মৌলভীবাজারে ৫০ হাজার মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস

এক্সক্লুসিভ

ইমাদ উদ দীন, মৌলভীবাজার থেকে | ২০ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার
প্রতিবছরই বর্ষায় শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। পাহাড় ধসে বাড়িঘর হয় বিধ্বস্ত। বাড়ে হতাহতের পরিসংখ্যান। বর্ষায় পাহাড়ি টিলা বেষ্টিত এ জেলার কয়েকটি উপজেলার বাসিন্দাদের এমন বেহাল দশা। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটার আগে কিংবা পরে তাদের নিয়ে নেই কোনো ভ্রূক্ষেপ। সংশ্লিষ্টদের এমন উদাসীনতা আর অবাধে পাহাড় কাটায় প্রতিবছরই চলছে এ বিপর্যয়।
আর এ কারণেই বর্ষা মৌসুমে চরম ঝুঁকিতে পড়েন পাহাড়ের চূড়া কিংবা পাদদেশের বসতিরা। শুষ্ক মৌসুমে অবাধে পাহাড় কেটে তৈরি হয় বসতঘর। বিক্রি হয় মাটি। এরপর নানা কৌশলে প্রভাবশালীরা দখলে নেন সরকারি ওই পাহাড়ি টিলা। ওই স্থানে বসতঘর বানিয়ে লোক বসান। গৃহহীন অসহায় লোকগুলো একটু মাথা গোজার ঠাঁই পেয়ে আশ্রয় নেয় এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে। ওই সময়ে ওখানে পাহাড় কেটে ঘর বানাতে বারণ করে না কেউ। পাহাড় কাটার অভিযোগ পেলেও রহস্যজনক কারণে তা বন্ধ করতে তৎপর হন না প্রশাসনের লোকজন। আর পাহাড় ধসে আহত কিংবা নিহত হলে শুরু হয় যতসব মায়াকান্না। এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। গতকাল জেলার বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার   
পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা গেল এমন দৃশ্য। একই অবস্থা জেলার কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলেও। পাহাড়ের চূড়া আর পাদদেশে অসংখ্য বসতঘর। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওখানে বসবাস অনেকের। বসতিরা জানালেন, ওখানকার অধিকাংশ বসতি ভূমিহীন, হতদরিদ্র ও অসহায়। ৩ যুগেরও বেশি সময় ধরে ওখানেই বসত গড়েছেন তারা। স্থানীয়দের তথ্যানুযায়ী, এই ৩ উপজেলায় এরকম ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। আর কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলে প্রায় ১৫ হাজার। এলাকার বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছরই শুষ্ক মৌসুমে অবাধে চলে পাহাড় কাটা। এ সময় তা বন্ধে রহস্যজনক কারণে প্রশাসন থাকে নির্বিকার। আর বর্ষা মৌসুমে টানা ভারিবর্ষণ হলেই আগের কাটা পাহাড়ের অবশিষ্ট অংশ ধসে পড়ে। আর এ সময় পাহাড়ের চূড়া ও পাদদেশে বসবাসকারীরা দুর্ঘটনা কবলিত হন। ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক দিয়ে পাহাড় ও হাওরবেষ্টিত এ জেলায় এরকম দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে রকম ভূমিকা থাকার কথা সে রকম ভূমিকা নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। কোনো অঘটন ঘটলেই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় স্থানীয় প্রশাসনের। কিন্তু দুর্ঘটনার আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয়দের সচেতন করতে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এই ৩টি উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, প্রতিবছরই পাহাড়ে বসবাসকারীরা স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে অবাধে পাহাড় কেটে বিক্রি করেন মাটি। তারা সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পাহাড়ি টিলা কেটে চূড়া ও পাদদেশে নির্মাণ করেন ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর। তাদের এমন আচরণে উজাড় হচ্ছে পাহাড়ি বনবৃক্ষ ও জঙ্গল। এমন নির্মমতায় বাসস্থান হারাচ্ছে বন্যপ্রাণি। হুমকির মুখে পড়ছে পাহাড়ি টিলা বেষ্টিত এ অঞ্চলের পরিবেশ। প্রকাশ্যে পাহাড়ি টিলার মাটি কেটে বসতবাড়ি নির্মাণ হলেও রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্টরা রয়েছেন নির্বিকার। জুড়ীতে শুষ্ক মৌসুমে পাহাড় কাটা হলেও এখন তা চোখে পড়ে কম। তবে আগের কাটা পাহাড়ের পাদদেশে বা চূড়ায় নির্মিত বসতবাড়িগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এলাকাবাসী জানান, শুষ্ক মৌসুমে অবাধে এসকল এলাকায় পাহাড় কাটা হলেও এখন বর্ষা মৌসুম থাকায় কিছুটা কম হলেও থেমে নেই ওই চক্র। এসব প্রভাবশালী টিলার মাটি বিক্রি করার পর আইনি ঝামেলা এড়াতে ওই স্থানে বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য কৌশলে ভূমিহীন অথবা হতদরিদ্র মানুষকে সেখানে নিয়ে আসে। আর কোনো স্থানে ব্যক্তিমালিকানাধীন অথবা সরকারি পাহাড়ি টিলার পাদদেশে বসতবাড়ি নির্মাণ করে থাকা লোকজনকে ওই প্রভাবশালীচক্র নানাভাবে প্রলোভনে ফেলে এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়ে অভয় দিয়ে তারা এসকল অভাবী লোকদের পাহাড়ি টিলা কাটতে উদ্বুদ্ধ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। মৌলভীবাজারের বড়লেখার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় অন্তত বিশ হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। বর্ষায় অতি বর্ষণে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেই কেবল তখনই প্রশাসন দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে প্রচারণা আর নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীতে তা অব্যাহত না রাখায় হতাহতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। জানা যায়, ২০১৫ সালের ১৯শে জুলাই রাতে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আবদুল হাসিবের বসতঘর মাটিচাপা পড়লেও অলৌকিভাবে ছয় মাসের শিশু সন্তানসহ পরিবারের ছয় সদস্য বেঁচে যায়। এর কয়েক দিন আগে ওই এলাকায় আরেক ব্যক্তি পাহাড় চাপায় প্রাণ হারান বলে জানান স্থানীয়রা। ২০১৪ সালে শাহবাজপুর চা বাগানে পাহাড় ধসে একই পরিবারের তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলায় ইতিপূর্বে মাটি কাটতে গিয়ে অন্তত ১৮-২০ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিনের মুষলধারে ভারি বৃষ্টির কারণে দুর্গম এলাকার পাহাড়ি চূড়ায় ও পাদদেশে নির্মিত অনেক বসতঘরের আশপাশের মাটি ধসে গেছে। ১৮ই জুন (রোববার) ভোররাতে বড়লেখার মধ্যডিমাই গ্রামের মৃত আবদুস সাত্তারের স্ত্রী ও মেয়ে বসতঘরের টিলা ধসে মারা যান। এ খবর পেয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা দুর্ঘটনা এড়াতে পাহাড়ের চূড়া ও পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাইকিং ও গণসচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা করছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছরই এমন দুর্ঘটনা ঘটলেও ওই সকল এলাকায় এখনো বন্ধ হয়নি পাহাড় কাটা। ওই সকল এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই অবাধে পাহাড় কেটে তা গাড়ি দিয়ে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। তারা জানান, জুড়ী উপজেলার ভজিটিলা ও পুটি ছড়া ফরেস্ট টিলা। কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার, কর্মধা ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা। বড়লেখা উপজেলার কাঁঠালতলী, বিওসি কেছরিগুল, ডিমাই, উত্তর ডিমাই, মধ্য ডিমাই, দক্ষিণ ডিমাই, হাতি ডিমাই, উত্তর শাহবাজপুর, সায়পুর, কলাজুরা, হাকাইতি, কাশেমনগর, জামকান্দি, মোহাম্মদনগর, পূর্ব মোহাম্মদনগর, সাতরাকান্দি, মুড়াউলসহ বিভিন্ন এলাকায় বছরজুড়ে নির্বিচারে পাহাড়ি টিলার (সরকারি খাস ভূমি) মাটি কাটা অব্যাহত থাকে। বর্ষা মৌসুমে অনেকটা বন্ধ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে দেদার চলে পাহাড় কাটা। পাহাড়ের পাদদেশে ও চূড়ায় ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর ও পাহাড় কাটায় জেলার মধ্যে এগিয়ে  বড়লেখা উপজেলা। শতাধিক পাহাড় কাটার স্পটই এমন পরিসংখ্যান জানান দেয়। এছাড়াও জেলার কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলেও পাহাড় কেটে পাদদেশে তৈরি হচ্ছে ঘরবাড়ি, আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট। এতে পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন ওখানকার স্থানীয় বাসিন্দারাও। তবে স্থানীয় ওই সকল উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, যে কোনো সময় প্রাণহানিসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা এড়াতে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। তারা সচেতনতামূলক প্রচার অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। পাহাড় কাটা বন্ধে তারা স্থানীয়ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি যথাযথ আইন প্রয়োগেও কঠোর রয়েছেন। দুর্গম ওই পাহাড়ি এলাকার নানা জটিলতার কারণে সঠিক জরিপ না থাকায় সরকারি জায়গায় ঝুঁকি নিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণ করে থাকা দরিদ্র লোকদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসা যাচ্ছে না। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আমলে নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তারা বিষয়টি অবগত করেছেন।


 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Kazi

২০১৭-০৬-১৯ ১৬:০৬:২৬

ঠাই নাই দেশে ঝুকি পূর্ণ বসবাসের দায় গ্রহন করতেই হবে। তাছাড়া বাংলাদেশের মানুস বিবেকহীন চলতে অভ্যস্ত।

আপনার মতামত দিন

‘বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেনা’

লেবাননে বৃটিশ কূটনীতিককে শ্বাসরোধ করে হত্যা

বিমানে দেখা এরশাদ-ফখরুলের

হলফনামার তথ্য গ্রহণযোগ্য নয়: সুজন

ছিনতাইকারীর টানাটানিতে মায়ের কোল থেকে পড়ে শিশুর মৃত্যু

গুজরাট ও হিমাচলে বিজেপিই জিততে চলেছে

আরো ৪০ রোহিঙ্গা গ্রাম ভস্মীভূত:  এইচআরডব্লিউ

ভর্তি জালিয়াতি সন্দেহে রাবির দুই ছাত্রলীগ নেতা আটক

৭ ঘণ্টা পর পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল শুরু

‘এটাও কিন্তু একটা চ্যালেঞ্জের বিষয়’

সৌদিই ব্যতিক্রম

তাদের কি বিবেক বলে কিছু নেই

ঢাকা উত্তরের উপনির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে

যেভাবে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হয় আকায়েদ

‘উন্নয়ন কথামালায়, মানুষ কষ্টে আছে’

সারা দেশে বিএনপির প্রতিবাদ কর্মসূচি আগামীকাল