২৫০০ শিক্ষকের কোড জালিয়াতি তদন্তে দুদক

দেশ বিদেশ

নূর মোহাম্মদ | ১৭ জুন ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৪৯
 রংপুর পীরগঞ্জের সহকারী শিক্ষক শহীদুল্লাহ। নিয়ম অনুযায়ী তিনি দশম গ্রেডে বেতন পাওয়ার কথা। কিন্তু কোড পরিবর্তন করে নবম গ্রেডে বেতন তুলছেন তিনি। চার বছরে প্রায় ৬ লাখ টাকা বেশি তুলেছেন। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) তার বেতন স্কেল পরীক্ষা করার সময় ভয়াবহ এই কোড জালিয়াতি তাদের নজরে আসে। ব্যাপক তদন্তে জানা যায়, তিনি আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ইআইএমএস (এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) সেল থেকে গ্রেড পরিবর্তন করেছেন।
একই পন্থায় ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের গ্রেড পরিবর্তন করেন একটি জালিয়াত চক্র। মাউশি ও ইআইএমএস সেলের একটি শক্তিশালী জালিয়াত চক্র এর সঙ্গে জড়িত।
কর্মকর্তারা বলছেন, কোড বদল করে নিম্ন মাধ্যমিক স্কুলকে মাধ্যমিক এবং উচ্চ পর্যায়ে কলেজকে ডিগ্রি কলেজে পরিণত করা হয়েছে। গত ১১ বছরে অবৈধভাবে এভাবে স্তর পরিবর্তন করে এমপিওভুক্ত হয়েছে ২৬৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জালিয়াতি করে শিক্ষকের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার। অবৈধভাবে গ্রেড পরিবর্তন হওয়ার ফলে প্রতি বছর বাজেটে ঘাটতি হচ্ছে। এ নিয়ে অর্থ ও শিক্ষামন্ত্রণালয় কয়েক দফা চিঠি চালাচালি হয়েছে। কোন সদুত্তর দিতে পারেনি মাউশিও। দুই বছর ধরে জালিয়াতির বড় ঘটনাটি আলাদাভাবে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেই সময়ের কম্পিউটারের ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা করার জন্য পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে দুদক।
সর্বশেষ চলতি বছর ৭ই মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) অরুণা বিশ্বাসকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব নুসরাত জাবীন বানু স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া নিয়ম বহির্ভূতভাবে কোড পরিবর্তনকৃত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোড পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন করা প্রয়োজন। এজন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
৮ই মার্চ কমিটির প্রথম বৈঠকে অতিরিক্ত সচিব মাউশির মাধ্যমিক শাখার কর্মকর্তাদের কাছে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কতজন শিক্ষক উচ্চতর গ্রেডে বেতন নিচ্ছেন তা জানতে চান। মাউশির কর্মকর্তারা জানান, সর্বশেষ তথ্যানুসারে নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক পর্যায়ে ১৮৫ এবং কলেজ পর্যায়ে ৭৫টি প্রতিষ্ঠান ও প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষক উচ্চতর গ্রেডে বেতন তুলছেন। এই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া যায় তা জানতে চাওয়া হয় বৈঠকে।
এ ব্যাপারে কমিটির আহ্বায়ক অরুণা বিশ্বাস মানবজমিনকে বলেন, এটি নিয়ে একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। এতে তার প্রাপ্যতার বাইরে অতিরিক্ত বেতন ভাতা তুলছেন। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত গচ্চা যাচ্ছে। এটি নিরসনে মাউশিকে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তী বৈঠকে আসার কথা বলা হয়েছে।
এর আগে গত বছর ১২ই অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আবু কায়সার খান স্বাক্ষরিত এক পত্রে বলা হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোড পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত আর্থিক সংকট হয়েছে আট কোটি ৮৬ লাখ ১৮ হাজার ৪০৬ টাকা। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের চাওয়া তথ্যাদি সাত দিনের মধ্যে পাঠানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক মো. এলিয়াছ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, এটা নিয়ে বেশ বেকায়দায় আছি। বিষয়টি বেশ আগের হওয়ার সঠিক তথ্য ও কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
মাউশি সূত্র জানায়, তাদের কাছে ১৮৫টি স্কুল ও ৭৫টি কলেজের তথ্য চাওয়া হয়েছে। স্কুলগুলো নিম্ন মাধ্যমিক থেকে মাধ্যমিক হয়েছে। আর কলেজগুলো একাদশ-দ্বাদশ থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর আগের জনবল ও কোড পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত জনবলের তুলনামূলক বিবরণী চাওয়া হয়েছে। প্রায় ৯ কোটি টাকার প্রতিষ্ঠানওয়ারি বিস্তারিত হিসাব বিবরণী ও কোডভিত্তিক সংক্ষিপ্ত বিভাজনও সংগ্রহ করা হচ্ছে। অবৈধভাবে এমপিওভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও সিরাজগঞ্জ জেলার। অন্যান্য জেলারও দু-একটি করে প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০১২ সালে মাউশির তদন্তে এ জালিয়াতি ধরা পড়লেও এর সঙ্গে জড়িত চক্রকে খুঁজে পায়নি তারা। ফলে এমন অনিয়ম-দুর্নীতি করেই যাচ্ছে চক্রটি।
২০০৫ সালে ইআইএমএস সেলের অসাধু কর্মকর্তারা বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কোড পরিবর্তন করে। নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় সাতজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক পেলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পায় ১২ জন। কলেজও অনুরূপভাবে চার-পাঁচজন শিক্ষক বেশি পেয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইআইএমএসের সাহায্যে অবৈধভাবে কোড বদলে তাদের শিক্ষকদের জন্য এমপিওভুক্তির আবেদন করে। মাউশির এমপিও শাখার কর্মকর্তারা অনলাইনে তাদের কোড দেখে নিশ্চিত হন, এগুলো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ডিগ্রি কলেজ। ফলে সহজেই শিক্ষকরা এমপিও পেয়ে যান। শুরুর দিকে শিক্ষকদের এমপিও দিতো ব্যানবেইজ। ২০০৫ সাল থেকে এ দায়িত্ব পায় মাউশি। শুরুর দিকে তেমন কাগজপত্র না থাকায় ইআইএমএস সেলের কম্পিউটারে তথ্য সংরক্ষণই ছিল বড় প্রমাণ। এই সুযোগ নিয়েই ইআইএমএস সেলের কর্মকর্তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের অবৈধভাবে এ এমপিওভুক্ত করেছেন।  

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

বিজয় দিবসে দেশ গড়ার দৃপ্ত শপথ

বঙ্গবন্ধুর গৃহবন্দি পরিবারকে যেভাবে উদ্ধার করেছিলেন কর্নেল তারা

থ্যাংক ইউ জেনারেল, উই আর অলরেডি বার্নিং, ডোন্ট অফার আস ফায়ার

রাহুল গান্ধীর অভিষেক

চাল-পিয়াজের দামে অসহায় ক্রেতারা

সিলেটে চার বন্ধুর একসঙ্গে বিদায়

রহস্য ভূমিকায় জামায়াত

শোকে মলিন চট্টলা

কিশোরগঞ্জে ২ সাংবাদিক ও বান্দরবানে ৪ পুলিশকে পেটালো ছাত্রলীগ

জৈন্তাপুরে লিয়াকত আলীই এখন শেষকথা

রাজধানীতে আওয়ামী লীগের বর্ণাঢ্য র‌্যালি

বড় দু’দলেই একাধিক প্রার্থী

ছায়েদুল হকের জন্য কাঁদছে নাসিরনগর

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ

উৎসবের আমেজে সারাদেশ