বেহাল ছাত্রদল

শিক্ষাঙ্গন

ফররুখ মাহমুদ | ২৫ জুলাই ২০১৭, মঙ্গলবার
বিএনপি’র ভ্যানগার্ড নামে পরিচিত ছাত্রদল। এক সময়ের প্রতাপশালী এই সংগঠনটির বর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থা। ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলগুলো জোরদার করতে পারছে না সংগঠনটি। এমনকি নিজেদের ঘোষিত কর্মসূচিও জোরালোভাবে পালিত হচ্ছে না। রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচি থাকলেও শিক্ষার্থী বান্ধব তেমন কোন কর্মসূচি নেই ছাত্রদলের। এসব নিয়ে নানা সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ।
সংগঠন সংশ্লিষ্টরা জানান, শীর্ষ নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতা, নেতাদের অবমূল্যায়ন, এলাকাপ্রীতি, দলের চেয়ে গ্রুপকে প্রাধান্য দেয়া, ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক সক্রিয় না থাকা, কর্মী সংকট, ক্ষমতাসীন সরকারের দমন-পীড়নের কারণে শক্তিশালী এই সংগঠনটি ক্রমেই দূর্বল হয়ে পড়েছে।
২০১৪ সালের ১৪ই অক্টোবর সভাপতি রাজীব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানকে দায়িত্ব দিয়ে নতুন কমিটি করা হয়েছিলো। খসড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর। এই কমিটি প্রায় নয় মাস আগে নির্ধারিত সময় পার করেছে। কিন্তু এখনও নতুন কমিটি গঠন করতে পারেনি। কমিটির দাবিতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয় ও নয়া পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পদ প্রত্যাশীরা বেশ কয়েকবার মিছিল ও শোডাউন করেছে। এদিকে রীতি অনুযায়ী নতুন কমিটি বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজারে ফুল দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। এই কমিটি তাদের নির্ধারিত সময় পার করলেও এখনো মাজারে ফুল দিতে যেতে পারেনি। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি’র সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করার রীতি থাকলেও তা করা হয়নি।
সংগঠনটির দপ্তর সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে সংগঠনটির ১০৭টি সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে। এরমধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক ইউনিট রয়েছে ২৯টি। যার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি রয়েছে মাত্র ৭টি ইউনিটে। ইউনিটগুলো হলো- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, তিতুমীর কলেজ ও সরকারী বাঙলা কলেজ, মিরপুর। এগুলোর মধ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি বিগত কমিটির আমলে পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। বাকী ইউনিটগুলোতে আংশিক কমিটি রয়েছে। ঢাকা কলেজ ও তিতুমীর কলেজে ঢাউস কমিটি করা হয়েছে। এই দুই কমিটির প্রত্যেকটিতে প্রায় ৭শ’ নেতাকর্মীকে স্থান দেয়া হয়েছে। এধরনের ঢাউস কমিটির কারণে সংগঠনটিকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।   
বর্তমান কমিটি শিক্ষার্থী বান্ধব কোন কর্মসূচি দিতে পারেনি। ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক কয়েকটি ইস্যুতে বিবৃতিতে দিয়ে দায় সেরেছে সংগঠনটি। সর্বশেষ গত ৬ই এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাপযোগী ক্যাম্পাস বিনির্মাণে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ২৫টি দাবি’ সম্বলিত লিফলেট বিতরণ করা হয়। এরপর দাবিগুলো আদায়ে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি দলটির নেতাকর্মীদের। তবে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট বিরোধী সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের আন্দোলনে সংগঠনটি সংহতি জানিয়েছিলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ছাত্রসংগঠনগুলো নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু বিগত সাত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারেনি ছাত্রদল। ছাত্রদলের দাবি ছাত্রলীগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার কারণে তারা ক্যাম্পাসে আসতে পারে না। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর উপর ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের কিছু বিদ্রোহী নেতাকর্মীর হামলায় পর থেকে আর ক্যাম্পাসে আসতে পারেনি তারা। গত কমিটি কয়েকটি ইস্যুতে ক্যাম্পাসে আসার চেষ্টা করলেও বর্তমান কমিটির এধরনের কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মসূচি দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে কয়েক মিনিটের খন্ড খন্ড ঝটিকা মিছিল নজরে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে পাঠানো কর্মসূচির ছবিগুলোতে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কর্মসূচি পালনের চেয়ে ছবি তুলতেই বেশি ব্যস্ত নেতাকর্মীরা। এদিকে দেশের কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম নেই ছাত্রদলের। ছাত্রলীগ একক আধিপত্যে রয়েছে। ছাত্রদলের ক্যাম্পাস বিমুখতার কারণে সংগঠনটি কর্মী সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসগুলোতে অবস্থান না থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে না। একই সঙ্গে নেতাদের গ্রুপিং রাজনীতির কারণে অনেকে ছাত্রদলের রাজনীতিতে নিজেকে জড়ানো থেকে বিরত থাকেন। সর্বশেষ তেজগাঁও কলেজে ছাত্রলীগের সঙ্গে সহাবস্থান থাকলেও সেখান থেকেও তারা বিতাড়িত হয়। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে তেজগাঁও কলেজ শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়েলকে কুপিয়ে আহত করে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আহসান সোহেল। এরপর কলেজ প্রাঙ্গণে ছাত্রদলকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে মিছিল করে ছাত্রলীগ। এই ঘটনায় সোহেলকে ছাত্রদল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমান কমিটির সভাপতি রাজীব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক নিজ নিজ এলাকায় বেশি সময় দেয়ার কারণে সংগঠনের কাজকর্ম স্থবির হয়ে পড়েছে বলে জানা যায়। বর্তমান কেন্দ্রিয় কমিটি ৭৩৪ সদস্য বিশিষ্ট। এতো বড়ো কমিটি ছাত্রদলের ইতোপূর্বে হয় নি। কেন্দ্রীয় নেতারা একে অপরকে চেনেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি কমিটিতে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ করেন বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। তারা বলেন, থানার যুগ্ম সম্পাদককে কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য পদ দেয়া হলেও ওই থানার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে কোন পদেই রাখা হয় নি। এছাড়া বিভিন্ন ইউনিয়নের নেতারা কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেলেও জেলার নেতারা সেটা জানেন না বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ বিষয়ে ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. আবদুস সাত্তার পাটোয়ারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে পদ পেয়েছে বলে শোনা যায়। এদিকে বর্তমান কমিটির মেয়াদে কোন সাধারণ সভা ও সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠে। বিভিন্ন জেলা কমিটিগুলো কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নিজেরাই আলোচনা করে দিয়ে দেন। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় অন্য নেতাদের মতামত জানতে চাওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাজীব আহসান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। তারা ইউনিটগুলোতে প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করে। সরকারের দমন পীড়নের কারণে কয়েকটি ইউনিটে প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করতে পারছেনা। তবে সময়ের প্রয়োজনে ও সুযোগ তৈরী হলে ওইসব ইউনিটগুলোতে দায়িত্বরতদের দৃশ্যমান কর্মকান্ড দেখতে পাবেন। সাধারণ সভা ও সাংগঠনিক কমিট গঠন না করার বিষয়ে তিনি বলেন, সকল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও পুলিশী বাধার কারণে এসব কমিটিগুলো গঠন করা হয়নি। সাধারণ সভা করার পরিবেশ ছিলো না। পুলিশ আমাদের একত্রিত হওয়ারই তো সুযোগ দেয় না। ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক কোন কর্মসূচি না থাকার বিষয়ে ছাত্রদল সভাপতি বলেন, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে কর্মসূচি দেয়া হয়নি।
দ্বন্দ্বে নিষ্ক্রিয় ঢাবি ছাত্রদল
এদিকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। স্বেচ্ছাচারিতা, নেতাদের মূল্যায়ন না করা, সংগঠনের চেয়ে ব্যক্তি কেন্দ্রিক রাজনীতিকে প্রাধান্য দেয়ায় দ্বন্দ্ব প্রকট হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী দাবি করেছেন, দ্বন্দ্ব নিরসনে তারা বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বিরোধীরা বলছেন, বারবার ভুল করার পরও সুযোগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সুযোগের সদ্ব্যবহার তারা করতে পারেনি। এমনকি কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান বারবার চেষ্টা করেও সমস্যা নিরসন করতে পারেন নি। সূত্র জানায়, দ্বন্দ্বের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় দুুইটি গ্রুপের সৃষ্টি হয়েছে। শাখা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ রয়েছে। সুপার ফাইভের বাকীদের নেতৃত্বে অপর একটি গ্রুপ রয়েছে। সুপার ফাইভের বাকীরা হলেন- সিনিয়র সহ সভাপতি তানভীর রেজা রুবেল, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবু তাহের। বিভিন্ন কর্মসূচী তারা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকে বাদ দিয়ে আলাদাভাবে পালন করেন। অন্যদিকে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা আলাদা কর্মসূচী পালন করছেন।
২০১৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও হলশাখাগুলোর কমিটি গঠন করা হয়। এক বছর মেয়াদি বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি ইতোমধ্যে তাদের মেয়াদ শেষ করেছে। হল কমিটিগুলোর মেয়াদ ছিলো তিন মাস। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও হল কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করা হয় নি। সূত্র জানায়, কমিটি গঠনের পর থেকে সবার সহযোগিতায় কার্যক্রম চললে তা বেশি দিন স্থায়ী হয় নি। বিশ্ববিদ্যালয় ও  হল কমিটিতে বাদ পড়াদের অন্তর্ভূক্তির বিষয়ে প্রথম মতভেদ দেখা দেয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে সুপার ফাইভের বাকীদের। বাদ পড়াদের কমিটিগুলোতে অর্ন্তভূক্তির জন্য জোরালো দাবি তুলেন তারা। পরে দাবির প্রেক্ষিতে বাছাই কমিটি করা হয়। বাছাই কমিটি আগ্রহীদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে অর্ন্তভূক্তির জন্য সুপারিশ করে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করেননি সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার বলেন, বাছাই কমিটির সুপারিশ আমরা পেয়েছি। তবে এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় না। তাই একটু সময় নিয়েছি। তারা কর্মসূচিগুলোতে অংশগ্রহণ করুক। এরপর তাদের কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করা হবে।
এদিকে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক রাজনৈতিক প্রটোকল মানেন না বলে অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন নেতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে। কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক না রেখে ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক পদ রাখা হয়েছে। সদস্য সচিবের চেয়ে প্রোটোকলে ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক আগে না পরে এনিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরী হয়। এ বিষয়ে সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবু তাহের বলেন, ‘বিভিন্ন কর্মসূচীতে অংশ নেয়ার জন্য আমাকে হলগুলোতে ফোন করতে হয়। সদস্য সচিব ও যুগ্ম আহ্বায়কের মধ্যে প্রোটোকল সমস্যার কারণে আমারও সমস্যা হয়। সদস্য সচিবকে কল দিলে যুগ্ম আহ্বায়ক রাগ করে। আবার যুগ্ম আহ্বায়ককে কল দিয়ে সদস্য সচিব রাগ করে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে বারবার বলা হলেও সমাধান করেনি। পরে তারা বলেছেন, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আহ্বায়ক, ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব তিনজনই থাকবে।’
সর্বশেষ ‘ভয়েস অব কালুরঘাট’ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রকাশনার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও প্রোটোকল ভাঙ্গা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বিরোধীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো কমিটি মিলে প্রকাশনার কাজ করেছে। নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র নেতারাসহ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার হাতে প্রকাশনাটি তুলে দেবেন। কিন্তু এবার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দুইজনই এ কাজ সেরেছেন। এছাড়া কাউকে বক্তৃতাও করতে দেয়া হয় নি। তারা আরও বলেন, বিএনপি নেত্রীর সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচীতে সিনিয়ররাই স্লোগান দেয়। সে রীতি তারা ভঙ্গ করেছেন। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক একটি হলের সদস্য সচিবকে ডেকে এনে স্লোগান দিতে বলেন। মূলত এ ঘটনার পর থেকেই আলাদা ভাবে কর্মসূচী পালন করা শুরু করে গ্রুপ দুইটি। গত ২২শে মে প্রথম এ ধরনের কর্মসূচী পালন করা হয়। এবিষয়ে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বলেন, ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) শর্ট টাইম সময় দিয়েছিলেন। আমাদেরও যাওয়ার বিষয়টি এক ঘন্টা আগে কনর্ফাম করা হয়েছিলো। ম্যাডাম যেহেতু নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছেন তাহলে আমরা কিভাবে প্রোগ্রামের সময় বাড়াবো। তবে ওই প্রোগ্রামে সিনিয়র সবার নাম বলেছি। পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। স্লোগান দেওয়ানোর বিষয়ে যে সবচেয়ে সুন্দর স্লোগান দিতে পারে তাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড়ো কথা যে স্লোগান দিয়েছে সে তো আমাদেরই কেউ। এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হীণমন্যতার পরিচয়।
বর্তমান কমিটি তাদের সময়ে শিক্ষার্থী বান্ধব কোন কর্মসূচি দিতে পারে নি। একই সঙ্গে কেন্দ্র ঘোষিত কোন কর্মসূচি ছাড়া ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক উল্লেখযোগ্য কোন কর্মসূচি তারা পালন করতে পারেনি। তাছাড়া উভয় পক্ষই যে কর্মসূচিগুলো পালন করেছে সেগুলোর স্থায়ীত্ব ছিলো খুবই কম। শীর্ষ দুই নেতার বিরোধী পক্ষের অভিযোগ, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে বারবার কর্মসূচি দিতে বললেও তারা সেটা করেনি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠলেও সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কারণে কোন কর্মসূচি পালন করা যায়নি বলে অভিযোগ তাদের। জানতে চাইলে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বলেন, কর্মসূচি দেয়ার চেষ্টা করেছি। ভিসির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে কোন সহযোগিতা পাই নি। এছাড়া কর্মসূচি দেয়ার মতো কোন পরিস্থিতি ছিলো না। ক্যাম্পাসে আমাদের অনেক নেতাকর্মীকে নির্যাতন করা হয়েছে। টিএসসিতে শিক্ষকের সামনে থেকে একজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে পুলিশে দেয়া হয়েছে। তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সব নেতাকর্মীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। হুটহাট করে তো কোন কর্মসূচি দেয়া যয় না।
এছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন কর্মসূচীতে যেসব নেতাকর্মীরা আটক হয় তাদের মুক্তির পর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীদের পার্টি অফিসে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়। কিন্তু বাকীদের সঙ্গে যোগাযোগই করা হয় না। এ বৈষম্যগুলোর কারণে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরী হয়েছে। এ বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী বলেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে কথা বলেছি। যাতে কারাগার থেকে মুক্তি প্রাপ্ত সবাইকে ম্যাডামের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়। সময়-সুযোগ না হওয়ায় সেটা এখনো সম্ভব হয় নি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যানারে কয়েকটি কর্মসূচিতে ব্যানারে সামনে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক অবস্থান করার কারণেও বাকীদের সঙ্গে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে সভাপতি মেহেদী তালুকদার বলেন, সাধারণ সম্পাদকের পায়ে সমস্যা ছিলো। তাই এক/দুইটা প্রোগ্রামে সে সামনে ছিলো।
সূত্র জানায়, ঈদের আগে কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান ও ঈদের পর সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের সঙ্গে দফায় দফায় মিটিং করেও সমস্যার কোন সুরাহা হয় নি। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র সহ সভাপতি তারভীর রেজা রুবেল বলেন, আমাদের অভ্যন্তরে কিছু সমস্যা হচ্ছে। সমস্যাগুলো নিরসনেরও চেষ্টা করা হচ্ছে। সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান বলেন, বারবার উদ্যোগ নিয়ে বসার পরেও সমস্যার সমাধান তারা করেনি। এক্ষেত্রে তাদের সদিচ্ছার অভাব ছিলো বলে মনে করি। এছাড়া বর্তমান কমিটির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। আশা করি নতুন কমিটি হওয়ার মধ্য দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান হবে। আরেক যুগ্ম সম্পাদক শাহ নেওয়াজ বলেন, বর্তমান কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নিজেদের ইচ্ছা মতো কাজ করেছে। ক্যাম্পাসে যাওয়ার কোন ইচ্ছা তাদের ছিলো না। যার কারণে তাদের সঙ্গে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে।
এসব বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকায় প্রশাসন সুযোগ পেয়ে গেছে। আমাদের কমিটি ক্যাম্পাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়েছি। ভিসিকে স্মারক লিপি দিয়েছি। ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক যোগাযোগ বেড়েছে। শীঘ্রই ক্যাম্পাসে আমাদের যে অধিকার সে অধিকার আদায়ে জোরালো কর্মসূচি আসবে।
সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী বলেন, যে অভিযোগগুলো এসেছে তার কোন ভিত্তি নেই। অনেকবার সমাধানের চেষ্টা করেছি। তারা সহযোগীতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসে নি। সহযোগীতার মনোভাব থাকলে এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতো না। যারা অভিযোগ করেছে তারা একটি বলয়ে রয়েছে। যে ধরনের অপপ্রচার করা হচ্ছে এটা তাদের ব্যক্তিগত এজেন্ডা। তবে এই সমস্যাগুলোকে রাজনীতির চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অভিহিত করেছেন কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান। তিনি বলেন, রাজনীতির চলমান প্রক্রিয়ায় এধরনের ছোটখাটো কিছু বিষয় হতে পারে। এগুলো সমাধানযোগ্য। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সবাই একসঙ্গে দলের প্রয়োজনে কাজ করবো আশা করি। সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান বলেন, এক সঙ্গে চলতে গেলে কিছু সমস্যা হয়। অভিযোগগুলি পেয়েছি। সমাধানের প্রক্রিয়া চলছে। আশা করি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে এক সঙ্গে কাজ করবো।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

বিদেশি হস্তক্ষেপ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না : বেইজিং

এই দুর্ভোগের শেষ কবে?

সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতি ৪০ হাজার কোটি টাকা

ইসির সার্ভারে প্রবেশাধিকার চেয়েছিল বিদেশি কোম্পানি

অপরাধীদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না

আওয়ামী লীগের সদস্য হতে পারবেন না যারা

টানা বৃষ্টিতে চড়া কাঁচাবাজার

ছাত্রলীগ নেতাসহ তিনজন চারদিনের রিমান্ডে

রোহিঙ্গা শিবিরে সীমাহীন দুর্ভোগ

মালয়েশিয়ায় ভূমিধসে তিন বাংলাদেশি নিহত

ঘুষখোর সরকারি কর্মকর্তারা দুদকের ‘ফাঁদ মামলা’ আতঙ্কে

টানা বৃষ্টিতে অচল চট্টগ্রাম

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশ উন্নত হবে

বিজয়ের ধারাবাহিকতা না পুনরুদ্ধার

সোনাজয়ী শুটার হায়দার আলী আর নেই

মালয়েশিয়ায় ভূমি ধসে তিন বাংলাদেশি নিহত