বেপরোয়া মোটরসাইকেল

এক্সক্লুসিভ

আব্দুল আলীম | ২২ এপ্রিল ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৫৮
 সকাল কিংবা রাত। ফুটপাথ ধরে নিশ্চিন্তে হাঁটার জো নেই। পেছন থেকে বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে সাইড চাইছে মোটরসাইকেল। মানুষের হাঁটার জায়গায় বেপরোয়া চলছে এসব যান। ফুটপাথের নিরাপত্তা আইন ও ফুটপাথে মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুটপাথের ওপর মোটরসাইকেল চলাচল থেকে দুর্ঘটনার পরিমাণ দিন দিন উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। অথচ ফুটপাতের ওপর পথচারী ছাড়া কোনো ধরনের যান চলাচলের অধিকার নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১২ সালে এক আদেশের মাধ্যমে ফুটপাথে মোটরসাইকেল চালানো নিষিদ্ধ করে হাইকোর্ট। সেসঙ্গে নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালালে দায়ী চালকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণে পুলিশের প্রতি নির্দেশ দেন। এছাড়া, মোটরযান অধ্যাদেশ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অ্যাক্ট অনুযায়ী রাস্তায় বা জনগণের চলার জায়গায় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে না। যদি কেউ জনগণের স্বাভাবিক চলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাকে জেল, আর্থিক জরিমানা অথবা জেল ও জরিমানা উভয়ই করতে পারবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। তবে এসব আইন-কানুনের কোনো তোয়াক্কা করছে না বেপরোয়া মোটরসাইকেলচালকরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই রাজধানীর প্রায় সব রাস্তায় এভাবে চলছে বেপরোয়া এসব মোটরসাইকেল। ট্রাফিক পুলিশের সামনে এমন আইন অমান্য করার ঘটনা এখন সাধারণ দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ঢাকা মেট্রো পলিটন পুলিশের অ্যাডিশনাল কমিশনার (ট্রাফিক) মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কোনো মোটরসাইকেল আরোহী, সাইকেল, রিকশা বা অন্য কোনো যানবাহন নিয়ে যেন কেউ ফুটপাথে না উঠতে পারে তার জন্য আমরা সড়কে গাইড পোস্ট (লোহার রেলিং) নির্মাণ করে দিয়েছি অধিকাংশ জায়গায়। এর পরও যেসব জায়গায় মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্য ফাঁকা রাখা হয়েছে। সেখান দিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে ফুটপাতে উঠে পড়ে চালকরা। তবে যেসব জায়গায় এরকম ওঠে সেখানে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।
রাজধানীতে কত মোটরসাইকেল আছে তার সঠিক হিসাব না থাকলেও ঢাকা মেট্রো পলিটন পুলিশ (ডিএমপি) বলছে, ঢাকায় নিবন্ধনহীন মোটরসাইকেলের সংখ্যা নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের চেয়ে দ্বিগুণ। বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী গত নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৫১১টি। এর মধ্যে ২০১০ সাল পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন হিয়েছে ২১ হাজার ৮১টি। ২০১১ সালে ৩৪ হাজার ৭০৮টি। ২০১২ সালে ৩২ হাজার ৮১০টি। ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ৩৩১টি। ২০১৪ সালে ৩২ হাজার ৮৯৪টি। ২০১৫ সালে ৪৬ হাজার ৭৬৪টি এবং ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৯২৩টির রেজিস্ট্রেশন হয়েছে।
বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) নাজমুল আহসান মজুমদার বলেন, সিগন্যাল থামলেই ফুটপাথের ওপর বরাবরের মতো চালিয়ে দেয় মোটরসাইকেলগুলো। এতে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে এবং পথচারীর স্বাভাবিক পথ চলায় ব্যাঘাত ঘটে। অথচ যারা মোটরসাইকেল চালায় তারা সবাই আইনকানুন সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কিন্তু তারা ইচ্ছা করেই এভাবে ফুটপাথে চালিয়ে দেয় মোটরসাইকেল। তিনি বলেন, বিআরটিএর মোবাইল কোর্টগুলো শুধু মোটরসাইকেলকে উদ্দেশ্য করে সিগন্যাল এলাকায় বসে না। তবে এ বিষয়ে আমরা সচেতন। মাথায় রাখলাম। এরপর থেকে মাঝে মাঝে সিগনাল এলাকায় মোবাইল কোর্ট বসাবো। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা যায়, তার ৫৮ শতাংশই পথচারী। আর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালক ও আরোহীর মারা যাওয়ার বা পঙ্গু হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।  
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ মানবজমিনকে বলেন, ফুটপাথ শুধু পথচারীদের জন্য। এখানে অন্য কারো অধিকার নেই। তবে আমাদের দেশের রাস্তাগুলোয় জ্যামের সময় মোটরসাইকেল চালিয়ে দেয়া হয়। এতে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এ জন্য ফুটপাথে গাইড পোস্ট (লোহার রেলিং) দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। ফুটপাথে মোটরসাইকেল চালানো একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। অথবা কোথাও ধরলেও হয়তো তাদের ধমক দিয়ে ছেড়ে দেয় অথবা তাদের কাছ থেকে কোনো সুবিধা নিয়ে ছেড়ে দেয়। কোথাও কোনো মোটরসাইকেলওয়ালার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বলে আমার জানা নেই।


 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন