ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার বই নিয়ে সংকট

এক্সক্লুসিভ

নূর মোহাম্মদ | ১৮ জুলাই ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৩৪
  আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীর সব ভাষায় লিপি নেই, সাহিত্য নেই, লেখা নেই। যেটা আছে সেটিও হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। আদিবাসীদের সেই ভাষা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের ২ লাখ ৮০ হাজার বই ছাপানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু সেই উদ্যোগে ভাটা লেগেছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে। এদিকে সংসদীয় কমিটির নির্দেশনার পর এবারও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের শিশুরা মাতৃভাষায় বই পাচ্ছে না। কারণ এই সম্প্রদায়ের মধ্যে দুটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। একটি গ্রুপ চাচ্ছে রোমান হরফে আরেক গ্রুপ চাচ্ছে বাংলা হরফে বই ছাপা হোক। একটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন রাজশাহী অঞ্চলের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা অন্যটি আদি সাঁওতাল। এই দোলাচলে কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারেননি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিবিটি)।  কর্মকর্তারা বলছেন, আদিবাসীদের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে এটা বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত। এই ভাষাগুলো হারিয়ে গেলে আমাদের সংস্কৃতির বড় ক্ষতি হবে। এজন্য তাদের নিজস্ব ভাষায় বই ছাপানোর উদ্যোগ। কারণ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাচ্চারা মায়ের কোল থেকে নেমেই সে প্রথমে যে স্কুলে যায়, সেখানে বাংলা ভাষায় পড়ানো হয়। কিন্তু সে বাংলা ভাষায় বলা কথা বুঝতে পারে না।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, আমলতান্ত্রিক জটিলতার কারণে পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণির প্রায় দুই লাখ ৮০ হাজার বিনামূল্যের বই ছাপা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত এসব বই ছাপার জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) নির্দেশনা দেয়নি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে নির্দেশনা দেয়া হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম বারের মতো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রী এ পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদানের জন্য বই দেয়া হয়। এসব বই সংশ্লিষ্ট ভাষার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়। এবছর ২৪ হাজার ৬৪১ জন শিশুর জন্য ৫১ হাজার ৭৮২টি বই বিন্যামূলে বিতরণ করা হয়। একই সঙ্গে শিুশুদের পাঠদানের জন্য ২৫ হাজার পাঁচ শত টিচিং ম্যাটারিয়াল (ফ্লি চার্ট, ফ্লাশ কার্ড, স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্চনবর্ণ চার্ট) সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে যারা প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে আগামী শিক্ষাবর্ষে এসব শিশু প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবে। একই সঙ্গে নতুন করে এসব ভাষার শিশুরা প্রাক প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তি হবে। প্রথম শ্রেণির জন্য এক লাখ এবং প্রাক প্রাথমিক শ্রেণির জন্য এক লাখ ৮০ হাজার পাঠ্যবই ছাপার পরিকল্পনা করে এনসিটিবি। এজন্য ব্যয় নির্বাহের জন্য এক কোটি টাকা অর্থ ছাড় করতে গত ২৬ই জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে পত্র দেয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় গতকাল পর্যন্ত অর্থ ছাড় করেনি। নতুন করে বই ছাপানো হবে কিনা তাও জানায় নি। এসব কারণে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষায় বই ছাপা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ ব্যাপারে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) মিয়া ইনামুল হক রতন সিদ্দিকী বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার বই ছাপানোর জন্য বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে হয়। এসব বিশেষজ্ঞ পাওয়া দুষ্কর। পেলেও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। পাণ্ডুলিপি তৈরির পরে দরপত্র আহ্বান করা। এরপর দরপত্র যাচাই-বাছাই শেষে বিশ্বব্যাংকের ছাড়পত্র নিয়ে যারা বই ছাপার কাজ পাবেন তাদের বই সরবরাহ করতে অন্তত ৯০ দিন সময় দিতে হয়। এই প্রক্রিয়া শেষ করা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। কিন্তু জুলাই মাসের অর্ধেক শেষ হলেও এখন পর্যন্ত  মন্ত্রণালয় বই ছাপার নির্দেশনা দেয়নি। ১লা জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়া নিয়ে ৯০ শতাংশ ঝুঁকি  রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিক ও গণ-শিক্ষামন্ত্রণালয় সংক্রান্ত কমিটি সাঁওতালদের মাতৃভাষায় বই দেয়ার জন্য গত বছর নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে এক গ্রুপ চাচ্ছে রোমান হরফে আরেক গ্রুপ চাচ্ছে বাংলা হরফে বই ছাপাতে। দুই গ্রুপের কোন্দলের কারণে এ বছরও সাঁওতলদের ভাষায় বই পাচ্ছে না।    
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, এনসিটিবি আমাদের পাণ্ডুলিপি দেয়ার পর বই ছাপার প্রুফ দেখলে অনেক ভুল ত্রুটি পাওয়া যায়। এগুলো সংশোধনের জন্য আবার এনসিটিবিতে পাঠানো হয়। তাদের সংশোধন করতে অনেক সময় লেগে যায়। যেখানে এখন পর্যন্ত পাণ্ডুলিপিই তৈরি হয়নি সেখানে ১লা জানুয়ারির আগে বই ছাপিয়ে সরবরাহ করা কঠিন ব্যাপার। তবে এনসিটিবির কর্মকর্তারা কঠোর হলে শঙ্কা থাকবে না।
আমলাতান্ত্রিক কারণে বই ছাপায় তিন মাস পিছিয়ে গেছে স্বীকার করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রথম শ্রেণির বই ছাপার জন্য অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১৯শে জুলাইয়ের মধ্যে এনসিটিবিকে বই ছাপার বিষেয়ে নির্দেশনা দেয়া হবে। যেকোনো ভাবেই হোক ১লা জানুয়ারি শিশুদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়া হবে। সাঁওতালদের বই ছাপার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।  
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন