অদম্য ফাল্গুনী

এক্সক্লুসিভ

শুভ্র দেব | ২০ মে ২০১৭, শনিবার
ফাল্গুনী সাহা। এক অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী। সে আরো অন্য দশটা সাধারণ শিক্ষার্থীর মতো শারীরিকভাবে পরিপূর্ণ না। তার আছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। আর্থিক অসচ্ছলতা। কিন্তু কোনো কিছুর কাছেই সে হার মানেনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি। কঠোর মনোবল। নিরন্তর পরিশ্রম আর হৃদয়বান মানুষের সহযোগিতা নিয়ে সে লড়ছে। একজন আলোকিত মানুষ হওয়ার জন্য জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম তার নিত্যদিনের সঙ্গী। হাঁটি হাঁটি পা করে সে সাফল্যের পথে হাঁটছে। সময়টা ছিল ২০০২ সাল। সাত বছর বয়সী ফাল্গুনী তখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে লেখাপড়া করে। বন্ধুদের সঙ্গে পাশের বাড়ির ছাদে খেলা করছিল ফাল্গুনী। খেলাধুলার এক পর্যায়ে হঠাৎ বিদ্যুতের তারের সঙ্গে শক লেগে যায়। তারপর সে আর কিছু বলতে পারে না। যখন জ্ঞান ফিরে এলো তখন সে দেখে দুই হাতের কনুই পর্যন্ত পুড়ে গেছে। তারপর তাকে পার্শ্ববর্তী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা নেয়ার পরে দেখা যায় তার বাম হাতের দুটি আঙ্গুল পচে গেছে। অসহায় বাবা জগদীশ চন্দ্র সাহা। পেশায় তিনি একজন মুদির দোকানি। মেয়ের এরকম অবস্থায় তিনি অনেকটা দিশাহারা হয়ে পড়েন। একদিকে আদরের মেয়ের এরকম অবস্থা। তার ওপর আবার মেয়েকে চিকিৎসা করানোর জন্য অর্থ সংকট। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন ফাল্গুনীর হাতের জন্য উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু তার বাবার হাতে উন্নত চিকিৎসা করানোর মতো পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। পরে এলাকার মানুষ, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা নিয়ে তার বাবা উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান কলকাতায়। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তাররা বিভিন্ন পরীক্ষা নীরিক্ষা করে ফাল্গুনীর হাতে ক্যানসারের আশঙ্কা পান। বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে তাকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসকরা তার হাত কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। এক পর্যায়ে কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে চিকিৎসকরা তার দুই হাতের কনুই পর্যন্ত কেটে ফেলেন। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজনসহ অনেকেই তখন মনে করেছিল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েই তাকে সারা জীবন কাটাতে হবে। মনোবল হারিয়েছিল সবাই। কিন্তু না, ফাল্গুনী থেমে থাকেনি। সে নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে প্রতিনিয়ত পরাজিত করার চেষ্টা করেছে। এবং পেরেছেও সে। অদম্য মেধাবী ফাল্গুনী  শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও ২০১১ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করে। তখন দেশের নামকরা পত্র-পত্রিকায় সে খবরও ছাপা হয়। এসএসসি পাসের পরে আবার বাধা আসে তার জীবনে। সে ও তার পরিবার চিন্তায় পড়ে যান উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির ব্যাপারে। সে কোন কলেজে ভর্তি হবে। পড়াশুনার খরচ চালানোর জন্য কে সহযোগিতার হাত বাড়াবে। তখন ভাগ্য দেবতার মতো পাশে এসে দাঁড়ান ট্রাস্ট কলেজের অধ্যক্ষ বশির আহাম্মেদ। ২০১১ সালের ১৭ই মে ট্রাস্ট কলেজের অধ্যক্ষের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বাবা জগদীশ চন্দ্র সাহা, মাসী সবিতা রায় এবং কাকাত ভাই গোপাল সাহাসহ ট্রাস্ট কলেজে হাজির হয়েছিল ফাল্গুনী সাহা। ট্রাস্ট কলেজের পড়ালেখা ও মনোরম পরিবেশ দেখে ওই সময়ে মুগ্ধ হয়েছিল ফাল্গুনী সাহা ও তার পরিবার। সেদিন ফাল্গুনী সাহা ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে ট্রাস্ট কলেজে পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। পরে তার এই আগ্রহকে প্রাধান্য দিয়ে ট্রাস্ট কলেজের অধ্যক্ষ তাকে স্বাগত জানান। পরে তিনি ফাল্গুনীর দুই বছর বিনা বেতনে পড়ালেখা ও হোস্টেলে থাকা খাওয়াসহ সমুদয় খরচ বহন করার আশ্বাস প্রদান করেন। ২০১১ সালের জুলাই মাসে তার কলেজ জীবন শুরু হয়। ফাইনাল পরীক্ষা পর্যন্ত তার একাডেমিক, শিক্ষা-উপকরণ এবং হোস্টেলে থাকা খাওয়াসহ সমুদয় খরচ বহন করে ট্রাস্ট কলেজ। পাশাপাশি তার দুটো হাত না থাকার কারণে তাকে সহযোগিতার জন্য ট্রাস্ট কলেজের পক্ষ থেকে একজন আয়াও নিয়োগ দেয়া হয়। পরে ২০১৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ হতে আবারো সে জিপিএ-৫ পায়। বর্তমানে ফাল্গুনী পড়াশুনা করছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে। এখন সে চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপায়। ফাল্গুনী মানবজমিনকে জানায়, তার এই দুর্ঘটনার সময় সে কিছুই বুঝতো না। যখন তার হাতটা কাটা হলো তখন প্রথমদিকে তার অনেক খারাপ লাগতো। কিন্তু বাবা মা এবং বোনদের সহযোগিতায় আস্তে আস্তে তার এই হাত হারানোর কথা সে ভুলে যায়। তার এই পথ চলাতে পরিবার আত্মীয়স্বজন এবং সহপাঠীরা তাকে অনেক সাহস জুগিয়েছে। ফাল্গুনীর পরিবার গলাচিপার গ্রামের বাড়িতে থাকে। চার বোনের মধ্য সে মেঝো। ২০১৪ সালে তার বাবা মারা যান। মা মিষ্টির বক্স তৈরি করে যা আয় হয় তাতেই তার পরিবার চলে। নিজের বৃত্তির টাকা দিয়েই সে তার লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ চালায়। এছাড়া সে মাঝে মধ্যে টিউশনি করে। ফাল্গুনী বলে, তার এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্য সে কোনো প্রশিক্ষণ নেয়নি। নিজের প্রচণ্ড মনোবল আর সাহসই তাকে সব কাজে প্রেরণা দিয়েছে। সে লেখাপড়া শেষ করে ভালো কোনো চাকরি করে পরিবার ও দেশের সেবা করতে চায়। এজন্য সে সবার কাছে আশীর্বাদ প্রার্থী।
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

RanaDebRoy, Toronto,

২০১৭-০৫-২১ ১৯:২৩:২৪

Thank you Mr. Subhra Deb for this real story news.I want to put my little support for Falguni.Pl let me know how I can do it. My very very best regards to all the generous people Including the Hon'able Principal of Trust College, who helped her to reach here.

dilshad shimu

২০১৭-০৫-১৯ ১১:৫৮:৪১

অসাধারণ..ঈশ্বর তোকে তোর গন্তব্যে পৌছানোর তৌফিক দান করুন.

আপনার মতামত দিন

ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আস্থা নেই বিএনপির

রুবির বক্তব্য আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ

মিয়ানমারকেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে

সর্বশেষ আসা রোহিঙ্গাদের মুখে নির্যাতনের বর্ণনা

হঠাৎই সব এলোমেলো

হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধার করতে চায় বিএনপি

পাহাড়ে দাঙ্গা সৃষ্টির চেষ্টা

একই চিত্র জাকিরুলের বাড়িতে

মা এখনো জানেন না

ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে বিমান বাহিনী

ফের কমলো স্বর্ণের দাম

লিবিয়ার আইএস ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান হামলা, নিহত ১৭

উল্টো পথে আবার ধরা সচিবের গাড়ি

ফের কমলো স্বর্ণের দাম

ছাত্রের হাতে শিক্ষক জখম

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ৮০ ভাগ নারী ও শিশু: কেয়ার