালার ভাঙ্গা টুকরো আমি দূরে নিক্ষেপ করছি। অসতর্কভাবে যদি এগুলো নিক্ষেপ করি তাহলে আমি একটি দেশ পাবো না, আমি পাবো একটি বাজার।
সে যাই হোক, শুধু হাসি-ঠাট্টা করার জন্যে কেউ রাজনীতি করে না। রাজনীতি করার উদ্দেশ্যই হলো ক্ষমতা হাতে নেয়া এবং তা রক্ষা করা। এর উল্টো যদি কেউ বলে তাহলে সে মিথ্যুক। রাজনীতিবিদরা সব সময় আপনাকে এ বিশ্বাস দিতেই সচেষ্ট যে তারা ভালো, নৈতিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ। কিন্তু কোনদিন তাদের ফাঁদে পা দেবেন না। ভালো, নৈতিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বলে কিছু নেই। রাজনীতি হলো দেয়া-নেয়ার বিষয়। আমার পিতা বলতেন, ‘কারো দ্বারা দু’বার আঘাতপ্রাপ্ত হবার প্রস্তুতি না নিয়ে কখনো কাউকে আঘাত করবে না।’ এরপর কিছু শিখেছি বয় স্কাউট থাকাকালে। কিন্তু আমি অনেক কিছু ভুলেও গেছি।
ও. ফা.: তারা বলে, আপনি মুসোলিনী, হিটলার ও নেপোলিয়ান সম্পর্কিত বইপত্রের একনিষ্ঠ পাঠক।
জু. আ. ভু.: অবশ্যই। তাছাড়া দ্য’গল, চার্চিল, স্ট্যালিন-এর উপর লিখিত বইও পড়ি। আপনি কি আমাকে এ কথা স্বীকার করাতে চান যে, আমি একজন ফ্যাসিস্ট। না, আমি ফ্যাসিস্ট নই। একজন ফ্যাসিস্ট প্রথমত সংস্কৃতির শত্রু। কিন্তু আমি সংস্কৃতি দ্বারা পরিশীলিত একজন বুদ্ধিজীবী। একজন ফ্যাসিস্ট ডানপন্থী, কিন্তু আমি বামপন্থী। একজন ফ্যাসিস্টের চরিত্র পেটি বুর্জোয়ার। কিন্তু আমি এসেছি আভিজাত্য থেকে। কোন লোক সম্পর্কে পাঠ করার অর্থ তাকে আপনার নায়ক হিসেবে সৃষ্টি নয়। আমি যখন ছাত্র ছিলাম তখন আমার কিছু নায়ক ছিল। কারো মাঝে নায়কের অস্তিত্ব চুইংগামের মতো চিবিয়ে ফেলে দেয়া বা বিভিন্ন আকার দেয়ার মতো-বিশেষ করে আপনি যখন তরুণ। আপনি যদি জানতে চান কাদেরকে আমি দীর্ঘদিন চিবিয়েছি, জেনে নিন-চেঙ্গিস খান, আলেকজান্ডার, হ্যানিবল, নেপোলিয়ান। হ্যাঁ, নেপোলিয়ানকেই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগতো। কিন্তু আমার মনে মাজিনি, ক্যাভর, গ্যারিবল্ডিরও কিছু কিছু স্থান ছিল। রুশোর প্রভাব ছিল যথেষ্ট। আপনি নিজেই আমার মধ্যে বিস্তর স্ববিরোধিতা দেখতে পাচ্ছেন।
ও. ফা.: তাই বলুন। আপনাকে আর একটু ভালোভাবে বুঝার জন্যে প্রশ্ন করতে চাই, আমাদের সময়ের কোন নেতাকে আপনি খুব ঘনিষ্ঠ বলে অনুভব করেনÑ যাদেরকে আপনি পছন্দ করেন অথবা যারা আপনাকে বেশি পছন্দ করে।
জু. আ. ভু. : একজন সুকর্ণ। তিনি আমার ভক্ত এবং আমি তার ভক্ত। তার সকল দুর্বলতা সত্ত্বেও তিনি একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। যেমন নারীর সাথে তার সম্পর্কটা অমার্জিত। এটা প্রয়োজনীয়ও নয়, কিংবা পৌরুষোচিতও নয়। কিন্তু তিনি সেটা উপলব্ধি করেন না। তাছাড়া তিনি অর্থনীতি বুঝেন না। দ্বিতীয়জন নাসের। তিনি অত্যন্ত উঁচু দরের ব্যক্তিত্ব। তার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে ভালোবেসেছেন, আমিও তাকে ভালোবাসতাম। ১৯৬৬ সালে আমাকে যখন সরকার ত্যাগে বাধ্য করা হয়, তখন নাসের আমাকে মিশরে আমন্ত্রণ করেন এবং রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদায় আমাকে স্বাগত জানান। তিনি বলেছেন, যতদিন আমার প্রয়োজন আমি সেখানে থাকতে পারি।
এরপর ধরুন স্ট্যালিনের কথা। হ্যাঁ স্ট্যালিন। তার প্রতি বরাবর আমার গভীর শ্রদ্ধা। অন্তর থেকে অনুভব করি সে শ্রদ্ধা, ঠিক ক্রুশ্চেভের প্রতি যতটা বিদ্বেষ অনুভব করি সেরকম। ক্রুশ্চেভকে আমি কখনো পছন্দ করিনি। একথাটা বললেই বোধকরি আপনি ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। আমি সবসময় তাকে ভেবেছি একজন দাম্ভিক হিসেবে। সবসময় তার সদম্ভ আচরণ, চিৎকার, রাষ্ট্রদূতদের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ, মদ্যপান... এবং সবসময় আমেরিকানদের গালিগালাজকে আমি পছন্দ করিনি। ক্রুশ্চেভ এশিয়ার অনেক ক্ষতি করেছেন। সবশেষে বলতে চাই... আমি জানি আপনি আমার থেকে মাও সেতুং সম্পর্কে কিছু শোনার প্রতীক্ষা করছেন। কিন্তু মাও সেতুং-এর মতো মহান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আমার কাছে কি শুনতে চান? বরং চৌ এন লাই সম্পর্কে আমার পক্ষে বলা সহজ। এমন একজন যাকে আমি ভালোভাবে জানি। তার সাথে দীর্ঘসময় ধরে আমি কথা বলেছি, আলোচনা করেছি। অফুরন্ত আলোচনা, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনের পর দিন। কমপক্ষে বছরে একবার আমাদের সাক্ষাৎ হতো। ১৯৬২ সাল থেকে আমি চীনে যাচ্ছি এবং চৌ এন লাই-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করছি। আমি তার প্রশংসা করি।
ও. ফা.: মি. প্রেসিডেন্ট, যাদের কথা বললেন তাদের সকলকেই ক্ষমতা লাভের জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু আপনি তো তা করেননি।
জু. আ. ভু.: আপনি ভুল বলছেন। এখানে পৌঁছাটা আমার জন্যে খুব সহজ ছিল না। আমি কারারুদ্ধ ছিলাম। অনেকবার আমার জীবনের উপর ঝুঁকি এসেছে। আইয়ুব খানের সময়ে, ইয়াহিয়া খানের সময়। তারা আমার খাবারে বিষ প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা করেছে, গুলিবর্ষণ করেছে। ১৯৬৮ সালে দু’বার আমার প্রাণনাশের চেষ্টা হয়, ১৯৭০ সালে একবার। দু’বছর আগে সংঘরে ইয়াহিয়া খানের প্রেরিত হত্যাকারীদের সাথে পাল্টা গোলাগুলির মধ্যে আমি ঘণ্টাখানেক আটকা পড়ে ছিলাম। আমাকে ঘিরে রাখা এক ব্যক্তি নিহত হয়। অন্যেরা গুরুতর আহত হয়। এছাড়া মানসিক পীড়নের কথাই ভাবুনÑ আপনার জন্ম হয়েছে ধনবান পরিবারে এবং রূপান্তরিত হয়েছেন একজন সমাজতন্ত্রিতেÑ কেউ আপনাকে বিশ্বাস করবে না। আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও এ নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করবে। এমনকি দরিদ্র লোকজন আপনার নিষ্ঠার প্রতি আস্থাশীল হবে না। বুলেটের হাত বা বিষ থেকে রক্ষা পাওয়া আমার জন্যে কঠিন কাজ নয়। আমাকে যে কিছু লোক বিশ্বাস করছে না, সেটাই আমার কাছে গুরুতর। যে প্রাচুর্যের মধ্যে আমি জন্মগ্রহণ করেছি তা আমাকে আলাদীনের উড়ন্ত গালিচায় বসায়নি। রাজনীতিকে যদি আমার পেশা হিসেবে না নিতাম...।
ও. ফা.: এ পেশার সূচনা হলো কিভাবে?
জু. আ. ভু.: আমি যখন একজন বালক, তখন থেকেই এটা ছিল। কিন্তু আমরা যদি মনোবিশ্লেষক হিসেবে কাজ করতে চাই, তাহলে বলতে হয়, আমি এর উত্তরাধিকার পেয়েছি আমার পিতার নিকট থেকে। আমার পিতা একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ছিলেন। কিন্তু বেশ আগেই তিনি রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেনÑ একটি নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর। রাজনীতি সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল টনটনেÑ আভিজাত্যের রাজনীতি জ্ঞান। আমাকে এমনভাবে বলতেন, তাতে আমার মধ্যে অনুপ্রেরণা জাগতো। তিনি আমাকে লারকানায় ঘুরিয়ে আনতেন। প্রাচীন মন্দির, জাঁকজমকপূর্ণ বাড়ি, আমাদের সভ্যতার কীর্তি দেখাতেন এবং বলতেন, ‘রাজনীতি হচ্ছে একটি মন্দির বা ভবন নির্মাণের মতো’ তিনি আরো বলতেন যে, রাজনীতি সংগীত রচনার মতো অথবা কবিতা লেখার মতো। তিনি ব্রাহমা, মাইকেল্যাঞ্জেলো’র কথা বলতেন। আমার মা ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন। তিনি এসেছিলেন দরিদ্র পরিবার হতে এবং অন্যান্য লোকের দারিদ্র্য তাকে পীড়িত করতো। তিনি বার বার শুধু বলতেন, ‘আমাদেরকে দরিদ্রের প্রতি যতœবান হতে হবে, দরিদ্রকে সাহায্য করতে হবে; দরিদ্রকে পৃথিবীতে বাঁচতে দিতে হবে ইত্যাদি।
আমি যখন আমেরিকা গেলাম, তার এসব কথা আমার কানে বাজতো। আমি একজন সংস্কারবাদী হলাম। আমি আমেরিকায় ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় পড়াশুনা করতে গিয়েছিলাম, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের একজন বিখ্যাত জুরিস্ট পড়াতেন। আমি আন্তর্জাতিক আইনে আমার ডিগ্রি নিতে চেয়েছিলাম। তখন যুগটা ছিল ম্যাকার্থিজমের। কমিউনিস্ট অনুসন্ধানের সময় আমার ইচ্ছা উবে গেল। সানসেট বুলভার্ড থেকে, লাল নেইল পলিশ করা মেয়েদের থেকে দূরে থাকার জন্যে আমি ম্যাক্সওয়েল স্ট্রিটে নিগ্রোদের সাথে বসবাস শুরু করলাম। এক সপ্তাহ, এক মাস। ওদের সঙ্গ আমার ভালো লাগলোÑ তাদের মাঝে কৃত্রিমতা নেই। তারা জানতো কি করে হাসতে হয়। আমি যখন স্যান ডিয়েগোতে গেলাম, একটা হোটেলে থাকার জায়গা পেলাম না, কারণ তামাটে চামড়ার রং এ আমাকে একজন মেক্সিকানের মতোই দেখতে। এরপর আমি ইংল্যান্ড গেলাম। তখন আলজিরিয়ার বিপ্লবের সময়। আলজিরীয়দের পক্ষ নিলাম আমি। কিন্তু ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে আমি সেøাগান দিতে যেতাম না। হয়তো আমি কিছুটা লাজুক ছিলাম। জনতার মধ্যে মিশে যেতে আমি কখনো পছন্দ করতাম না, বিক্ষোভে অংশ নিতাম না। আমি সবসময় লেখার মাধ্যমে আলোচনাকে প্রাধান্য দিয়েছি, রাজনীতির খেলায় সংগ্রাম করতে পছন্দ করেছি। এটা অনেক বুদ্ধিদীপ্ত এবং পরিশীলিত।
ও. ফা.: আমার শেষ প্রশ্ন মি. প্রেসিডেন্ট। এই নির্দয় প্রশ্নের জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনি কি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন  বলে মনে করেন?
জু. আ. ভু.: জবাবটা এভাবে দেই। আমি আগামীকালই শেষ হয়ে যেতে পারি। কিন্তু এ যাবৎ যারা পাকিস্তান শাসন করেছে আমি তাদের যে কারো চেয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকবো বলেই মনে করি।প্রথমত আমি স্বাস্থ্যবান ও শক্তিতে পরিপূর্ণ। আমি কাজ করতে পারি, এমনকি দৈনিক আঠার ঘণ্টা কাজ করি। দ্বিতীয়ত আমি এখনো তরুণ- আমার বয়স বড়জোর চুয়াল্লিশ, মিসেস গান্ধীর চেয়ে দশ বছরের ছোট। তৃতীয়ত আমি জানি, আমি কি চাই। আমিই তৃতীয় বিশ্বের একমাত্র নেতা যে দু’টি বৃহৎ শক্তির বিরোধিতা সত্ত্বেও রাজনীতিতে ফিরে এসেছি। ১৯৬৬ সালে আমাকে বিপদগ্রস্ত দেখে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই খুশি হয়েছিল। আমি যে বিপদ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছি, তার কারণ। আমি এই পেশার মৌলিক নীতি জানি। সে নীতিটি কি? রাজনীতিতে আপনাকে কখনো কখনো এমন ভাব করতে হয়, যাতে অন্যেরা বিশ্বাস করে যে, একমাত্র তারাই বুদ্ধিমান। কিন্তু এটা করতে একটু হালকা এবং শিথিল অঙ্গুলি থাকতে হবে এবং...। আপনি কি কখনো পাখীকে তার বাসায় ডিমের উপর তা দিতে দেখেছেন? একজন রাজনীতিবিদের সেই হালকা আঙ্গুল পাখীর নিচের ডিমগুলো সরিয়ে আনার যোগ্যতা থাকতে হবে। একটি একটি করে। যাতে পাখীটি কিছুতেই টের না পায়।
(করাচি, এপ্রিল ১৯৭২)
(চলবে)

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

M. Ekhlas

২০১৭-০৭-২৯ ১৬:১৯:৫৭

তাহলে মহান নেতা, জাতির বিবেক, পল্লিবন্ধু একজন রাজনিতিবিদ!

আপনার মতামত দিন

মসজিদে গুলি ছোড়ার পর পাল্টে গেল এক মার্কিনীর জীবন

দৃশ্যপট একই

আয় বৈষম্য বাড়ায় চাপে মধ্যবিত্ত

নকলা উপজেলা চেয়ারম্যানের লাশ উদ্ধার

রিভিউর প্রস্তুতি

বাংলাদেশির বীরত্বে ধর্ষকদের হাত থেকে রক্ষা পেলো ইতালীয় তরুণী

ঢাবিতে ‘ঘ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁস?

সিলেট টার্মিনালে গুলিবর্ষণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি

রোহিঙ্গা স্রোত থামছে না

বড় দুই দলেই প্রার্থীর ছড়াছড়ি

সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবেছে চট্টগ্রাম

টানা বৃষ্টিতে নগরজুড়ে দুর্ভোগ

নিম্নমানের কাগজে ছাপা হচ্ছে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই

দিনে গড়ে দেড় হাজার মামলা

‘বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে’

পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে রোহিঙ্গাদের উপর আক্রমণ: মতিয়া চৌধুরী