পাথর কোয়ারিতে এবার ‘বিলাই বোমা’

এক্সক্লুসিভ

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে | ১৯ মে ২০১৭, শুক্রবার
ধরণ পাল্টেছে পাথর উত্তোলনের। নিত্যনতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নামছে বোমা মেশিন সিন্ডিকেট সদস্যরা। বোমার তাণ্ডবে মানচিত্র থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি, জুমবাগান ও ঘরবাড়ি। দিনে অভিযানের ভয়ে এখন রাতে চালানো হচ্ছে বোমা মেশিন। দুই মাস ধরে জাফলংয়ে বোমা মেশিনের তাণ্ডব থামছে না। পিয়াইন ও ডাউকি দিয়ে পাহাড়ি ঢল নামা শুরু থেকে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে পাথর কোয়ারি এলাকায় রাতের আঁধারে বড় বোমা মেশিনের পাশাপাশি নতুন সংযোজন হয়েছে ছোট আকারের ভাসমান মেশিন। পাথর কোয়ারি এলাকা ছাড়িয়ে নদ-নদীর কাছাকাছি এলাকায় রাতে চলে অবৈধ এ যন্ত্র। রাতে দ্রুত এ যন্ত্র চালানো হয় বলে নাম পড়েছে ‘বিলাই বোমা’। মধ্য রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলে এসব মেশিন। সকালে সরিয়ে নেয়া হয় নিরাপদ স্থানে। পিয়াইন নদীর তীরবর্তী কান্দুবস্তি, নয়াবস্তি, লাকসামবস্তি, মধ্যগ্রাম, জাফলং বাজার, জাফলং বস্তিসহ বিশ-পঁচিশটি গ্রামের গাছপালা কেটে সমতল ভূমি থেকে এসব মেশিনে গর্ত খুঁড়ে পাথর উত্তোলনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে পাথরখেকোরা। স্থানীয় বাসিন্দা আরজ মিয়া বলেন, ‘গোয়াইনঘাটের জাফলং নয়াবস্তি এলাকার কটাই মিয়ার ছেলে আতাই মিয়া ও মাতাই মিয়া, ছাতকের মৃত উস্তার মিয়ার ছেলে আলাউদ্দিন, জৈন্তাপুরের দরবস্তের মৃত সামছুল ইসলামের ছেলে আলম মিয়া, লামা শ্যামপুরের সামছুজ্জামানের ছেলে ওয়েস মিয়া, গোয়াইনঘাটের ইনসান মিয়ার  ছেলে আলীম উদ্দিন, মুতলিব মিয়া, সাত্তার মিয়ার ছেলে কালা মিয়া ও নানু মিয়া, সামাদ মিয়ার ছেলে আফাজ উদ্দিন, সাত্তার মিয়ার ছেলে শামীম মিয়া, মামার দোকানের জামাই সুমন, সেলিম মিয়া, নয়াবস্তির বড় সাবু, ছোট সাবুসহ প্রভাবশালীরা রাতে অবৈধ যন্ত্র দিয়ে পাথর তুলছে। এতে করে পিয়াইন নদের তীরে অকালবন্যা মোকাবিলায় ২০১৩ সালে নির্মিত বেড়িবাঁধের প্রায় চার কিলোমিটার অংশ হুমকির মুখে পড়েছে। এলাকাবাসী গত ৫ই মে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে বিলাই  বোমা বন্ধে টাস্কফোর্সের অভিযান দিনের বেলার পাশাপাশি রাতেও পরিচালনা করার আহ্বান জানান। পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের গ্রামবাসীর উদ্যোগে বাউরভাগ হাওরে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন চলাকালে সমাবেশও হয়। পূর্ব জাফলংয়ের বাসিন্দা মিনহাজুর রহমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে তোয়াকুল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ লোকমান  হোসেন শিকদার, গোয়াইনঘাটের ফারুক আহমেদ, হাজী নজরুল শিকদার প্রমুখ বক্তব্য দেন। অন্যদিকে, পাথর উত্তোলনের গর্তে মাটি চাপায় এ পর্যন্ত ৬ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৬ই মার্চ বালি চাপায় নিহত হন আকরাম ও লেচু মিয়া নামের দুই শ্রমিক। এর আগে চুনাপাথর কোয়ারিতে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় হলেও মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো পুলিশের সোর্স পরিচয়ে পাথরখেকো সিন্ডিকেট অবাধে পাথর উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আক্তার জানিয়েছেন, জাফলংকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে উচ্চ আদালত ওই পর্যটন কেন্দ্রটিকে ঘোষণা করেছে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। কিন্তু এরপরও বন্ধ হয়নি পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ। এ জন্য প্রশাসনের শিথিলতাকে দায়ী করেছেন তিনি। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, যেখানেই যান্ত্রিকভাবে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে সেখানেই অভিযান চলছে। তবে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আবু সাফায়েত মো. শাহেদুল ইসলাম বলেছেন, অভিযান চললেও বোমা মেশিন বন্ধ না হওয়া দুঃখজনক। এ জন্য প্রশাসনের সব অংশকে আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন