২৩ স্কুলে প্রভাবশালীর থাবা উদ্ধারে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন

এক্সক্লুসিভ

নূর মোহাম্মদ | ১৯ মে ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২৩
 রাজধানীর ২৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৩টিই দখল করে রেখেছে প্রভাবশালীরা। কোনটি ব্যবহৃত হচ্ছে কমিউনিটি সেন্টার, কোনটি গ্যারেজ, দোকান, ক্লাবঘর, বস্তি, কাঁচাবাজার, ঈদগাহ বা কোন না কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসাবে। কোনো স্কুলের জায়গায় ওয়াসার পাম্পও তৈরি করা হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য অবৈধভাবে ভাড়া দেয়া হচ্ছে কোনো কোনো স্কুলভবন। এসব দখলদারিত্বের পেছনে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্কুল সংশ্লিষ্টরা। ৪ বছর আগে জাতীয় সংসদের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সরজমিন পরিদর্শন করে দ্রুত এসব স্কুল দখলমুক্ত করতে মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছিলেন।
দীর্ঘ এ সময়ে কোনো স্কুলই দখলমুক্ত করতে পারেনি। এজন্য প্রভাবশালীদের চাপ এবং প্রশাসনের অসহযোগিতাকে দায়ী করছে সংশ্লিষ্টরা। চলতি বছর জানুয়ারি মাসে তৃতীয় দফায় ২৩ স্কুল উদ্ধারের সর্বশেষ প্রতিবেদন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠিয়েছে ঢাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। সেখানে উদ্ধার কাজের অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, চার বছরের আগে যে অবস্থা ছিল তার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে জেলা শিক্ষা অফিস। অগ্রগতি বলতে বলা হয়েছে, অবৈধ দখলদারদের ভবন ছাড়তে বলা হয়েছে, সুপারিশ করা হয়েছে, বিভিন্ন দপ্তরকে পত্র দেয়া হয়েছে, জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে, লিজ বাতিলের আবেদন করা হয়েছে, নতুন মিটার লাগানোর জন্য পত্র দেয়া হয়েছে, মেয়র ও কাউন্সিলদের সঙ্গে আলোচনা চলছে ইত্যাদি। এটিকে খামখেয়ালি বলছেন সংশ্লিষ্ট স্কুলের শিক্ষকরা। আর জেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, আমাদের সুপারিশ করা ছাড়া কোনো ক্ষমতা নেই। কাউকে ভবন ছাড়া করতে হলে সেটি করবে প্রশাসন। সেই সহযোগিতা আমরা পাচ্ছি না।
এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসার শাহিন আরা বেগম মানবজমিনকে বলেন, এ নিয়ে তিনবার অগ্রগতির প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছি। সর্বশেষ প্রতিবেদন উদ্ধারের বেশ কিছু অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে। কেউ কেউ এক বছর, কেউ ৬ মাস সময় নিয়েছে। অনেকেই সহযোগিতা করছেন না। তারপরও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অনেককেই শেষবারের মতো নোটিশ করা হয়েছে। যেসব জমি নিয়ে মামলা আছে সেসব মামলা চালানোর পাশাপাশি অন্য বেদখল স্থাপনা উচ্ছেদের মামলা করা হবে। তিনি জানান, আমাদের সুপারিশ করা ছাড়া কিছু করার নেই। কারণ, স্কুলের জায়গা দখলমুক্ত করবে স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিরা।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর ২৩ স্কুল ছাড়াও ৫৪টি বিদ্যালয়ের জমি, ভবন,  শ্রেণিকক্ষসহ বিভিন্ন স্থাপনা দখল করে রেখেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রভাবশালী মহল ও সংগঠন। এর মধ্যে সাতটি বিদ্যালয়ের জমিতে রয়েছে ওয়াসার পাম্প, আছে কমিউনিটি সেন্টার, গ্যারেজ, দোকান ও ক্লাবঘর থেকে শুরু করে আনসার বাহিনীর কার্যালয়ও। কোনো কোনো বিদ্যালয়ের জমিতে গড়ে উঠেছে কাঁচাবাজার, মসজিদ ও ঈদগাহ। বস্তিবাসী থেকে শুরু করে অবাঙালিরাও দখলে রেখেছেন কয়েকটি বিদ্যালয়ের জমি। গত ১২ই জানুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া ওই প্রতিবেদনে এসব জমি দখলমুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।  
গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গায় অবৈধভাবে দোকান বসানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের জুন মাসে থানা শিক্ষা অফিসার দোকানের তালিকা প্রস্তুত করে ৭ কর্ম দিবসের মধ্যে দোকান সরিয়ে নিতে মালিককে চিঠি দেন, যার অনুলিপি জেলা প্রশাসককে দেয়া হয়েছে। দোকানগুলো উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। সূত্রাপুর থানার ওয়ারীর যোগীনগর রোডে এমএ আলীম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দখলকৃত ৫ শতাংশ জমি উচ্ছেদের জন্য অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসককে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা উদ্ধার হয়নি। মিরপুরের দারুস সালাম রোডে গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দোকান ও বিলবোর্ড অনেক অনুরোধ করে সরানো হয়েছে। পার্কিং উচ্ছেদ হয়েছে। মিরপুর-১২ এলাকায় আবদুল মান্নান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের ব্যাপারে হাইকোর্টে নিষেধাজ্ঞার কারণে করা যায়নি বলে জানানো হয়। পল্লবীর খলিলুর রহমান বিদ্যালয়ের অবৈধ জায়গা উচ্ছেদের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কিছু বলা না হলেও সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতি পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। পল্লবীর বালুমাঠ এলাকায় বনফুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে। আরামবাগ দিলকুশা এলাকায় বিদ্যালয়ের জায়গায় অবস্থিত দোকানগুলো দরপত্রের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতাদের কাছে ভাড়া দিয়ে অর্থের উৎসের অর্থায়নে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য মিড ডে মিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই অবস্থা মোহাম্মদপুরে টাউন হল ক্যাম্পে। অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়ন ও অবৈধ দখল উচ্ছেদের বিষয়ে স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। মোহাম্মদপুরে সাত মসজিদ রোডে বরাবো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১১.৬৪ শতাংশ জমিদাতা মালু ব্যাপারীর ওয়ারিশদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। মাতুয়াইলে পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২১ শতাংশ জমির উদ্ধারে দাতা খোঁজা হচ্ছে। মতিঝিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জায়গায় মতিঝিল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাচীর নির্মাণ করায় জায়গাটি ওই উচ্চবিদ্যালয়ের দখলে চলে যায়, যা উদ্ধার করার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া মিরপুরের শহীদবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডেমরার মাতুয়াইল ২ নম্বর, গুলশানের মেরাদিয়া, মতিঝিলের আইডিয়াল মুসলিম বালক-বালিকা ও মাদারটেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ জমিতে রয়েছে ওয়াসার পাম্প। এসব পাম্প সরানোর প্রক্রিয়া চলছে। কোতোয়ালি থানার নাজিরাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি শ্রেণিকক্ষে মালামাল রেখে তালা দিয়ে রেখেছে নাজিরাবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে সমঝোতা করার চেষ্টা করেও হয়নি। গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ জমির মধ্যে ২৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ দখলে রেখেছে খেলাঘর। আর এ বিদ্যালয়ের সামনের তিনটি দোকান গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতির দখলে, যা এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অবৈধ দখল উচ্ছেদে এর আগে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপও তুলে ধরা হয়েছে শিক্ষা কর্মকর্তার প্রতিবেদনে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ের জমি বেদখল হওয়ার পর তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলছে। কিছু স্কুলে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে ঢাকা জেলা প্রশাসনকে অনুরোধও জানানো হয়েছে।
 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

সব স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি দেয়ার নির্দেশ

একতরফা নির্বাচন কোন নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়

‘অনুমোদনহীন বারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা’

কি পেলাম কি পেলাম না সেই হিসাব মেলাতে আসিনি: প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা ওয়াসাকে ১৩টি খাল উদ্ধারের নির্দেশ

এসডিজি অর্জন করতে হলে প্রতিবছর ৩০ শতাংশ নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ বাড়াতে হবে

‘অনুপ্রবেশকারীদের ৫০০০ পাওয়ারের বাতি জ্বালিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না’

‘ক্ষমতা থাকলে সরকারকে টেনে-হিচড়ে নামান’

আগামীকাল আদালতে যাবেন খালেদা জিয়া

‘সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই’

‘তদন্তের স্বার্থেই তনুর পরিবারকে ডাকা হয়েছে’

জিম্বাবুয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ‘কুমির মানুষ’

আশ্রয়শিবিরে সংক্রমণযুক্ত পানির বিষয়ে ইউনিসেফের সতর্কতা

চীন, উত্তর কোরিয়ার ১৩ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ

রোহিঙ্গা সঙ্কট: উচ্চ আশা নিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার বৈঠক শুরু

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের প্রস্তাব, যা বললেন মুখপাত্র...