ট্রাম্প জুনিয়রের ই-মেইল ফাঁস

টালমাটাল হোয়াইট হাউস

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ১৩ জুলাই ২০১৭, বৃহস্পতিবার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পুত্র ডনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও কথিত রাশিয়ান সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী এক আইনজীবীর মধ্যে আদানপ্রদান হওয়া ই-মেইল প্রকাশের পর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে হোয়াইট হাউসে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টারা একে-অপরকে দেখছেন সন্দেহের দৃষ্টিতে। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা ও উপদেষ্টাদের বরাতে এ খবর দিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। গত সপ্তাহান্তের জি-২০ সম্মেলন শেষে দেশে ফিরে কয়েকদিন ধরেই জনসম্মুখে আসেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু এখনও রাশিয়া কেলেঙ্কারি বিরাজ থাকা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ছেলেকে এই কেলেঙ্কারিতে জড়াতে দেখে ক্ষোভ ঝেড়েছেন প্রেসিডেন্ট।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের কাছে ফাঁস হওয়া ই-মেইলে দেখা গেছে, ট্রাম্প জুনিয়রকে এক রাশিয়ান আইনজীবী বলেছিলেন তৎকালীন প্রার্থী ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের ব্যাপারে নেতিবাচক তথ্য রয়েছে রাশিয়া সরকারের কাছে। রাশিয়া সরকার এই তথ্য দিয়ে ট্রাম্পকে সহায়তা করতে চায়। জবাবে ট্রাম্প জুনিয়রকে দেখা গেছে সুযোগ লুফে নিতে। তিনি বলেন, আপনি যা বলছেন তা যদি সত্য হয়, তাহলে আমার বেশ লাগছে! পরিস্থিতি বেগতিক দেখে, জুনিয়র ট্রাম্প নিজেই ওই কথোপকথন প্রকাশ করেছেন। তাতে পুরো বর্ণনার সত্যতা মিলছে। এ নিয়ে রীতিমতো ধাক্কা খেয়েছেন ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের দল।
তবে বুধবার নিজের প্রথম টুইটার পোস্টে নিজের ছেলের পক্ষালম্বন করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বলেছেন, আমার ছেলে স্বচ্ছ ও নির্দোষ। পূর্বের দাবি পুনরাবৃত্তি করে তিনি বলেন, পুরো ঘটনা আসলে তার প্রেসিডেন্সির বিরুদ্ধে ‘উইচ হান্ট’। তার আগে ট্রাম্প জুনিয়র ফক্স নিউজে হাজির হন। সেখানে তিনি বলেন, সুযোগ থাকলে পুরো বিষয়টা তিনি হয়তো ভিন্নভাবে সামলাতেন। কিন্তু এটা আসলে ‘তেমন কিছুই নয়।’ তিনি আরও দাবি করেন, রাশিয়ান এই আইনজীবীর সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়টি তিনি পিতা ট্রাম্পকে জানাননি।
ট্রাম্পের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, এই কথোপকথনের মাধ্যমে কোনো আইন ভঙ্গ করেননি ট্রাম্প জুনিয়র। তবে ট্রাম্পের সমর্থকরাও বলছেন, এই সংবাদ হোয়াইট হাউস ও তার জন্য রীতিমতো বিপর্যয়। ট্রাম্পের এক মিত্র একে আখ্যায়িত করেছেন ‘৫ মাত্রার হ্যারিকেন’ হিসেবে! আরেক উপদেষ্টা বলেন, ট্রাম্প শিবির ও রাশিয়ানদের মধ্যে যোগাযোগের গ্রাফিক চিত্র যেন জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘হাউস অব কার্ডস’-এর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। টেলিভিশনে ট্রাম্পের পক্ষে কথা বলার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত একজন বলেছেন, তারা এই পরিস্থিতিতে ‘অসহায়’ বোধ করছেন। কীভাবে জুনিয়র ট্রাম্পের পক্ষে অবস্থান নেবেন বুঝতে পারছেন না।
ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এই কেলেঙ্কারি থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। তার মুখপাত্র বলেন, ট্রাম্প জুনিয়রের এই বৈঠক হয়েছে প্রার্থী হিসেবে পেন্স যোগদানের আগে। এদিকে ক্রেমলিন দাবি করেছে, যেই আইনজীবীকে নিয়ে এত কথা, তার সঙ্গে রাশিয়ার কোনো যোগাযোগ নেই। ওই আইনজীবী এখন বলছেন, তার কাছে হিলারি ক্লিনটন সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক তথ্য ছিল না।
পোস্টের খবরে বলা হয়, নিউ ইয়র্ক টাইমস টানা তিন দিন এই ইস্যুতে নতুন নতুন বিস্ফোরক সংবাদ প্রকাশ করেছে। এর ফলে হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরেই সন্দেহ তুঙ্গে উঠছে। উপদেষ্টারা একজন আরেকজনকে দায়ী করছেন সংবাদপত্রটির কাছে তথ্যফাঁসের জন্য।
এদিকে কংগ্রেসে সিনেটে রিপাবলিকানরা ক্রমেই হোয়াইট হাউসের ওপর হতাশ হয়ে পড়ছেন। তারা মনে করছেন, হোয়াইট হাউসের কারণেই কংগ্রেস এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের আইন বা বিল পাস করতে পারেননি। অনেক সিনেটরই বলছেন, রাশিয়া সংক্রান্ত তদন্তের সীমারেখা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। আর ট্রাম্পের মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডই সংবাদমাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করছে। ফলে সিনেটে রিপাবলিকানরা নিজেদের এজেন্ডা এগিয়ে নিতে পারছেন না।
উল্লেখ্য, ট্রাম্প শিবিরের একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ উঠেছে। সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল মাইক ফ্লিনকে দায়িত্ব নেয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই পদত্যাগ করতে হয়েছিল। কারণ, তিনি দায়িত্ব নেয়ার আগেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন অবরোধ নিয়ে দেশটির রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলাপ করেন এবং এ নিয়ে আবার ভাইস প্রেসিডেন্টকে মিথ্যা বলেন। ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও বর্তমানে অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশন্স তার অধীনস্থ এফবিআই’র রাশিয়া তদন্ত থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন। কারণ, অভিযোগ উঠে, তিনি রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, কিন্তু সিনেট শুনানিতে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও মিথ্যা জবাব দেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা ও শীর্ষ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের বিরুদ্ধেও নিজের নিরাপত্তা ক্লিয়ারেন্সের আবেদনপত্রে রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করার কথা উল্লেখ না করার অভিযোগ ওঠে। পরে তাকে সংশোধিত জবাব দিতে হয়। ট্রাম্পের নির্বাচনী শিবিরের সাবেক প্রধান পল বেনাপোর্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে তিনি রাশিয়া সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন একটি ফার্মের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন। যোগাযোগ রেখেছেন রাশিয়ার সরকারি গোয়েন্দাদের সঙ্গে। প্রথমে অস্বীকার করলেও, পরে আংশিকভাবে অভিযোগ স্বীকার করেন পল ম্যানাপোর্ট। তাকেও পদত্যাগ করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, গত মার্কিন নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালায় রাশিয়া। রাশিয়া চেয়েছিল প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডনাল্ড ট্রাম্প জিতুক। এ নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে এফবিআই ও কংগ্রেসের একাধিক কমিটি।


 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন