‘দিল্লির চেয়ে ঢাকার ক্রিকেটে টাকা বেশি’

খেলা

ইশতিয়াক পারভেজ | ২২ এপ্রিল ২০১৭, শনিবার
প্রথম শ্রেণির ১১১ ম্যাচে সেঞ্চুরি সংখ্যা ১১ ও ফিফটি ৪৪টি, ৪৮.৬৩ গড়ে করেছেন ৭৮৩০ রান। লিস্ট ‘এ’ ক্যারিয়ারে ৯৩ ম্যাচে ৭টি সেঞ্চুরির সঙ্গে ২৮ ফিফটিতে ৪৮.২৮ গড়ে ৩৬২১ রান করেছেন। খেলেছেন আইপিএলের সেরা দল কেকেআরে প্রায় তিন মৌসুম। ১৫ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে শুধু সংগ্রামই করে গেছেন ভারতের দিল্লির ক্রিকেটার যশপাল সিং। কিন্তু প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি গড় নিয়েও জাতীয় দলের দরজা খোলেনি তার। তবে বয়স ৩৫ পেরিয়ে গেলেও হাল ছড়েননি। এখনো বিশ্বাস করেন একটি দুটি মৌসুম দারুণ কিছু করে ফেললে হয়তো সুযোগ পাবেন। নিজের দেশে যখন খেলা থাকে না, ছুটে আসেন বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের বড় আসর ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে খেলতে। আবাহনীতে খেলেছেন তিনটি মৌসুম। এবার অবশ্য খেলছেন পারটেক্সের হয়ে। বিকেএসপি-৩ মাঠে বসেই যশপাল সিং বাংলাদেশ-ভারতের ক্রিকেট ও নিজের সংগ্রামের কথা একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন মানবজমিনের স্পোর্টস রিপোর্টার ইশতিয়াক পারভেজের সঙ্গে। সেই কথোপকথনের মূল অংশ তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন: বয়স ৩৫। এখনো জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন?
যশপাল সিং: কেন নয়! ১৫ বছর ধরে ক্রিকেট খেলে যাচ্ছি শুধু জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার আশায়। দিল্লিতে আমার জন্ম। সেখানেই ক্রিকেট খেলে বড় হয়েছি। যখন থেকে প্রফেশনাল ক্রিকেট খেলা শুরু করি তখন থেকেই প্রতিটি মৌসুম শুরু করতাম এই ভেবে যে, এবার হয়তো জাতীয় দলে সুযোগ আসবে। যখন হতো না তখন নিজেকে বোঝাতাম- ক্রিকেট খেলা তোমার কাজ, আর ভালো করলে দলে নেয়া নির্বাচকদের বিষয়। তুমি হয়তো এমন কিছু করতে পারোনি যাতে নির্বাচকরা তোমাকে নিয়ে ভাবে। এভাবে একেকটা বছর পার করে এসেছি। এখনো তা-ই ভাবি। দেশে আর বিদেশে গিয়ে চেষ্টা করি এমনভাবে খেলতে, যেন নির্বাচকদের নজরে আসে। আমি জানি বয়সটা আমার সঙ্গে নেই। কিন্তু ব্যাট তো হাতে আছে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশই নয়, অনেক দেশেই ৩০ পার হলে জাতীয় দলের আশা অনেক ক্রিকেটারই ছেড়ে দেন। তাদের জন্য কি বলবেন?
যশপাল সিং: আমি বিশ্বাস করি ক্রিকেটারের অন্যতম কাজ হলো পারফরম্যান্স। কিন্তু আমাদের উপমহাদেশের কন্ডিশনে ৩০ পার হলে বয়সটাকে নজরে আনা হয়। সে কারণেই ক্রিকেটারদের উচিত এমন পারফরম্যান্স করা যেন বয়সটা কারো বিবেচনায় না আসে। আর একটা কথা হলো; হাল ছাড়তে নেই।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে কত বছর ধরে খেলছেন?
যশপাল সিং: ঢাকা প্রিমিয়ার লীগের চারটি আসরে খেললাম। আগের তিনটি আসরে খেলেছি আবাহনীর হয়ে। এ আসরে আমার সেই পুরনো দলের বিপক্ষে পারটেক্সের হয়ে খেললাম প্রথম ম্যাচ। এখানে খেলতে অনেক ভালো লাগে। ক্লাব ক্রিকেটের এমন উত্তেজনা ভারতে নেই। বিশেষ করে দিল্লিতে একেবারেই নেই। এখানে খেলে দুটি সুবিধা আছে। ভালো পারফরম্যান্স করলে নজরে আসা যায়। আর দিল্লির ক্লাব ক্রিকেটের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ এখানে পাওয়া যায়। সেখানে যারা ক্লাব চালায় তারা ৫-৬ জন ক্রিকেটারকে একটু বেশি অর্থ দেয়। কিন্তু এখানে তা হয় না। চারটা ম্যাচ খেলতে পারলে অনেক সম্মানজনক অর্থই পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: কোন ফরমেটের ক্রিকেট আপনার ভালো লাগে?
যশপাল সিং: আমার সবচেয়ে প্রিয় ফরমেট টেস্ট। রঞ্জিতে আমি ১১১টা ম্যাচ খেলেছি। আমি মনে করি এখান থেকেই ক্রিকেটের শেখার সবকিছু আছে। আপনি টেস্ট খেলতে না পারলে আপনার অন্য ফরমেটেও ভালো করার খুব বেশি জায়গা থাকবে না।
প্রশ্ন: আইপিএল চলছে আর আপনি খেলছেন ঢাকা লীগে। কেমন লাগছে?
যশপাল সিং: আইপিএলে শুরুতে আমি কেকেআরের হয়ে খেলেছি তিন সিজন। আরো দুই বছর খেলেছি কচি টুসকারসে। শেষ ২০১০ পর্যন্ত ছিলাম। এখন আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজিদের চিন্তাভাবনা অনেক বদলে গেছে। তারা বিদেশি আর দেশের তারকা ছাড়া নজর দিচ্ছেন তরুণ ক্রিকেটারের দিকে। যে কারণে এখন আর সুযোগ হয় না। তবে হবে না তাও মনে করি না।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্কে কিছু বলবেন?
যশপাল সিং: এদেশে আসার কারণে জানি তা নয়, আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট সম্পর্কে বেশ খোঁজ খবর রাখি। একটা সময় বাংলাদেশ দলকে মনে হতো ভারত বা বড় বড় দলগুলো সহজে হারিয়ে দেবে। কিন্তু এখন তা মনে হয় না। দিনে দিনে এত উন্নতি করেছে যে, তারা ভারত, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। বিশেষ করে মুশফিক, সাকিব, তামিমদের মতো ক্রিকেটাররা যে কোনো দলের জন্য এখন ভয়ঙ্কর। আর তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে মোস্তাফিজ, তাসকিন ও অফস্পিনার মিরাজ তো অসাধারণ। আশা করি এভাবে খেলতে থাকলে যে কোনো দেশে গিয়ে যে কোনো দলকে হারানোর সক্ষমতা রাখবে তারা।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ ও ভারতের উইকেট ও কন্ডিশনে কতটা মিল?
যশপাল সিং: কন্ডিশন অনেকটা একই রকম হলেও ভারতে গরম বাংলাদেশের মতো না। এখানে আর্দ্রতা বেশি থাকায় ভ্যাপসা একটা গরম কাজ করে। সেই সঙ্গে শুকনা একটা ভাব থাকায় উইকেটও অনেক শক্ত হয়। কিন্তু ভারতের সব জায়গায় এমন গরম নেই। তাই অনেক জায়গায় উইকেটে ঘাস দেখা যায়। এবার ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ দেখেন, দলগুলো কিন্তু গরমের কারণে খুব বেশি পেসার খেলাচ্ছে না। স্পিনার বেশি নিয়ে খেলছে। এখানে ব্যাট করাও খুব সহজ নয়, যতটা ভারতে।
প্রশ্ন: ভারতের প্রথম শ্রেণির ম্যাচের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্য কি?
যশপাল সিং: আমি যদিও এখানে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলিনি। কিন্তু খবর নিয়েছি। বিশেষ করে এখানে খেলতে এসে জেনেছি চার দিনের ক্রিকেট হয়। তবে সেটি ৭ বা ৮টি  দলের মধ্যে। এবং অনেক অল্প সময় ধরে হয়। কিন্তু ভারতে ২৭ -২৮টি দল প্রথম শ্রেণির ম্যাচে খেলে। তাও দীর্ঘ সময় ধরে। এখানেই দুই দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের বড় পার্থক্য। এছাড়াও এখন তো আমাদের এখনে প্রথম শ্রেণিতেও আন্তর্জাতিক ম্যাচের সব উপকরণ ব্যবহার হয়। যেমন টিভি আম্পায়ারও রাখা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু আমার জানা মতে এখানে এসব এখনো হয়নি। আমি মনে করি যদি বাংলাদেশকে আরো উন্নতি করতে হয় তাহলে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের উন্নতি করতে হবে।
প্রশ্ন: বিপিএলে খেলার ইচ্ছা কতটা?
যশপাল সিং: সত্যি কথা বলতে অনেক ইচ্ছা বিপিএলে খেলতে। কিন্তু আমাদের বোর্ড তো অনুমতি দেবে না। আইপিএল যদিও বিপিএলের চেয়ে অনেক এগিয়ে, তারপরও এখানকার পরিবেশটা আমার খুব ভালো লাগে। যদি সুযোগ হয় খেলবো আশা করি।
প্রশ্ন: তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য টি-টোয়েন্টি কতটা ক্ষতিকর
যশপাল সিং: মন থেকে একটি সত্যি কথা বলতে চাই, তরুণ ও উঠতি ক্রিকেটারদের টি-টোয়েন্টি খেলাই উচিত না। আমি এখনো বিশ্বাস করি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে শুধু ধ্বংস করছে। যদিও এখন অর্থ অনেক বড় বিষয়। তারপরও প্রত্যেক দেশের বোর্ডের উচিত তরুণরা যেন একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত টি- টোয়েন্টিতে না খেলে, বিশেষ করে আইপিএল, বিপিএল, সিপিএলের মতো আসরে। কারণ, সেখানে টাকা পেয়ে তারা  টেস্ট ও ওয়ানডের প্রতি মনোযোগ হারায়।
প্রশ্ন: এদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে কাদের ভালো লাগে?
যশপাল সিং: মুশফিকুর রহীম, তামিম ও সাকিবকে বেশি ভালো লাগে। সেই সঙ্গে পেসারদের মধ্যে মোস্তাফিজ ও স্পিনারদের মধ্যে মিরাজকে। তারা দেশের অনেক বড় তারকা হবে।
প্রশ্ন: এদেশের কোন বিষয়টা বেশি ভালো লেগেছে?
যশপাল সিং: ভালো লাগে এদেশের খাবার। আর ক্রিকেটের প্রতি মানুষের ভালোবাসা। এখানে এসে অনেক সম্মান পাই।
প্রশ্ন: যদি কোনো দিন জাতীয় দলে সুযোগ না হয় কি করবেন?
যশপাল সিং: হ্যাঁ, তাও ভেবে রেখেছি। ক্রিকেট ছাড়বো না। কোচ হোক বা অন্য কোনোভাবে ক্রিকেটের জন্যই অবদান রাখবো।

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন