আরব বসন্ত, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা

বিশ্বজমিন

মোহাম্মদ আবুল হোসেন | ১২ এপ্রিল ২০১৭, বুধবার
বিষাদ-সিন্ধু’র জন্ম হয়েছিল যে সিরিয়াতে সেখানেই এখন চলছে হত্যাকাণ্ডের এক প্রতিযোগিতা। এখন সেখানে ‘সীমার’-এর খঞ্জর নয়, রক্তের হোলি উৎসবে মেতেছে দেশটির সরকার, সরকারপক্ষ ত্যাগীরা, আন্তর্জাতিক কয়েকটি মহল, জঙ্গি গোষ্ঠী, বিভক্ত হয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠী ও প্রাসঙ্গিক কিছু মহল। সিরিয়া যুদ্ধ এখন আর প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ও তার পক্ষত্যাগী সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জোট ফ্রি সিরিয়ান আর্মির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সমর্থন করছে রাশিয়া, ইরান, ইরাক। বলা হয়, যোদ্ধা গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও তাকে সমর্থন করছে। তারা যে যেভাবে পারছে সেভাবে অস্ত্র অথবা সামরিক সহযোগিতা করছে। অন্যদিকে বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক, কাতার, সৌদি আরব ও বিভিন্ন জাতিগত অংশ। সমর্থন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত জোটের পক্ষ থেকেও। এ লড়াইয়ে জঙ্গিরা বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। ফলে লড়াইটা আসলে কে কার সঙ্গে বা কি উদ্দেশ্যে করছে তা এখন গোলমেলে। যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে দৃশ্যত সিরিয়া গৃহযুদ্ধের কোনো সমাধান অদূর ভবিষ্যতে নেই। অসহায় বিশ্ব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে শুধু রাস্তায়, গলির মোড়ে, এখানে ওখানে মানুষের লাশ। এ লাশ দাফন করার মতো জায়গা পর্যন্ত নেই- এমন রিপোর্টও এসেছে। স্থান নেই হাসপাতালগুলোর মর্গে। এখন সেখানে যা চলছে তা হলো শক্তি প্রদর্শন। কিন্তু তা করতে গিয়ে রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঊষর মরুর তপ্ত মাটি। বুলেটের আঘাতে, গ্রেনেডের বিস্ফোরণে, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কত দুগ্ধপোষ্য শিশু, কত অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, কত নববধূর স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে তার সঠিক হিসাব কোনোদিন মিলবে না। একবিংশ শতকে সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষতার সময়ে সভ্য মানুষ তাই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে সিরিয়ার দিকে। মানবতার কত নিকৃষ্ট লঙ্ঘন ঘটছে সেখানে! এরই মধ্যে প্রায় ৫ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন এই অভিশপ্ত যুদ্ধে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ লাখ। যুদ্ধ শুরুর আগে সিরিয়ায় যে পরিমাণ মানুষ বাস করতেন তার অর্ধেক হয়েছেন বাস্তচ্যুত। এ সংখ্যা এক কোটি ২০ লাখের বেশি। ২০১১ সালে আরব বিশ্বে শুরু হয় ‘আরব বসন্ত’। জনতার সেই উত্তাল বাঁধভাঙা আক্রোশের মুখে ক্ষমতা হারান প্রথমে তিউনিশিয়ার প্রেসিডেন্ট জিনে আবিদিন বেন আলি। এরপর ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয় মিশরের প্রায় ৩০ বছরের স্বৈরশাসক হোসনি মুবারককে। সেই আরব বসন্ত অশান্ত করে তুলেছে ইয়েমেনকেও। সিরিয়ায়ও দেখা দেয় আরব বসন্ত নামের গণঅভ্যুত্থান। একে সমর্থন দিয়ে শোকবার্তা লেখার অপরাধে সিরিয়ার ১৫ জন বালককে আটক করে নির্যাতন করা হয়। তাদের একজন ১৩ বছর বয়সী হামজা আল খতিব। নৃশংসভাবে নির্যাতনের কারণে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার শুরু এখান থেকেই। এ হত্যার প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে মানুষ। শত শত মানুষ রাজপথে নেমে আসে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ তাদেরকে দমন করেন কঠোর হাতে। হত্যা করেন অসংখ্য মানুষকে। আটক করে জেলে পোরেন অনেক মানুষকে। ২০১১ সালের জুলাই। এ সময় সেনাবাহিনীর একটি অংশ সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে গঠন করে ফ্রি সিরিয়ান আর্মি। বিদ্রোহী এ গ্রুপের লক্ষ্য হলো প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করা। আর এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।
শুরুর দিকটায় সিরিয়ায় স্বাধীনভাবে কথা বলা, মত প্রকাশ করার সুযোগ ছিল না। অর্থনীতি ছিল নাজুক অবস্থায়। এসবই সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উস্কে দিতে সহায়তা করেছে। সঙ্গে ছিল সাধারণ মানুষের ওপর সরকারের দমন-নীতি। তিউনিশিয়া, মিশরে সফল গণঅভ্যুত্থান এসব মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল। এ সময় অনেক ইসলামপন্থি আন্দোলনকারীরাও দৃঢ়তার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট আসাদের শাসনের বিরোধিতা করতে শুরু করে। ১৯৮২ সালে বাশার আল আসাদের পিতা হাফিজ আল আসাদ হামা’য় মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে সামরিক দমন-পীড়নের নির্দেশ দেন। ওই অভিযানে ১০ থেকে ৪০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয় পুরো হামা শহরকে। ফলে প্রেসিডেন্ট আসাদের ওপর ব্রাদারহুডের ক্ষোভ  তো রয়েই গিয়েছিল। সেই সঙ্গে ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানে বড় একটি ভূমিকা রেখেছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রচণ্ড খরা দেখা দেয় সিরিয়ায়। প্রায় ১৫ লাখ মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে ছুটে যান। এর ফলে দারিদ্র্য ও সামাজিক অশান্তি বাড়তে থাকে। সিরিয়ায় যে সংকট, প্রথমে তা কিন্তু জাতিগত পর্যায়ে শুরু হয় নি। সংখ্যালঘু ধর্মীয় গ্রুপগুলো সমর্থন দিতে থাকে প্রেসিডেন্ট আসাদকে। সংখ্যাগরিষ্ঠরা সমর্থন দিতে থাকে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের, যারা হলেন সুন্নি মুসলিম। যদিও সিরিয়ার বেশির ভাগই হলেন সুন্নি মুসলিম, তবু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থায় প্রাধান্য রয়েছে দেশটির আলাওয়িত সম্প্রদায়ের। প্রেসিডেন্ট আসাদ এ সম্প্রদায়ের। সিরিয়ার এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলো। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান ও ইরাক সরকার সমর্থন দেয় আসাদকে। লেবাননের হিজবুল্লাহও তাই করে। অন্যদিকে সুন্নি রাষ্ট্র তুরস্ক, কাতার, সৌদি আরব সমর্থন দেয় বিদ্রোহীদের। এ যুদ্ধে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরো নাজুক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ২০১৪ সাল থেকে সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভ্যান্ট (আইসিল)কে লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট। ২০১৫ সালে রাশিয়া শুরু করে হামলা। সন্ত্রাসীদের টার্গেট করে তারা হামলা চালাচ্ছে দাবি করলেও পশ্চিমারা বলছে, তারা আদতে  প্রেসিডেন্ট আসাদ বাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে। তাকে বাঁচানোর যুদ্ধ করছে। প্রেসিডেন্ট আসাদের প্রতিরক্ষাকে উন্নত করতে সিরিয়ায় পাঠিয়েছে সামরিক উপদেষ্টা। আরব বিশ্বের কতগুলো দেশ, বিশেষ করে তুরস্ক সিরিয়ার বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে দিয়েছে অস্ত্র ও সরঞ্জাম। এখন দৃশ্যত সিরিয়ার এ যুদ্ধ কার্যত আসছে বাইরে থেকে। বলা হচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আইসিলের বিপুল সংখ্যক পদস্থ ব্যক্তি, লেবাননের যোদ্ধা গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা প্রেসিডেন্ট আসাদের হয়ে লড়াই করছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে ইরান ও আফগানিস্তানের কিছু যোদ্ধা। যদিও আসাদ সরকারের বিরোধিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র তবু তারা এ লড়াইয়ে গভীরভাবে যুক্ত হতে চায় নি। ২০১৩ সালে আসাদ সরকার রাসায়নিক গ্যাস হামলা চালালেও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয় নি। তবে এ বছর ইদলিব প্রদেশের খান শেইখুনে যে ভয়াবহ রাসায়নিক গ্যাস হামলা চালানো হয়েছে তার জবাবে নীরব থাকতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে একটি বিমানঘাঁটি।

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

কর্ণফুলীতে বিএনপির তিন প্রার্থীর নির্বাচন বর্জন

পূর্ব লন্ডনে এসিড হামলায় আহত ৬

সাদুল্যাপুরে ১১২ মেট্রিক টন চাল জব্দ, গুদাম সিলগালা

রোহিঙ্গা ইস্যুতে এবার বিমসটেকেও ছায়া পড়েছে

রাজধানীতে আগুনে পুড়ে নিহত ১

চতুর্থ দফা ক্ষমতার দিকে দৃষ্টি মার্কেলের

‘অযথা এসব গুঞ্জনের কোন মানে হয় না’

সন্তানের নাড়ি কাটার সময়ও পাননি হামিদা

সেনাবাহিনীর কার্যক্রম শুরু, ফিরছে শৃঙ্খলা

কাল থেকে গণশুনানি

সার্ক সম্মেলন নিয়ে এবারও অনিশ্চয়তা

মাদরাসায় শিক্ষক নিয়োগ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগের স্তূপ

যেখানে এখনো পৌঁছেনি ত্রাণ

স্বস্তিতে বিএনপি আওয়ামী লীগ টেনশনে

চলছে পূজার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

বজ্রপাতে নিহত ১১