মন ভোলানো আকসারধাম

মত-মতান্তর

রাইসুল সৌরভ | ২০ এপ্রিল ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:১৮
দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তির পর এ পালার গুজরাট ভ্রমণের দ্বিতীয় দিনের শুরুটা আমাদের দলের সবাই বেশ উচ্ছ্বাস নিয়ে রাজ্যের রাজধানী আহমেদাবাদ শহর দর্শন দিয়ে শুরু করেছিল। যদিও তখনও প্রায় সকলকেই এর আগের দু দফা বিভীষিকাময় বাস ভ্রমণ তাড়া করে ফিরছিল। গোয়া থেকে বাসে করে আহমেদাবাদে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দেড় দিন বা ৩৬ ঘণ্টার মতো! সে ভ্রমণ শুধু বিরক্তিকরই না, সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুলও বটে। মুম্বাই থেকে ট্রেনের টিকিট না পেয়ে গোয়ার উদ্দেশ্যে বাসে করে প্রথম আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরুতে দলের প্রায় সকলেই প্রথমবারে মতো বাসে শোয়ার ব্যবস্থা দেখে উৎফুল্ল হলেও রাত ও পথ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই তা জীবনের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। মূলত বাস যখন আঁকাবাঁকা পথে মোড় ঘুরতে থাকে তখন বাসের সঙ্গে সঙ্গে আপন শরীরও অবলীলায় এক কাত থেকে অপর কাত হতে থাকে।
ফলস্বরূপ ঘুম বাদ দিয়ে বাসের জানালার সঙ্গে সাঁটা লোহার হাতল আঁকড়ে নিজেকে সামলে রাখায় মুখ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আর একটু পর পরই মনে হতে থাকে এই বুঝি বাস আবার বাঁক নিয়ে গোটা শরীর দুলিয়ে দিয়ে যাবে। গত্যান্তর না পেয়ে নিরুপায় বিভীষিকাময় রাত পেরিয়ে ভোরের যাত্রা বিরতিতে যখন আমরা একে-অপরের দেখা পায়, ততক্ষণে রাতভর দোলাদুলির চোটে মগজ ঘুরিয়ে বমি বমি ভাব নিয়ে গোয়ার সমুদ্র-সৈকতে দাপানোর শখ দলের সবারই উবে গেছে। গোয়া থেকে ফের ট্রেনের টিকিট কাটতে যেয়ে রিক্ত হাতে ফিরে আবারো বাসে ভরসা রাখা। এবারও যা হবার তাই হলো এবং বিনা মিটিংয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল বাসে ফের চড়তে হলে আর স্লিপার কোচ নিয়ে বড়লোকি ভাব নয়; আমাদের দেশের মতো বসে যাত্রার ব্যবস্থা থাকলে তৃতীয়বার বাসে উঠবো নইলে পায়ে হেটেই বাড়ি ফিরবো!

যাই হোক, আগের দিন ঠিক করে রাখা ড্রাইভার কাম গাইড আহমেদাবাদ ঘোরাতে ঘুম না ভাঙতেই সঠিক সময়ে হাজির। ড্রাইভার আমাদেরকে আশ্রম রোডের হোটেল থেকে তুলে নিয়ে শহর পেরিয়ে গন্তব্যে চলতে শুরু করলো। আহমেদাবাদ ভারতের আর পাঁচটা বড় শহরের মতোই উন্নত মনে হল। তার উপর আবার এখন প্রধানমন্ত্রীর রাজ্য; তাই সে আভিজাত্যও জানান দিল। প্রশস্ত রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে নিরবচ্ছিন বাস চলার ও যাত্রী ওঠা-নামার আলাদা ব্যবস্থা দেখে আমাদের হা-হুতাশও বাড়তে লাগলো। ইশ! আমাদের প্রধান শহরেও যদি অন্তত এমন ব্যবস্থা থাকতো।

ভ্রমণের শুরু ইস্কন মন্দির দর্শন দিয়ে। তারপর থেকে একের পর এক মন্দির দেখতে দেখতে যখন হাঁপিয়ে উঠেছি তখন আমাদেরই একদল ভ্রমণসঙ্গী পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়া ইস্তফা দিয়ে শহরের লাল দরওজা বাজার পানে ছুটলো সস্তায় নিজেদের কেনাকাটা সারতে। এদিকে আমরা আরেক দল, যারা তখনো ভ্রমণের নেশায় বুঁদ; উপরন্তু যাদের কেনাকাটায় খুব বেশি তাড়া নেই তারা আঠার মতো লেগে রইলাম আমাদের সেই গাইড কাম ড্রাইভারের সঙ্গে সমগ্র আহমেদাবাদের দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরে দেখতে। ড্রাইভাররূপি গাইড যখন কিলোমিটার হিসেব করে দুরত্বসহ দিনের পরবর্তী গন্তব্যের নাম আকসারধাম জানালো, তখন আমরা অবশিষ্ট সবাই মোটামুটি নির্বিকার। কারণ আকসারধাম কী ধরণের দর্শনীয় বস্তু সে সম্পর্কে সবাই-ই ব-কলম!
আকসারধাম পৌঁছে প্রবেশ দ্বারের এক কোনে দর্শনার্থীদের জটলা দেখে টিকিট কাটার লাইন ঠাওরে প্রথমেই ভুল করে বসলাম। কাছে ভিড়তেই জানা গেল ভেতরে প্রবেশের পূর্বে মুঠোফোন, ক্যামেরাসহ সকল ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস সেখানে জমা দিয়ে যেতে হবে। অগত্যা উপায়ন্ত না দেখে দলের সবাই মিলে পিপীলিকার সারির মতো দর্শনার্থীদের যে লাইন সেসব জমা নেবার কাউন্টারে যেয়ে ঠেকেছে সে লাইন অন্ধের মতো অনুসরণ করে মলিন বদনে কেউ কেউ কিছুটা হারাবার শঙ্কায় নিয়ে ফোন, ব্যাটারি, চার্জার, ক্যামেরা, ব্যাগ সবই জমা দিয়ে প্রবেশের পরবর্তী লাইন অনুসরণ করতে লাগলাম। তবে শঙ্কা কিছুটা কাটলো জমাদানকারীদের প্রত্যেকের ছবি সিসিটিভি ক্যামেরায় তুলে রাখায় আর কম্পিউটারাইড সিস্টেমে জিম্মা রাখায়। নিরাপত্তার হ্যাপা এখানেই শেষ হলে ভাল ছিল; প্রবেশের ঠিক আগ মুহূর্তে ছেলেদের কোমর থেকে বন্ধনী (বেল্ট) হাতে স্থান করে নিল। এই সুযোগে কেউ কেউ ফোঁড়ন কেটে উঠলো; “বাব্বা, ড্রাইভার ব্যাটা মনে হচ্ছে নিশ্চয় ফন্দি এঁটে ঘোরানোর পরিবর্তে আমাদের জ্বালায় নয়তো ভুলে বিমানবন্দরে সি অফ করে গেছে! নয়তো কী এমন আহামরি জিনিস দেখতে এলাম যে দফায় দফায় নিরাপত্তার জাল উৎরাতে হবে?”
নিরাপত্তাদ্বার মাড়িয়ে বেল্ট-টেল্টকে তার নির্ধারিত স্থানে আবার ঠাই করে দিয়ে অন্য সঙ্গীদের জন্য অপেক্ষার ফাঁকে যেইনা একটু ছায়া খুঁজে নিয়ে জিড়িয়ে নিতে দাঁড়িয়েছি, ওমনি চোখের পলকে সকল বিরক্তি কর্পূর যেমন সূর্যালোকের সংস্পর্শে নিমিষে উবে যায় ঠিক তেমনিভাবে আকসারধামের বাতাসে মিলিয়ে গেল। সবার একই উক্তি ভাগ্যিস অন্যদের পাল্লায় পড়ে শপিংয়ে গা ভাসায়নি; নইলে গুজরাট আসাই মাটি হতো। এবারের দীর্ঘ ভারত ভ্রমণে একমাত্র আকসারধামের মন ভরানো আবহ চিত্তে নিরেট আনন্দ বয়ে এনেছে।

আকসারধাম মূলত মন্দির হলেও সকল ধর্মের মানুষ-ই এর নির্মাণ শৈলির সৌন্দর্যে অবগাহন করতে আসে। আকসারধাম নামে বহুল প্রচারিত হলেও এর কেতাবি নাম স্বামীনারায়ণ আকসারধাম; যেখানে মূলত স্বামীনারায়ণের জীবন ও শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। ১৩ একর জায়গা জুড়ে অনিন্দ্য সুন্দর রূপে গড়ে তোলা পুরো কমপ্লেক্সের একেবারে মদ্দিখানে আকসারধাম মন্দির গড়তেও তের বছর সময় লেগেছিল! মূল মন্দিরের কাজ ১৯৭৯ সালে শুরু হলেও পুরো কমপ্লেক্স চালু করতে ’৯২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। নিরাপত্তা নিয়ে এত কড়াকড়ির কারণ অনুসন্ধান করতে যেয়ে অন্তর্জাল ঘেঁটে জানা গেল ২০০২ সালে এখানে একবার সন্ত্রাসী হামলায় ৩০ জন হত ও ৭০ জন মারাত্মক জঘম হয়েছিল।
আকসারধামের প্রবেশ পথের দু’ পাশে সবুজ কচি ঘাসের গালিচা বিছানো উদ্যান আর চমৎকার সজ্জায় লাগানো গাছ-গাছালি বিশেষত গাছ দিয়ে তৈরি হাতির অবয়ব আর মন্দিরে সদর দরজার ঠিক সামনে তাজমহলের আদলে তৈরি চৌবাচ্চার সঙ্গে পানির ফোয়ারাই বুঝি ক্লান্তি মিলিয়ে দিতে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। মন্দিরের চারপাশের পরিবেশের অমিত সৌন্দর্য আমাদেরকে আরো বেশি পোঁড়াচ্ছিল এই ভেবে যে; ক্যামেরা শূন্য আমরা না পারবো কেনাকাটাকারীদের গান্ধীনগরের এই শ্রেষ্ঠ স্থানের ছবি দেখিয়ে অন্তর জ্বালিয়ে দিতে, না পারবো একখানি স্থিরচিত্র তুলে ভীষণ সুন্দর এই সৌন্দর্যকে স্থায়ী করে রাখতে।

১০৮ ফুট উঁচু, ১৩১ ফুট চওড়া এবং ২৪০ ফুট দীর্ঘ এই মন্দির তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে ৬০০ টণ গোলাপি রাজস্থানি বেলেপাথর। ভেবে বিস্ময়ের ঘোর কাটে না যে এই মন্দির নির্মাণে কোন রড ব্যবহার করা হয়নি; পাঁচ টণ ওজনের ২০ ফুট দৈর্ঘের পাথুরে বিম ব্যবহার করা হয়েছে মন্দিরের ওজন ধরে রাখতে। মন্দিরের ঠিক মাঝে স্বামীনারায়ণের স্বর্ণের প্রলেপ দেয়া সাত ফুটের একটি প্রতিবিম্ব রয়েছে; যেখানে ভক্তরা আসেন উপাসনা করতে। তিনতলা মন্দিরের উপরের তলায় স্বামীনারায়ণের জীবনীভিত্তিক চিত্র প্রদর্শনী আর নিচ তলায় স্বামীজির জীবনালেখ্য বিভিন্ন ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
মন্দিরের চারপাশ ঘিরেও বেলেপাথরের আর মার্বেল পাথরের চমৎকার স্থাপত্যশৈলী নির্মান করা হয়েছে; যেখানে পাঁচটি প্রদর্শনী প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে। প্রেক্ষাগৃহগুলিতে সনাতন ধর্মের বিবিধ দিক ও স্বামীনারায়ণের জীবন এবং দীক্ষা নিয়ে অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন চাইলে টিকিট কেটে দেখে নেয়া যাবে। এছাড়াও মন্দির কমপ্লেক্সের অন্যতম আকর্ষণ সাত-চিত-আনান্দ ওয়াটার শো। যে শো-য়ে সঙ্গীত, অগ্নি, ফাউন্টেইন এ্যানিমেশন, লেজার, ওয়াটার স্ক্রিন প্রজেকশনের মিশেল দর্শকদের শুধু বিমোহিত-ই করে না, জলের অপূর্ব খেলায় উদ্বেলিতও করে সমান তালে।
আকসারধামের পুরো আঙ্গিনা জুড়ে হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন ভাস্কর্য, ঝর্না, পাথুরে পথের ধারে বৃক্ষরাজি আর ফুলের বাগানের ছড়াছড়ি। যা সমগ্র আঙ্গিনার কেবল সৌকর্য-ই বৃদ্ধি করেনি; বরং চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে স্নিগ্ধ মোহময়তার এক মিহি আবেশ।  যেখানে প্রকৃতি ও ধর্ম মিলেমিশে হয়েছে একাকার। যে পরিবেশ একদিকে যেমন ধরে রেখেছে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য অন্যদিকে আবার নিশ্চিত করেছে অনিন্দ্য সৌন্দর্য। এককথায় আকসারধাম কেবল কোন প্রচলিত ধারার ধর্মালয় নয়, সৌন্দর্যেরও উপাসনালয় যেন। প্রকৃতির যে নিবিড়তা শুধু ধর্ম চর্চার মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি বয়ে আনে না, চিত্তের পরিতুষ্টিও বয়ে আনে অফুরান।
রাইসুল সৌরভঃ ভ্রমণপিপাসু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও আইনজীবী
raisul.sourav@outlook.com
 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

‘বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেনা’

লেবাননে বৃটিশ কূটনীতিককে শ্বাসরোধ করে হত্যা

বিমানে দেখা এরশাদ-ফখরুলের

হলফনামার তথ্য গ্রহণযোগ্য নয়: সুজন

ছিনতাইকারীর টানাটানিতে মায়ের কোল থেকে পড়ে শিশুর মৃত্যু

গুজরাট ও হিমাচলে বিজেপিই জিততে চলেছে

আরো ৪০ রোহিঙ্গা গ্রাম ভস্মীভূত:  এইচআরডব্লিউ

ভর্তি জালিয়াতি সন্দেহে রাবির দুই ছাত্রলীগ নেতা আটক

৭ ঘণ্টা পর পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল শুরু

‘এটাও কিন্তু একটা চ্যালেঞ্জের বিষয়’

সৌদিই ব্যতিক্রম

তাদের কি বিবেক বলে কিছু নেই

ঢাকা উত্তরের উপনির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে

যেভাবে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত হয় আকায়েদ

‘উন্নয়ন কথামালায়, মানুষ কষ্টে আছে’

সারা দেশে বিএনপির প্রতিবাদ কর্মসূচি আগামীকাল