সিলেটে রেজাউরের ফাঁদ

শেষের পাতা

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে | ২২ এপ্রিল ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:২৩
ব্যবসার আড়ালে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে ৫ কোটি টাকা লুটে নিয়েছে প্রতারক রেজাউর রহমান। শুধু নিজেই নয়, তার ভাইদের দিয়ে প্রতারণার জাল বিস্তার করেছিল সিলেটে। তার টার্গেটে ছিল সিলেটের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ। একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রির নাম করে এ টাকা লুটে নিয়েছে রেজাউর। প্রতারণার পর গত এক মাস ধরে অন্তরালে চলে গিয়েছিল রেজাউর রহমান। সিলেট শহরে থাকলেও লুকিয়ে চলাফেরা করতো। অবশেষে সিলেটের এই আলোচিত প্রতারক রেজাউরকে পাওনাদাররাই নগরীর টিলাগড়ের শাপলাবাগ এলাকা থেকে পাকড়াও করে পুলিশে দিয়েছে। এর আগে জনতা তাকে গণধোলাই দেয়। রেজাউর গ্রেপ্তারের খবর শুনে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই পাওনাদাররা ভিড় জমিয়েছেন মোগলাবাজার থানায়। রেজাউর রহমান চৌধুরী পেশায় ওই প্রতিষ্ঠানের ডিস্ট্রিবিউটর। সিলেট নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় কয়েক বছর আগে থেকে তার ডিস্ট্রিবিউটর অফিস। রেজাউরের বাড়ি সিলেট শহরতলীর দক্ষিণ সুরমার মাহাম্মদপুর বিরাহিমপুর গ্রামে। পাওনাদারদের কাছ থেকে জানা গেছে- ৬ বছর আগে থেকেই সিলেটে প্রতারণা পর্ব শুরু করে রেজাউর রহমান। সে সিলেট নগরীর বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কৌশলে সম্পর্ক গড়ে তোলে। তেমনি এক ব্যবসায়ী সিলেটের করিমউল্লাহ মার্কেটের মোবাইল ওয়ার্ল্ড সেন্টারের জাবের হোসেন। জাবেরের বাড়ি সিলেট নগরীর যতরপুর নবপুষ্প-৯৮। মোবাইল ক্রয়-বিক্রয়ের সূত্র ধরে প্রায় ৫ বছর আগে রেজাউর রহমান সম্পর্ক গড়ে তোলে জাবেরের সঙ্গে। এরপর সে জাবেরকে ওই শিল্প গ্রুপের শেয়ার হোল্ডার হওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু জাবের হোসেন সে প্রস্তাব মানেননি। শেষে তার এজেন্টদের মোবাইল গিফট দেয়ার কথা বলে লক্ষাধিক টাকা দামের মোবাইল ফোন বাকিতে নেন। এভাবে জাবেরের কাছ থেকে প্রায় দুই বছরে ১ কোটি ১০ লাখ টাকার মোবাইল ফোন নেয়। শুধু জাবের নয়, এরই মধ্যে সে শেয়ার হোল্ডার হিসেবে সিলেট নগরীর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ট্র্যাপে ফেলে টাকা আত্মসাৎ করে। সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন- সিলেটের তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মোটা অংকের লভ্যাংশের লোভ দেখিয়ে সর্বনিম্ন এক লাখ টাকা টাকা থেকে শুরু করে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়। টাকা নেয়ার আগে জাবের তাদের সবার সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক রাখলেও টাকা নেয়ার পর তাদের সঙ্গে টালবাহানা শুরু করে। প্রায় ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার পর এক বছর ধরে অন্তরালে চলে যায় রেজাউর রহমান। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এই অবস্থায় বৃহস্পতিবার বিকালে রেজাউর রহমানের সন্ধান মিলে সে টিলাগড়ের শাপলাবাগ এলাকার একটি বাসায় অবস্থান করছে। এ সময় কয়েকজন পাওনাদার গিয়ে তাকে ওই বাসা থেকে আটকের চেষ্টা চালান। সুযোগ বুঝে পালাতে চাইলে স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করে গণধোলাই দেন। রেজাউর রহমানের বিরুদ্ধে একাই ৬টি চেক ডিজঅনার মামলা করেছেন ব্যবসায়ী জাবের হোসেন। সিলেটের আদালতে মামলা দায়েরের পর তিনটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় তাকে সন্ধ্যায় সিলেটের মোগলাবাজার থানার পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। এদিকে- রাতে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রেজাউর রহমান জালিয়াতির ঘটনা স্বীকার করেছে। একটি শিল্প গ্রুপের শেয়ার বিক্রির নামে সে টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে স্বীকার করে। সিলেটের মোগলাবাজার থানার এসআই সুবির চন্দ্র দেব গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ৩টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানামূলে রেজাউর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে গতকাল সিলেটের আদালতে পাঠানো হয়েছে। এরপর তাকে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তিনি বলেন- রাতে আরও বহু পাওনাদার থানায় এসেছিলেন। সে বহু লোকের টাকা আত্মসাৎ করেছে। সিলেট নগরীর যতরপুর নবপুষ্প-৯৮ এর তফদ্দুছ আলী’র পুত্র জাবের হোসেন গতকাল বিকেলে জানিয়েছেন এক কোটি ১০ লাখ টাকা তার কাছে পাওনা রয়েছে। এজন্য তিনি আদালতে ডিজঅনার মামলার করেছেন। মামলাগুলো হচ্ছে- সি.আর ১৫৫১/২০১৬, সি.আর ১৪৯১/২০১৬, সি.আর ১৪৯২/২০১৬,  সি.আর ১৫৫২/২০১৬, সি.আর ১৫৫৩/২০১৬ ও  সি.আর ১৪৭০/২০১৬। তিনি বলেন- মামলা দায়ের করার পর সে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে হুমকিও দিয়েছে। গেলো সপ্তাহে তার উপর সন্ত্রাসী দিয়ে হামলার চেষ্টা চালায় রেজাউর রহমান। তিনি জানান- রেজাউর রহমানের ছোটো ভাই রাকিব সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। রেজাউরের পরামর্শে রাকিব কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। পাওনাদাররা জানিয়েছেন- প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেও রেজাউর ও তার ভাইরা ছিল স্বাভাবিক। টাকার জন্য যারাই চাপ দিয়েছে উল্টো পাওনাদারদের পেছনে সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়েছে। এদিকে- পাওনাদাররা চাপ প্রয়োগ করলে রেজাউর রহমান তার ডিস্ট্রিবিউটর অফিস হাউজিং এস্টেট থেকে নগরীর রায়নগর আবাসিক এলাকায় স্থানান্তরিত করে। এখনো এই এলাকায় রয়েছে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস।
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন