মিয়ানমারে প্রতিকূলতার সঙ্গে বেঁচে থাকা

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ১৭ জুলাই ২০১৭, সোমবার
মিয়ানমারের সেইকি খানাউঙ্গধো শহর। এটি আসলে একটি দ্বীপ শহর। ইয়াঙ্গুন ও থানন্তে ক্যানালের মুখে অবস্থিত। সেখানেই একটি হাজামজা পুকুর। তার ওপরে থান থান হতাওয়ের ঘর। তিন ধাপের কাঠের সিঁড়ি পেরিয়ে উঠতে হয় ঘরে।
সেখানেই পরিবারের আট সদস্যকে নিয়ে এক রুমের ঘরে বসবাস তার। আছে ভয়াবহ সব মশার উৎপাত। ঘরের নিচে যে ময়লা আবর্জনাযুক্ত পানি তার ভেতরেই বেড়ে উঠছে এসব মশা। ঘরের এক কোণে একটি টেলিভিশন সাজানো। একটি সেলফের ওপর কোনোভাবে বসিয়ে রাখা হয়েছে তা। বৃষ্টির দিনে বা বর্ষায় ঘরের মেঝেতে পানি উঠে যায়। তার হাত থেকে রক্ষা পেতে এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ বছরই নগদ কিয়াত দিয়ে কিনেছেন টেলিভিশনটি।  গত বছর নাতিপুতিরাও ফিরেছে এই সংসারে। তখন থেকেই সংসার চালাতে কঠিন লড়াই করছেন থান থান হতাওয়ে। তার স্বামী কাজের সন্ধানে গিয়েছেন। আর এই সময়ে এক বোনের কাছ থেকে তিনি ধার করেছেন ৪০ হাজার কিয়াত। এই ধারের অর্থ পুরোটা একবারে শোধ করতে পারেন না বলে প্রতিদিন বোনকে ২ হাজার কিয়াত করে সুদ দিতে হয়। এক বছরের মধ্যে তিনি ধার করা অর্থের চেয়ে অনেক বেশি সুদ দিয়েছেন বোনকে। কিন্তু ঋণ শোধ হয় নি। থান থান হতাওয়ে নিজের ওই বোন সম্পর্কে বলেন, সে ভীষণ রুক্ষ্ম প্রকৃতির। রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে আর বলে, আমি তোমাকে শুধু শুধু ওই অর্থ দিই নি। আরো সব আজেবাজে কথা বলে। ইয়াঙ্গুনে উচ্চ সুদের হারে ঋণ নিয়ে নুয়ে পড়াদের মধ্যে থান থান হতাওয়ে-ই একা নন। তিনটি শহরে সম্প্রতি একটি জরিপ চালিয়ে সেভ দ্য চিলড্রেন দেখেছে যে, স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ ঋণ নিয়েছে। এতে তাৎক্ষণিক স্বস্তি পেয়েছেন ঋণ গ্রহীতারা।
কিন্তু দিনে শতকরা ৫ ভাগ থেকে মাসে শতকরা ৩০ ভাগ পর্যন্ত উচ্চ সুদের ফাঁদে আটকা পড়ছে তারা। এর ফলে তারা আসলে আটকা পড়ছে ঋণের জালে। শহরকেন্দ্রিক দারিদ্র্যবিষয়ক উপদেষ্টা মাইক স্লিঙ্গাসবাই বলেন, আমার সারাজীবনে বেশির ভাগ সময় কাজ করেছি এশিয়ায়। কিন্তু এত বেশি ঋণগ্রস্ত মানুষ দেখি নি। মিয়ানমারে যে পরিমাণ মানুষ ঋণ নিচ্ছেন, যে উচ্চ হারে ঋণ নিচ্ছেন এমনটা আমি অন্য কোথাও দেখিনি।
ইয়াঙ্গুন মিয়ানমারের বাণিজ্যিক রাজধানী হওয়ায় মানুষ অনেক বড় আশা নিয়ে ছুটে চলে যান সেখানে। তাদের আশা দেশে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। এর সুবিধা তারাও পাবেন। কিন্তু সেখানে স্থিতিশীল কাজ খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন। অনেক পরিবারের সদস্যরা বেঁচে আছেন তাদের সংসারের উপার্জনক্ষম সদস্যের ওপর ভিত্তি করে। তারা হয়তো কোনো ত্রি-চক্র যান চালান। রাস্তার হকার। অথবা দিনমজুর- তারা যখন যে কাজ পান তাই করেন। এসব কাজ নিয়মিতভাবে পাওয়া যায় না। বর্ষা মৌসুমে এসব কাজ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। মিয়ানমারে বর্ষাকাল প্রায় বছরের অর্ধেক সময় স্থায়ী হয়। সেভ দ্য চিলড্রেনের জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি পরিবারের প্রতিজন সদস্য দিনে ২০০০ কিয়াত বা ১.৪৮ ডলারের ওপর জীবিকা নির্বাহ করেন। বিশ্বব্যাংক বিশ্বে দারিদ্র্যের যে সীমা নির্ধারণ করেছে তার চেয়ে এ অঙ্ক অনেক কম। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এ অঙ্ক ১.৯০ ডলার।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বেশির ভাগই দিনে জনপ্রতি ১০০০ কিয়াত বা ০.৭৪ ডলারের ওপর জীবিকা নির্বাহ করেন। থান থান হতাওয়ে’র দুই ছেলে ত্রি-চক্র যানের চালক। তারা দিনে ৫০০০ কিয়াত উপার্জন করে। যা প্রায় ৩.৭ ডলারের সমান। একজন শ্রমিক হিসেবে তার জামাই আয় করেন প্রায় একই পরিমাণ অর্থ। কিন্তু মাসে তিনি কাজ পান ১০ থেকে ১৫ দিন। বাড়ি বাড়ি বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিতে গিয়ে আহত হয়েছেন থান থান হতাওয়ে’র স্বামী। তার চিকিৎসায় অনেক অর্থ খরচ হচ্ছে। ফলে যে আয় হয় তাতে সংসার চালাতে কষ্ট হয় থান থান হতাওয়ে’র। তাই আবার তিনি ঋণ নিয়েছেন এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে। প্রতিদিন যে পরিমাণ সুদ দিতে হয় তা বহন করতে এখন অক্ষম তিনি। বর্তমানে তার এ ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ কিয়াত বা ৩৭০ ডলার। থান থান হতাওয়ে বলেন, এখন সকাল-সন্ধ্যা আমি আতঙ্কে থাকি। সকাল হলেই মনে হয় আরো অর্থ ঋণ নেয়া উচিত আমার। সন্ধ্যায় উদ্বেগে থাকি তা শোধ করা নিয়ে। রাতে আমি ভয়ে থাকি পরের দিনের জন্য। এ অবস্থা থেকে আমি মুক্তি চাই। ঋণ নিয়ে সারাক্ষণই আমি উদ্বেগে থাকি। প্রতিদিন যে সুদ পরিশোধ করতে হয় তা শোধ করতে আমাকে অন্য প্রতিবেশীর কাছ থেকে নতুন করে ঋণ নিতে হয়। এখন লোকজন আমাকে ফিরিয়ে দেয়। কারণ, আমি সব সময়ই অর্থ ধার করি।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

সব স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি দেয়ার নির্দেশ

একতরফা নির্বাচন কোন নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়

‘অনুমোদনহীন বারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা’

কি পেলাম কি পেলাম না সেই হিসাব মেলাতে আসিনি: প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা ওয়াসাকে ১৩টি খাল উদ্ধারের নির্দেশ

এসডিজি অর্জন করতে হলে প্রতিবছর ৩০ শতাংশ নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ বাড়াতে হবে

‘অনুপ্রবেশকারীদের ৫০০০ পাওয়ারের বাতি জ্বালিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না’

‘ক্ষমতা থাকলে সরকারকে টেনে-হিচড়ে নামান’

আগামীকাল আদালতে যাবেন খালেদা জিয়া

‘সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই’

‘তদন্তের স্বার্থেই তনুর পরিবারকে ডাকা হয়েছে’

জিম্বাবুয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ‘কুমির মানুষ’

আশ্রয়শিবিরে সংক্রমণযুক্ত পানির বিষয়ে ইউনিসেফের সতর্কতা

চীন, উত্তর কোরিয়ার ১৩ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ

রোহিঙ্গা সঙ্কট: উচ্চ আশা নিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার বৈঠক শুরু

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের প্রস্তাব, যা বললেন মুখপাত্র...