মার্কেট নির্মাণের চার বছর দোকান বরাদ্দ হয়নি একটিও

দেশ বিদেশ

স্টাফ রিপোর্টার | ২২ এপ্রিল ২০১৭, শনিবার
নির্মাণের প্রায় চার বছর অতিবাহিত হয়েছে। দফায় দফায় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। আবেদন ফরম বিক্রি হয়েছে। অনেকে ফরম জমাও দিয়েছেন। টাকা জমা দিয়ে আবার অনেকে টাকা ফিরিয়ে নেয়ার ঘটনাও আছে। তারপরও এখন পর্যন্ত কোনো দোকান বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হয়নি। এজন্য বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। প্রায় চার বছর ধরে প্রস্তুত হয়ে আছে মহাখালীর ডিএনসিসি মার্কেট। কোনো আয় ছাড়াই প্রতি মাসেই মার্কেটটির ব্যবস্থাপনার পেছনে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করছে সিটি করপোরেশন। ডিএনসিসি সূত্র বলছে, মহাখালীর এই মার্কেটটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৬ জন আনসার সদস্য নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন। এজন্য প্রতিমাসে খরচ বাবদ দিতে হয় প্রায় ২ লাখ টাকা। দেখাশোনার জন্য আরো আছেন ৬ কর্মচারী। এদের প্রত্যেকের বেতন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে। অন্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রতিমাসে মোট ব্যয় প্রায় ৫ লাখ টাকার কাছাকাছি। সেই হিসাবে গত চার বছর ধরে প্রায় দুই কোটি টাকার মতো লোকসান গুনেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। মূলত কাওরানবাজারের কাঁচা মালের আড়ত সেখানে স্থানান্তরের জন্য মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএনসিসি ও কাওরানবাজারের ব্যবসায়ীদের টানপড়েনে এ লোকসান গুনতে হচ্ছে। সহসাই মার্কেটটি চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে বহুতল বিশিষ্ট এই মার্কেট। সরজমিন দেখা গেছে, ব্যবহার না করার কারণে এবং অযত্ন-অবহেলায় জং ধরেছে মার্কেটের লোহার তৈরি কলাপসিবল গেটে, ভবনের মেঝেতে ময়লার স্তূপ। দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেও ব্যবসায়ীদের দোকান নিতে রাজি করানো যায়নি। সূত্র জানায়, ২০০৬ সালের ৪ঠা অক্টোবর ঢাকা শহরের তিনটি পাইকারি কাঁচাবাজার নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেকে। কৃষিপণ্যের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি কাওরানবাজারের যানজট কমাতে এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের কাছে ৭ দশমিক ১৭ একর জমির ওপর জিওবি’র অর্থায়নে ৫টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪ হাজার বর্গমিটার ফ্লোর এরিয়ায় দোকান নির্মাণ করা হয়েছে মোট ৩৬০টি। ডিএনসিসি’র এই মার্কেটি ৬ তলা বিশিষ্ট। এ ছাড়া মার্কেট এরিয়ায় রয়েছে ৯ তলা বিশিষ্ট আরেকটি ভবন। রয়েছে গাড়ির গ্যারেজ, ময়লার ডাম্পিং স্পেস, কসাইখানা, লিফট ও জেনারেটর বিল্ডিং। সূত্রমতে, মহাখালী ডিএনসিসি মার্কেটে এক হাজারেরও বেশি দোকান রাখা রয়েছে। বেজমেন্টে পাইকারি কাঁচামালের বেচাকেনার জন্য জায়গা তৈরি হয়েছে। নিচতলায় মাছ-মাংস-মুরগিসহ কাঁচাবাজার। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় তৈরি পোশাক, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং ষষ্ঠ তলায় ফুডকোর্ট। বেজমেন্ট ও নিচতলার ৩৬০টি দোকান কাওরানবাজারের ব্যবসায়ীদের জন্য সংরক্ষিত। বাকি ৮০৩টি দোকান আবেদনকারীদের মধ্যে লটারি করে বরাদ্দ দেয়ার কথা। প্রতি স্কয়ারফিট জায়গার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৫ হাজার টাকা করে। বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়েও তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। গত বছরের শেষের দিকে এবং এই বছরে গ্রাহকদের আকর্ষণ করতে দাম কিছুটা কমিয়ে আবারও বিজ্ঞাপন দেয় ডিএনসিসি। তারপরও প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ গত মার্চ মাসে মার্কেটে দোকান বরাদ্দের আবেদন চাওয়া হয়। এর আগে দোকান বরাদ্দে আবেদন চাওয়া হয় ১৫ই ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে সময় বাড়িয়ে ৫ই  জানুয়ারি করা হলে তাতেও সাড়া মেলেনি। এ অবস্থায় পুনরায় সময় বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির কর্মকর্তারা। পশ্চিম কাওরানবাজার কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক গাজী মো. হানিফ বলেন, প্রতিদিন আমাদের কমপক্ষে ২ হাজার ট্রাক কাঁচামাল আসে। মহাখালী মার্কেটে পার্কিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। এই গাড়িগুলো রাস্তায় পার্কিং করলে মহাখালী বাস টার্মিনালের সঙ্গে আমাদের প্রতিনিয়ত ঝামেলা লেগেই থাকবে। আমাদের প্রতিটি আড়তের জন্য কমপক্ষে ৪০০ স্কয়ারফিট জায়গা দরকার সে তুলনায় মার্কেটের দোকানগুলো মাত্র ১২০ স্কয়ার ফুটের। কাওরানবাজারের একাধিক ব্যবসায়ীও একই কথা বলছেন। কাঁচামালের আড়তদার মোস্তফা বলেন, মহাখালী যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। কারণ আমরা যে রকম সুযোগ চাচ্ছি মহাখালীতে সেরকম কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখানে ছোট ছোট দোকান তৈরি করা হয়েছে। যা আমাদের কাঁচামাল ব্যবসায়ীদের আড়তের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। অন্য কোনো ছোটখাটো ব্যবসার জন্য এটা উপযোগী। এ বিষয়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রবীন্দ্র শ্রী বড়ুয়া বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো দোকান বরাদ্দ হয়নি। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির পর ৩শ’ ফরম বিক্রি হয়েছে। এর মধ্য থেকে ৪৫টি আবেদন জমা হয়েছিল। কয়েকজন দোকান নেবার জন্য টাকাও জমা দিয়েছিল। পরে আবার সেই টাকা ফেরত  নিয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি মেয়র ভালো একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। দাম বেশি থাকার কারণে  অনেকে দোকান নিতে অনাগ্রাহ প্রকাশ করছেন। এজন্য প্রথমে ডাউন পেমেন্ট কমিয়ে দেয়া হবে। যদিও আগে মূল দামের ৫০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দেয়ার শর্ত ছিল। এবং আগে ৩টি কিস্তির মাধ্যমে বাকি টাকা পরিশোধের শর্ত ছিল। আর এখন ৭-৮টি কিস্তিতে টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে। তবে এর জন্য আইন সংশোধন করতে হবে। আইন সংশোধন করে পুনরায় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবার বরাদ্দের আবেদন চাওয়া হবে।

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন