মক্কেল ধরা তাদের পেশা

এক্সক্লুসিভ

আল-আমিন | ২২ এপ্রিল ২০১৭, শনিবার
গেইট দিয়ে কেউ প্রবেশ করলেই দৌড়ে যাচ্ছে তারা। কেউ হাত ধরে টানছেন। কেউবা বলছেন আমার সঙ্গে কন্ট্রাক করলে টাকাও কম লাগবে। কাজও হবে। জামিন কনফার্ম। ঢাকা মহানগর আদালত পাড়ার এ দৃশ্য নিত্যদিনের।
সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ওরা আদালত পাড়ার বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান করে। কাউকে প্রবেশ করতে দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ওরা নিজেদের পরিচয় দেয় উকিলের সাহায্যকারী হিসেবে। তাদের আসল কাজ মক্কেল ধরা। বিপদে পড়ে আসা লোকজনকে তারা তাদের পরিচিত আইনজীবীর কাছে নিয়ে যায়। গ্রেপ্তারকৃতকে জামিন করিয়ে নিতে সহায়তা করে। কখনো তারা গারদখানার সামনে, কখনো আইনজীবী সমিতির সামনে, আর বেশিরভাগ সময় প্রবেশ পথই হলো তাদের ঠিকানা। রাজধানী ঢাকার ৪৯ থানায় প্রতিদিন গড়ে গ্রেপ্তার হয় তিন শতাধিক নারী-পুরুষ। এদের মধ্যে কেউবা সন্দেহজনক, কেউ মাদকসহ, কেউবা অন্য কোনো কারণে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। আবার নিয়মিত  মামলার আসামিও থাকে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে। পুলিশ গ্রেপ্তারকৃতদের প্রতিদিনই আদালতে হাজির করে। আদালত থেকে জামিনে মুক্ত করতেই গ্রেপ্তারকৃতদের স্বজনরা দৌড়ে যান আদালতে। কিন্তু আদালতে জামিনের আবেদন করতে হলে উকিলের প্রয়োজন। যাদের বেশিরভাগেরই জানাশোনা উকিল নেই। এমন লোকদের টার্গেট করেই তারা ওত পেতে থাকে আদালত পাড়ায়।  এদের ভাষায় মক্কেল ধরা তাদের কাজ। এ কাজ করেই তারা সংসার চালান। এমনই একজন রহিম। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে মক্কেল ধরার কাজ করছেন তিনি। তিনি বলেন, কম টাকায় আইনি সহায়তার কথা বলে নিজেদের পরিচিত এডভোকেটদের কাছে মক্কেলদের নিয়ে যাই।
এ বিষয়ে ঢাকা জজকোর্টের পিপি এডভোকেট আবদুল্লাহ আবু মানবজমিনকে বলেন, আইনজীবীগণ অধিক মামলা ও বেশি রোজগারের জন্য কিছু লোককে নিজের এলাকা ও আদালত পাড়ায় কাজের জন্য রাখে। তবে কেউ যেন এদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার না হন এ জন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
সরজমিন বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে গারদখানার সামনে তসিকুল ইসলাম (৫০) নামে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন। ঢাকার বিভিন্ন থানা থেকে যেসব পুলিশের প্রিজনভ্যান আদালত পাড়ায় এসে গারদখানার সামনে দাঁড়াচ্ছে ওই ভ্যানগুলোর দিকে তার নজর। এসময় আজম নামে এক যুবক তাকে এসে বার সমিতির কার্যালয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তসিকুল তাকে জানান, তার ছেলেকে দেখে তিনি তার সঙ্গে যাবেন। এসময় আজম তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করেন। ওই মুহূর্তে সুমন নামে এক যুবক সেখানে হাজির হন।
সুমন তখন আজমকে বলে, এটা আমার মক্কেল। সবার আগেই তার সঙ্গে কথা হয়েছে। আমার উকিলের কাছে তিনি যাবেন। তাকে নিয়ে যাবেন বলেই বার বার চিৎকার দিতে থাকেন। আজমও তখন সুমনকে জানায়, না তার সঙ্গে সকাল বেলায় আগে কথা হয়েছে। আমার উকিলের কাছে তিনি যাবেন। এ নিয়ে তাদের দু্‌জনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। আদালতের টহল পুলিশের একটি দল সেখানে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। এতে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েন আদালতে আসা তসিকুল। তসিকুল মানবজমিনকে বলেন, তার ছেলের নাম আমিনূর রহমান আমিন (২৬)। তাদের গ্রামের বাড়ি বরগুনা জেলার পাথরঘাটার মোল্লাপাড়া এলাকায়। তার ছেলে পুরান ঢাকার ঋষিকেশ দাস লেনের একটি হোটেলে কাজ করে। বুধবার রাতে একটি মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে ধরেছে চকবাজার থানা পুলিশ। অথচ ওই ঘটনার সঙ্গে তার ছেলে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়। পুলিশ তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে ধরেছে। ঘটনা শোনার পরই তিনি রাতেই লঞ্চে ঢাকায় আসেন। আমিনের এক বন্ধুর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে, তার ছেলেকে পুলিশ আদালতে হাজির করবেন। তার কথা শুনেই তিনি সরাসরি আদালতে চলে আসেন। সকালে আদালতে এসে তিনি সুমনের কাছে জানতে চান আদালতের গারদখানা কোনটা? তখন ওই যুবক আমাকে গারদখানার সামনে নিয়ে যান। সে আমার কাছে আদালতে কেন এসেছি তা জানতে চান। আমি তাকে ঘটনাটি খুলে বলি। এরপর সুমন আমাকে জানায় যে, এসব মামলায় দ্রুত জামিন হয়। আমাদের উকিল নামকরা উকিল। আপনার ছেলে দ্রুত মুক্তি পাবে। এসময় তিনি আমাকে একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে চলে যান। কিছুক্ষণ পর আজম পরিচয় দিয়ে বলেন, কার জন্য তিনি এখানে অপেক্ষা করছেন। আমিও তাকে বিষয়টি খুলে বলি। তিনিও আমাকে জানান যে, তার কাছে একজন পরিচিত উকিল রয়েছে তিনি দ্রুত মামলার জামিন করিয়ে  দেবেন। ওই দুই যুবক আমাকে ধরে টানাটানি শুরু করেছে।
দুপুর ২টা। ঢাকা মহানগর আদালতের তৃতীয় তলায় আকতারুনেসা (৩৫) নামে এক নারীর  সঙ্গে সেলিম নামে এক যুবকের কথা কাটাকাটি হচ্ছে। টাকা লেনদেনের অঙ্ক কম হওয়ার কারণে তারা একে অপরকে দেখে নেয়ার হুমকি দিচ্ছেন। আকতারুনেসা বলেন, তার স্বামীর নাম সাইফুদ্দিন আহমেদ (৪৫)। তিনি উত্তর যাত্রাবাড়ীর ৩২/২/এ নম্বর একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন। বুধবার রাতে স্থানীয় এলাকায় দুই গ্রুপের মারামারি মামলায় তার স্বামীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ওই ঘটনাটি কিভাবে স্থানীয় সেলিম জেনে ফেলে। এরপর সকালে আমার বাড়িতে এসে জানায় যে, তিনি মামলার জামিন করিয়ে দেবেন। তাকে ১০ হাজার টাকা দিতে হবে। স্বামীর কথা চিন্তা করে আমি তার কথায় রাজি হই। আদালতে সকালে আমার স্বামীর জামিন হয়েছে। এখন সেলিম আমার কাছে আরো অতিরিক্ত ৪ হাজার টাকা দাবি করছে। ওই টাকার কথা সে আগে আমাকে বলেনি। সেলিম জানান, আমরা আইনি সেবা দিয়ে গরিব মানুষকে সাহায্য করি। লোক মারফতে শুনতে পাই সাইফুদ্দিন গ্রেপ্তার হয়েছে। ওই কথা শুনে আমি তার স্ত্রীর কাছে ছুটে যাই। জামিন করিয়ে দেয়ার কথা বলি। রাজিও হন তিনি। এখন আমাকে টাকা কম দিচ্ছে। এই কাজ তিনি কতদিন ধরে করেন প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, প্রায় ৫ বছর ধরে উকিলদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি।
এব্যাপারে আদালতে পুলিশের এসি (প্রসিকিউশন) মিরাস উদ্দিন আহমেদ জানান, একটি চক্র আছে যারা নতুন মক্কেলদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদের পছন্দের উকিলদের কাছে নিয়ে যান। তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ পেলে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

দূষণের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মৃত্যু বাংলাদেশে

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিশুদের অবস্থা শোচনীয়: ইউনিসেফ

চট্টগ্রামে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চাপায় বাসের ২ যাত্রী নিহত

র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মাদকসম্রাট ফারুক নিহত

ব্রেক্সিট আলোচনা শুরুর তাগাদা দিলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী

নকলা উপজেলা চেয়ারম্যানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

আফগানিস্তানে জঙ্গি হামলায় নিহত ৪৩

#MeToo কি পারবে নারী নিপীড়ন বন্ধ করতে?

‘প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্তে কোনো বাধা নেই’

রাজধানীতে গৃহবধুর আত্মহত্যা

‘আমি ইউটিউবের ভিউ গণনায় বিশ্বাসী না’

আলোচনায় ফের ইভিএম

‘অভিযোগ কাল্পনিক ও বানোয়াট’

মইনকে আশ্বস্ত করেছিলেন প্রণব

ব্লু হোয়েল গেম জায়েজ নয়

শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন চায় জেপি