পাঁচ দিনে চার খুন

বাংলারজমিন

প্রতীক ওমর, বগুড়া থেকে | ২১ এপ্রিল ২০১৭, শুক্রবার
বগুড়া এখন খুনের নগরী হয়ে উঠেছে। পাঁচ দিনে চার খুনে আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে পুলিশ। ঠেকানো যাচ্ছে না ছিনতাই। ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে একটি চক্র।
চলতি মাসের ১৬ তারিখে প্রকাশ্য দিবালোকে বালু ব্যবসায়ীকে খুনের চার দিনের মাথায় ১৯ এপ্রিল পৃথক দুজন অটোচালকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার ৫ দিনের মাথায় শহরের মালতিনগর এলাকার একটি ডোবা থেকে অজ্ঞাত (৪০) ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বগুড়া সদর থানার এসআই হারুন জানান, বৃহস্পতিবার সকালে শহরের মালতিনগর বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ কোয়ার্টারের পাশের একটি ডোবায় লাশ দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে লাশটি উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। তার গায়ে একটি শার্ট ছিল। নিচের অংশে কোনো পোশাক ছিল না। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার নাম পরিচয় পাওয়া যায়নি। এর আগের দিন ১৯শে এপ্রিল বগুড়ার সদরের গোকুল এলাকার অটো ভ্যানচালক তোতা মিয়ার (৫৫)  গলাকাটা লাশ স্থানীয় একটি বিল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ছিনতাইকারীরা তোতা মিয়াকে হত্যা করে ভ্যান ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। নিহত তোতা মিয়ার ছেলে মামুন জানায়, প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার বিকাল ৫টার দিকে তার বাবা অটো ভ্যান নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। মামুন জানায়, তার বাবা রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যেই বাড়ি ফেরে। ওই দিন তার বাবা রাতে আর বাড়ি ফেরেনি। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা চিন্তায় পড়ে যায়। বুধবার সকালে তাকে খোঁজাখুঁজির পর নুরাইল বিলে গলাকাটা অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়। একই দিনে পৃথক আরেক অটোচালক সিদ্দিকুর রহমানের (৪০) লাশ মেলে কাহালুর দরগাহাট এলাকায়। সিদ্দিকুর শাজাহানপুর উপজেলার চকদুলহার গ্রামের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে। কাহালু থানার ওসি নূর-ই আলম সিদ্দিকী জানায়, মঙ্গলবার রাতে তাকে শ্বাসরোধ করে ছিনতাইকারীরা কাহালুর দরগাহাট এলাকায় ফেলে যায়। পুলিশ বুধবার তার লাশ উদ্ধার করে। এর আগে ১৬ই এপ্রিল আধিপত্য ও বালু ব্যবসার বিবাদকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য দিনের বেলায় হযরত আলীকে (৪৫) কুপিয়ে হত্যার পর বীরদর্পে চলে যায় সন্ত্রাসীরা। তিনি ১৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহুরুল ইসলামের কার্যালয়ের সামনে খুন হন। এর কয়েক দিন আগে ১৩ই এপ্রিল বগুড়ার গাবতলীতে জমিজমা ও শত্রুতার জের ধরে প্রতিপক্ষের লোহার রড ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত জেল্লাল রহমান (৬০) নামের এক বৃদ্ধ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহত ব্যক্তি পশ্চিম দোয়ারপাড়া গ্রামের মৃত মহির উদ্দীন প্রাংয়ের ছেলে। তাকে ৪-৫ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী লাঠি, লোহার রড, হাসুয়া, লোহার চেইন দিয়ে পিটিয়ে প্রকাশ্যে হত্যা করে।
এদিকে খুনের পাশাপাশি প্রতিদিন ছিনতাইয়ের কবলে পড়ছে সাধারণ মানুষ। এসব ছিনতাইয়ের অভিযোগ পুলিশের কাছে থাকলেও আমলে নিচ্ছে না কেউ। ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইয়ের জন্যই তারা খুন পর্যন্ত করতে দ্বিধা করছে না। বিশেষ করে অটোভ্যান চালকদের খুনের সঙ্গে ওই ছিনতাইকারীরাই জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চলতি মাসের ৭ তারিখে তাদের আক্রমণের শিকার হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন এটিএন বাংলার বগুড়া অফিসের ক্যামেরাপারসন আজিজুল হাকিম। বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া এলাকায় কয়েকজন ছিনতাইকারী একটি যুবককে মারপিট করছিল। সেই সময় ওই যুবকের চিৎকারে হাকিম তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে যায়। সন্ত্রাসীরা হাকিমের সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তার ওপরও হামলা চালায়। হামলায় হাকিম গুরুতর আহত হয়ে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। তার চোখে মারাত্মক আঘাত লাগায় সেরে উঠতে অনেক সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এমন কি তার চোখ একেবারেই নষ্ট হয়েও যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন চিকিৎসকরা। এর কয়েক দিন পরে ১৩ই এপ্রিল বগুড়ার পত্রিকা বিক্রেতা ও এজেন্ট সাজু শেখ ছিনতাইকারীদের আক্রমণে গুরুতর অহত হয়। ব্যবসায়িক হিসাব নিকাশ শেষে রাতে বাসায় বাইসাইকেলে ফেরার পথে শহরের কৈগাড়ী এলাকায় একদল ছিনতাইকারী তাকে থামিয়ে কাছে থাকা নগদ ৫ হাজার টাকা নিয়ে নেয়। ওই সময় সাজু শেখ তাদের টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে পুলিশ তাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।
১৫ই এপ্রিল এইচএসসি পড়ুয়া নিপুণ দাস ও তার এক বন্ধু কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার থেকে ক্লাস শেষে রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহরের ব্যস্ততম এলাকা সাতমাথায় গেলে কয়েকজন ছিনতাইকারী তাদের কাছে থাকা দামি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। একের পর এক এসব খুন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও পুলিশের পক্ষ থেকে তেমন কোনো অভিযান চোখে পড়ছে না। তারা দেখেও না দেখার ভান করছে। এমনকি মানুষ হতাশ হয়ে এসব অভিযোগ পর্যন্ত থানায় করছে না। ফলে বগুড়া এখন খুন ছিনতাইয়ের নগরীতে পরিণত হয়েছে। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে ছোটখাটো ছিনতাইয়ের বিষয় স্বীকার করা হলেও সামগ্রিক বাস্তব অবস্থা স্বীকার করতে চায় না।
এ বিষয়ে বগুড়া সদর থানার ওসি এমদাদ হোসেন বলেন, ছোটখাটো মোবাইল ছিনতাইকারী আছে। সাম্প্রতিক সময়ে বড় কোনো ছিনতাইয়ের ঘটনা নেই। তার পরও তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন