পশ্চিমবঙ্গে ভুয়া চিকিৎসক ধরার অভিযান চলছে

ভারত

কলকাতা প্রতিনিধি | ৭ জুন ২০১৭, বুধবার
কলকাতার বিখ্যাত কোঠারী মেডিকেল সেন্টারে ২৫০০ রুপির ভিজিটে রোগী দেখে আসছিলেন অজয় তিওয়ারি। প্রায় ২৬ বছর ধরে গ্যাস্ট্রোএনটেরোলজিস্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে হাজার হাজার রোগী দেখেছেন। অথচ তিনি আদৌ প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী কোনো চিকিৎসকই নন। আদপে বিকম পাস। পরে একটি হোমিও প্যাথির ডিগ্রি জুটিয়েছিলেন। কিন্তু তার প্যাডে জ্বলজ্বল করত জাল ডিগ্রি ও জাল রেজিস্ট্রেশন নম্বর। এরকম আরেকজন নরেন পান্ডে। বেলভিউ হাসপাতালে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে রোগী দেখে আসছিলেন বেশ কয়েক বছর ধরে। তারও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক এমবিবিএস ডিগ্রি নেই। কিন্তু জাল ডিগ্রি ও রেজিস্ট্রেশন জোগাড় করে দিব্যি রোগীর জীবন  নিয়ে ছিনিমিনি খেলে গিয়েছেন। শুভেন্দু ভট্টাচার্য নিজেকে এমআরসিপি ডিগ্রির অধিকারী বলে পরিচয় দিয়ে হাওড়া শহরে রমরমা প্রাকটিস করতেন। এমনকি সে কনিষ্ঠতম এমআরসিপি বলে এক সময় মিডিয়াতে দাবিও জানিয়েছিলেন। সম্প্রতি সে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পুরস্কারও নিয়েছে একটি সংস্থার পক্ষ থেকে। সেও জাল  রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ব্যবহার করতো। এরা অবশ্য ধরা পড়েছেন সিআইডির জালে। কিন্তু এখনও ধরা পড়েনি আরো অনেকে। কলকাতার নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে আরো এমন ভুয়া চিকিৎসক রয়েছেন বলে মনে করছে সিআইডির গোয়েন্দারা।
অথচ জমি বাড়ি বন্ধক রেখে বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে এদের কাছেই চিকিৎসা করিয়েছেন এই রাজ্যের  মতো বাংলাদেশেরও হাজার হাজার অসহায় মানুষ। এখন পর্যন্ত মোট নয় জন ভুয়া চিকিৎসককে সিআইডি গ্রেপ্তার করেছে। রাজ্যজুড়ে ভুয়া চিকিৎসক খুঁজে বের করতে সিআইডি ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যেই সিআইডির পক্ষ থেকে প্রাথমিক তদন্তের পর রাজ্য পুলিশের ডিজির কাছে যে প্রতিবেদন জমা পড়েছে তাতে ৫৫০ জন ভুয়া চিকিৎসক চিকিৎসা পরিষেবায় যুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। তবে মঙ্গলবারই রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিল ৬ ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এফআইআর দাখিল করেছে। এই চিকিৎসকরা সবাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছেন রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি ডা. নির্মল মাজি। এই নিয়ে মোট ১৭ জন ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে কাউন্সিল। এদিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশনের সব তথ্য নতুন করে জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। রাজ্যে প্রায় এক লাখ চিকিৎসক রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিলের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট নিয়েই প্র্যাকটিস করে।
সিআইডির এক তদন্তকারী অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এরা সকলেই জাল ডিগ্রি ও জাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট নিয়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা করে আসছিলেন। উল্লেখ্য, এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক হিসেবে প্র্যাকটিস করার জন্য রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিল থেকে রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট নেয়া বাধ্যতামূলক। অথচ ভুয়া চিকিৎসকরা সকলেই অন্যের রেজিস্ট্রেশন নাম্বার জাল করে ব্যবহার করছিল।  
রাজ্যে বিশাল সংখ্যক ভুয়া চিকিৎসক রয়েছে জানার পর চিকিৎসক মহলে প্রবল সোরগোল তৈরি হয়েছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে স্বচ্ছতা থাকা দরকার তা এসব ভুয়া চিকিৎসকদের জন্য কলঙ্কিত হয়েছে বলে চিকিৎসকরা মনে করছেন।
মে মাসের প্রথম দিকে স্বাস্থ্য দপ্তরের অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তরবঙ্গ থেকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয় কায়সার আলম ও খুশিনাথ হালদারকে। এদের মধ্যে কায়সার উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ায় সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এবং খুশিনাথ আলিপুর দুয়ারের মাদারিহাট ব্লকের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কাজ করছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
কায়সার জেরায় জানিয়েছে, সে কলকাতার নামি করপোরেট হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবেও বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন। রুবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একথা স্বীকারও করেছে। এর পরেই গ্রেপ্তার করা হয় স্নেহাশীষ চক্রবর্তীকে।
এরপর গত এক সপ্তাহে পরপর গ্রেপ্তার করা হয়েছে নরেন পান্ডে, শুভেন্দু ভট্টাচার্য, অজিত তিওয়ারি, চন্দন চক্রবর্তী, রাম শঙ্কর সিংকে।  
সিআইডির এক আধিকারিক জানিয়েছেন, এসব ভুয়া চিকিৎসক নিজেদের চিকিৎসক বলে পরিচয় দিলেও অধিকাংশই ইউনানী, হোমিওপ্যাথি, অল্টারনেটিভ মেডিসিনের সার্টিফিকেট নিয়ে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছিলেন। এমনকি জাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট ব্যবহার করছিলেন।
রাজ্যের ভুয়া চিকিৎসকদের প্রায় সকলেই নানাভাবে জাল সার্টিফিকেট জোগাড় করেছিল বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। আর ধৃতদের জেরা করে উত্তর ২৪ পরগণার বারাসাতের অল্টারনেটিভ মেডিকেল কাউন্সিলের নাম পুলিশ জানতে পেরেছে। সেখানে হানা দিয়ে ভারত ও এশিয়ার কয়েকটি দেশের ৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫৬০টি জাল মার্কশিট উদ্ধার করেছে সিআইডি।
পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, এরা ভারত ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ২৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জাল মেডিকেল ডিগ্রি সরবরাহ করতো। অথচ এদের কোনো অ্যাফিলিয়েশন ছিল না। ধৃত খুশিনাথ এদেরই দেয়া জাল মেডিকেল সার্টিফিকেট নিয়েই চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছিল।
গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে প্রতিবেশী নেপাল ও বাংলাদেশের অনেকেই বারাসাতের সংস্থাটির কাছ থেকে জাল মেডিকেল ডিগ্রি কিনেছে মোটা অর্থের বিনিময়ে।
ভুয়া চিকিৎসকের সন্ধান পাওয়া শুরু হতেই পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে রাজ্যের সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, কর্মরত সকল চিকিৎসকের সার্টিফিকেট ও রেজিস্ট্রেশন নাম্বার খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। সিআইডির পক্ষ থেকে মেডিকেল কাউন্সিলের কাছেও সন্দেহভাজন ভুয়া চিকিৎসকদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন