চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক

প্রথম পাতা

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ | ১৮ মে ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৩৩
ঢাকা কলেজের ছাত্র শামীম আহমেদ। বয়স ২২। দু’দিন ধরে জ্বরে ভুগছেন। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার শরীরে ব্যথা। হাত ও পায়ের গিঁটে ব্যথা। প্রচণ্ড জ্বর ওঠে। হাসপাতালের নতুন ভবনে ৭০১ নম্বর ওয়ার্ডে মেডিসিন ইউনিটে ডাক্তার রুহুল আমিন রনিকে দেখিয়েছেন তিনি। এই চিকিৎসক তাকে জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল এবং কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও দিয়েছেন। তবে তার লক্ষণ দেখে চিকিৎসকরা ধারণা করছেন চিকুনগুনিয়া নামক ভাইরাসবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। এই চিকিৎসক জানান, চিকুনগুনিয়া রোগীরা ইনডোর থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় চলে যান। প্রয়োজনে দু-একজন হাসপাতালে ভর্তি হন। ঢাকাসহ সারা দেশে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসবাহিত রোগী। কোনো কোনো ঘরে চার-পাঁচজনেরও এই জ্বর হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এটি মশাবাহিত রোগ। এডিশ ইজিপ্টাই অথবা এডিশ অ্যালবুপিক্টাস মশার কামড়ের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। এবারের গরমে রাজধানীর অনেকেই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানা গেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। জীবনের জন্য এ রোগ সরাসরি হুমকি নয়, তবে এ রোগে আক্রান্ত হলে রোগীর নানা শারীরিক অসঙ্গতি দেখা দেয়। এই জ্বর নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগে প্রতিদিনই প্রায় ২০/২৫ জন আসছেন। আর ইনডোরের দুইটি ইউনিটে কমপক্ষে গড়ে প্রতিদিন ২০ জন চিকুনগুনিয়া রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। মধুবাগ, শান্তিনগর ও এর আশপাশ থেকে এধরনের রোগী বেশি আসছেন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইন্দিরা রোড, রাজাবাজার, গ্রিন রোড, তেজকুনিপাড়া ও ফার্মগেট এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই এলাকায় বেড়েছে চিকুনগুনিয়া রোগী। জ্বরের রোগীরা কেউ কেউ ফার্মগেটের আল-রাজী হাসপাতালে যাচ্ছেন এবং অনেকে আবার ঢাকা মেডিকেলেও চিকিৎসার জন্য ছুটছেন। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) হিসাব মতে, প্রতিদিন ‘চিকুনগুনিয়া’য় গড়ে ৭ থেকে ৮ জন রোগী আসছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আর সব ভাইরাসজনিত জ্বরের মতোই এর কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। প্রচুর পানি, শরবত, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি পান করতে হবে। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল। চিকুনগুনিয়ার কোনো ভ্যাক্সিন এখন পর্যন্ত নেই। চিকিৎসকরা জানান, এডিশ মশাই এ রোগের বাহক। এ মশা দিনে কামড়ায়। দিনের বেলা ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হবে। তাছাড়া মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করতে হবে। দীর্ঘ সময় আটকে থাকা খোলা পানির আধারগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. একে এম হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমানে অনেকেরই এই জ্বরটা হচ্ছে। এটি এক ধরনের ভাইরাস জ্বর। যার নাম ‘চিকুনগুনিয়া’। ডেঙ্গুর মতই এর লক্ষণ। মশার কামড় থেকেই এই জ্বরের শুরু। হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা, গিঁটে গিঁটে ব্যথা ও শরীর প্রচণ্ড  দুর্বল থাকবে এই রোগে, থাকবে মাথা ব্যথা। এক কথায় ডেঙ্গু জ্বরের যে লক্ষণ এবং চিকুনগুনিয়ার লক্ষণগুলো প্রায় একই রকম। শুধু পার্থক্য যেটা দেখা যায়, সেটা হলো, ডেঙ্গু জ্বর হলে রক্তের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং রোগীর ঝুঁকি অনেকট বেড়ে যায়। সেই ক্ষেত্রে চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিটা অনেকটা কম। কিন্তু জ্বর তিন দিনে সেরে গেলেও, শরীর দুর্বল, ব্যথা, গিঁটে গিঁটে ব্যথা ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত থেকে যায়। কারো কারো গিঁটে গিঁটে ব্যথা এক-দুই মাসও থাকে। হুমায়ুন কবির বলেন, এই চিকুনগুনিয়া জ্বরের এখনো কোনো ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা শুরু হয়নি। আমরা প্রাথমিকভাবে ডেঙ্গুর পরীক্ষা দিচ্ছি। যদি ডেঙ্গু জ্বর না ধরা পরে, তাহলে আমরা ধরে নিচ্ছি ‘চিকুনগুনিয়া’। এই ধরনের রোগীদের আমরা সাধারণত নাপা অথবা প্যারাসিটামল দিচ্ছি। অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার কোনো দরকার নেই। প্রচুর পানি খেতে হবে, সঙ্গে ডাবের পানি খেতে পারে। লেবুর শরবত খেতে হবে। সেই সঙ্গে ওরস্যালাইনও খেতে পারে এবং বিশ্রামে থাকতে হবে।
মহাখালীর রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মাথাব্যথা, সর্দি, বমিবমিভাব, হাত ও পায়ের গিটে এবং আগুলের গিঁটে ব্যথা হতে পারে। এ ভাইরাস মশা থেকে মানুষের শরীরে আসে। আবার আক্রান্ত মানুষকে কামড় দিলে মশাও আক্রান্ত হয় এবং বাহক হিসেবে আবার মানবদেহে প্রবেশ করে। শুধু নারী এডিশ মশার কামড়েই এই রোগ হতে পারে। সাধারণত মশায় কামড়ানোর ৫ দিন পর থেকে শরীরে লক্ষণগুলো ফুটে ওঠে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, আপাতত এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। জ্বর ও মাথা ব্যথার চিকিৎসাতেই এ রোগ সেরে ওঠে। তবে মশার কামড় থেকে দূরে থাকতে হবে। তিনি জানান, এবারই প্রথম দেখা যাচ্ছে এ জ্বর ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠছে। এজন্য জ্বর নিয়ন্ত্রণের জন্য সাধারণ প্যারাসিটামল ও গা মুছে দিতে হবে। বেশিদিন জ্বর থাকার কথা নয়। সাধারণত চার থেকে পাঁচদিন পর্যন্ত জ্বর থাকে। তারপর নেমে যাওয়ার কথা। তা না হলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ নিতে হবে। শরবতের পানি খেতে হবে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদেন ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ এই প্রসঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, এটি যেহেতু মশাবাহিত রোগ। ফলে ঘরে যাতে ফুলের টবে পানি জমা না থাকে সেদিকে নজর রাখতে হবে। ঘর পরিষ্কার রাখতে হবে। তিনি জানান, এবারই প্রথম দেখা যাচ্ছে এ জ্বর ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠছে। এজন্য জ্বর নিয়ন্ত্রণের জন্য সাধারণ প্যারাসিটামল ও গা মুছে দিতে হবে। শরবতের পানি খেতে হবে। বেশিদিন জ্বর থাকার কথা নয়। সাধারণত চার থেকে পাঁচদিন পর্যন্ত জ্বর থাকে। তারপর নেমে যাওয়ার কথা। তা না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এই রোগে আক্রান্ত শতভাগ ভালো হয়ে যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে, আইইডিসিআর ওয়েব সাইটের তথ্য মতে, চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাসজনিত জ্বর যা আক্রান্ত মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। এ রোগটি ডেঙ্গু, জিকা  এর  মতোই এডিশ প্রজাতির মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। রোগটি প্রথম ১৯৫২ সালে আফ্রিকাতে দেখা যায়। পরবর্তীতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন- ভারত,  শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়াতে এর বিস্তার দেখা যায়। বাংলাদেশে প্রথম ২০০৮ সালে রাজশাহী ও চাঁপাই নবাবগঞ্জে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে ঢাকার দোহার উপজেলায় এই রোগ দেখা যায়। তবে এর পরে বিচ্ছিন্ন দু-একটি রোগী  ছাড়া এ রোগের বড় ধরনের কোনো বিস্তার আর বাংলাদেশে লক্ষ্য করা যায়নি। বর্ষার পর পর যখন মশার উপদ্রব বেশি হয় তখন এ রোগের বিস্তার বেশি দেখা যায়। চিকুনগুনিয়া ভাইরাস টোগা ভাইরাস গোত্রের ভাইরাস। মশাবাহিত হওয়ার কারণে একে আরবো ভাইরাসও বলে। ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাস ও একই মশার মাধ্যমে ছাড়ায় এবং প্রায় একই রকম রোগের লক্ষণ লক্ষ্য করা যায়। লক্ষণ- হঠাৎ জ্বর আসার সঙ্গে প্রচণ্ড গিঁটে গিঁটে ব্যথা, প্রচণ্ড মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব, চামড়ায় লালচে দানা, মাংসপেশীতে ব্যথা। কিভাবে ছড়ায়- প্রাথমিকভাবে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত এডিশ ইজিপ্টাই অথবা এডিশ অ্যালবুপিক্টাস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এ ধরনের মশা সাধারণত দিনের বেলা (ভোর বেলা অথবা সন্ধ্যার সময়) কামড়ায়। এ ছাড়াও চিকুনগুনিয়া ভাইরাস আক্রান্ত্ত  রক্তদাতার রক্ত গ্রহণ করলে এবং ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষার সময় অসাবধানতাবশত এ রোগ ছড়াতে পারে।
এদিকে, গতকাল সচিবালয়ে চিকুনগুনিয়া রোগ বিস্তার রোধে করণীয় সংক্রান্ত এক সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে আতংক না ছড়িয়ে গণসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাগের কোনো আশঙ্কা নাই। সরকার এক্ষেত্রে বরাবরের মতোই প্রস্তুত। রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে আরো তৎপর হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রী বলেছেন, মানুষকে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা বেশি। সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রচারণা কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং শিক্ষক সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে যাতে করে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়। সবাইকে মনে রাখতে হবে, মশা নিধনই এই রোগ প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায়।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন