এক ঝানু কূটনীতিকের বিদায়

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ১৮ মে ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪৩
বাংলাদেশের কূটনীতির অন্যতম কুশীলব। দেশের প্রথম চিফ অব প্রটোকল, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত ফারুক আহমেদ চৌধুরী আর নেই। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার ভোর সাড়ে ৪টায়  মৃত্যুবরণ করেন তিনি (ইল্লালিল্লাহি... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা ছাড়াও বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন। ফারুক চৌধুরীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম এমপি ও পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক।
পৃথক শোকবার্তায় তারা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
সিলেটের এক কীর্তিমান পরিবারের সন্তান ফারুক চৌধুরী। ১৯৩৪ সালের ১৪ই জানুয়ারি করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতা গিয়াসউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন ম্যাজিস্ট্রেট। তার শৈশব কেটেছে বৃহত্তর সিলেটে ও ভারতের বর্তমান মেঘালয় ও আসাম রাজ্যে। চার ভাই দুই বোনের মধ্যে ফারুক চৌধুরী ছিলেন সবার বড়। তিনিসহ তার সব ভাই বাংলাদেশের পক্ষে বিভিন্ন দেশে পালন করেছেন কূটনীতিকের দায়িত্ব। তার অন্য ভাইয়েরা হলেন- সাবেক সচিব ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুম আহমেদ চৌধুরী। এক পরিবারে চার ভাই কূটনীতিক, বিশ্বের ইতিহাসে এটা এক অনন্য নজির। নিউ ইয়র্ক টাইমস এ নিয়ে একটি বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। তার বোনদের মধ্যে নাসিম হাই শহীদ কর্নেল সৈয়দ আবদুল হাইয়ের স্ত্রী। ছোট বোন নীনা আহমেদের স্বামী হলেন ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ। ব্যক্তিগত জীবনে ফারুক চৌধুরী ও জিনাত চৌধুরী দম্পতির দুই ছেলে মেয়ে। ছেলে আদনান চৌধুরী ব্যবসায়ী এবং মেয়ে ফারজানা আহমেদ অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী ফারুক চৌধুরীর কূটনীতিক জীবনের শুরু গত শতকের পঞ্চাশের দশকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৫ সালে ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া শেষে ১৯৫৬ সালে যোগ দেন পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে। তিনি দেখেছেন ভারতবর্ষ থেকে পাকিস্তানের জন্ম ও বিলয় এবং নতুন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ। ফারুক চৌধুরীর কূটনৈতিক জীবন পঞ্চাশ বছরেরও বেশি দীর্ঘ। অবিভক্ত পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে কাজ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সঙ্গেও কাজ করেছেন দেশের কূটনীতিক জগতের উজ্জ্বলতম এ নক্ষত্র। পাকিস্তান আমলেই ইটালি, নেদারল্যান্ডস ও আলজেরিয়ায় দূতাবাসে দায়িত্ব পালনকারী এ কূটনীতিক বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম চিফ অফ প্রটোকল নিয়োগে পান। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভাষা ও আচরণ কেমন হওয়া উচিত তা নির্ধারণে তার রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্বে পালনের সময় বাংলাদেশের কমনওয়েলথে যোগ দেয়ার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলা ভাষণ দিয়ে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফারুক আহমেদ চৌধুরীর নামও। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সে ভাষণ উপস্থিত সবার জন্য ইংরেজিতে তাৎক্ষণিক অনুবাদ করেছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ১৯৭৮ সালে বেলজিয়ামসহ ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন অভিজ্ঞ এ কূটনীতিক। ১৯৮২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওআইসির চতুর্দশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলন এবং ১৯৮৫ সালে প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের সমন্বয়ক ও পরে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব। ১৯৯২ সালে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার। ক্ষমতার অন্দরমহলে থেকেও ফারুক চৌধুরী নিজের পেশাগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে চলতেন। কূটনৈতিকের দায়িত্ব পালনকালে তিনি সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন দেশের স্বার্থ। চাকরিসূত্রে তিনি যেমন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন, তেমনি পেয়েছেন খ্যাতিমান মানুষের সান্নিধ্য। যাদের মধ্যে রয়েছেন- ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রনায়ক ইয়াসির আরাফাত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী, চীনের প্রেসিডেন্ট ওয়েন জিয়াবাও, ভুটানের রাজা জিগমে খেসার ওয়াংচুক, চীনের সর্বশেষ সম্রাট পু ই, বক্সার মোহাম্মদ আলী ও আণবিক বিজ্ঞানী কাদির খান প্রমুখ।  
দীর্ঘ কূটনীতিক জীবন থেকে অবসরের পর লেখালেখিসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন ফারুক চৌধুরী। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় হন বঙ্গবন্ধুর এ ঘনিষ্ঠ প্রিয়পাত্র। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক বিষয় ছাড়াও নানা বিষয়ে ভাবতেন, লিখতেন, বলতেন। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক ছিল ফারুক চৌধুরীর। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কয়েকটি আকরগ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবনের বালুকাবেলায়’ শুধু কূটনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ দলিল নয়, বাংলা গদ্য সাহিত্যেরও অনন্য সংযোজন। এই বইয়ের জন্য ২০১৫ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আইএফআইসি পুরস্কার পান তিনি। কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরুর চিঠির মতো ফারুক চৌধুরী তার কন্যাকে চিঠির আকারে নিজের কূটনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতির হালহকিকত লিখেছেন তার ‘প্রিয় ফারজানা’ গ্রন্থটি। সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এ লেখাটি পেয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা। তার প্রকাশিত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- দেশ দেশান্তর, স্মরণে বঙ্গবন্ধু, প্রিয় ফারজানা, নানাক্ষণ নানাকথা, স্বদেশ স্বকাল স্বজন ও সময়ের আবর্তে ইত্যাদি। ২০১৭ সালের সাতই মার্চ উপলক্ষে তিনি একটি কবিতা লিখেছিলেন। যা ছিল তার শেষ লেখা। কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য বিপুল ভূমিকা থাকলেও কোনো রাষ্ট্রীয় পদক বা সম্মাননা পাননি তিনি।
বুধবার জোহরের পর ফারুক চৌধুরীর মরদেহ নেয়া হয় তার এক সময়ের কর্মস্থল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেখানে অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশ নেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ও সাবেক কূটনীতিকরা। আসরের পর ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোডে বায়তুল আমান জামে মসজিদে দ্বিতীয় দফা জানাজা হয়। এতে শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী, সাবেক সচিব এনাম আহমেদ চৌধুরী, এম আই চৌধুরী, শামসুল হক ও মোকাম্মেল হক, জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সভাপতি সিএম তোফায়েল সামী, অ্যাডভোকেট আবেদ রাজা, মেজর জেনারেল (অব.) জহির, রাজনীতিবিদ সুলতান মুহাম্মদ মনসুর, কাইয়ুম চৌধুরী, নূরুল হোসেন খান, ড. দিলওয়ার রানা এবং গ্রীণ ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নাসের আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পরে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন তিনি।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

অস্ট্রেলিয়া গেলেন প্রধান বিচারপতির স্ত্রী সুষমা সিনহা

মৌলভীবাজারে শোকের মাতম

বিয়ানীবাজারের খালেদের দুঃসহ ইউরোপ যাত্রা

১১ দফা প্রস্তাব নিয়ে ইসিতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ

‘প্রধান বিচারপতি ফিরে এসেই কাজে যোগ দিতে পারবেন’

খালেদা জিয়া ফিরছেন আজ

ব্লু হোয়েলের ফাঁদে আরো এক কিশোর

তিন ইস্যু গুরুত্ব পাবে সুষমার সফরে

প্রি-পেইডে সুবিধা বেশি আগ্রহ কম

ভারত থেকে ৩৭৮ কোটি টাকার চাল কিনছে সরকার

ছাত্রলীগ কর্মী মিয়াদ খুন নিয়ে উত্তপ্ত সিলেট

ইস্যু হতে পারে সমস্যার পাহাড়

দ্বিতীয়বার সংসার না করায় খুন

যেভাবে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা, ড্রোন থেকে নেয়া ভিডিও

সিলেটে কাল থেকে পরিবহন ধর্মঘট

ফুটবলকে বিদায় জানালেন কাকা