সিরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলা ট্রাম্প-পুতিন সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ

বিশ্বজমিন

রবার্ট ফিস্ক | ১১ এপ্রিল ২০১৭, মঙ্গলবার
তাহলে বাশার আল-আসাদ কি বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করেছেন? রাশিয়ানরা অবশ্যই জানে। তারা (সিরিয়ার) বিমান ঘাঁটিতে আছে, মন্ত্রণালয়ে আছে, সামরিক সদরদপ্তরে আছে। তাই তারা যে বললো সিরিয়ান বাহিনী গ্যাস ব্যবহার করেনি, সেটি সম্পর্কে তারা নিশ্চিত হলেই ভালো।
ট্রাম্প যখন পরে ৫৯টি ক্রুজ মিশাইল মারলেন তখন আগেভাগে জানিয়ে দেওয়া হয় রাশিয়ানদের। ওয়াশিংটন দাবি করেছে, এক ঘন্টা আগে জানানো হয়। না। জানানো হয় হামলার অনেক ঘন্টা আগে। ততক্ষণে সিরিয়ার যুদ্ধবিমান ঘাঁটি থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সিরিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ান কাউকে মারা যাবে না।
পূর্বাঞ্চলীয় আলেপ্পো দখলের পর অপদার্থ অহংকারী সিরিয়ার সেনাবাহিনী কি তাহলে দ্রুত যুদ্ধ শেষের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল? এই প্রশ্ন অবশ্যই জিজ্ঞেস করতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, যেসব গ্রামে সেনা কর্মকর্তারা বাস করতো, যেখানে তাদের পরিবার বাস করতো, সেখানে রাসায়নিক গ্যাস হামলা চালানো হয়েছিল। সিরিয়ানরা তখন অভিযোগ করেছিল, তৎকালীন আল কায়দা সহযোগী জাবাত আল-নুসরা ও আইএসকে ওই গ্যাস দিয়েছিল তুরস্ক। রাশিয়ানরা বলেছে, দামেস্কে আগে যেই রাসায়নিক হামলা হয়েছে সেখানে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদায় লিবিয়া থেকে তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় ঢুকেছে।
প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে মূলত রাসায়নিক গ্যাসের প্রথম ব্যবহার দেখা যায়। ওয়াইপ্রাসে এই গ্যাস প্রথম ব্যবহৃত হয়। পরে গাজায় জেনারেল অ্যালেনবির বাহিনী ওসমানীয় তুর্কি বাহিনীর ওপর এই গ্যাস হামলাচ চালান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাসায়নিক অস্ত্র হয়ে উঠে ভয়াল বিভীষিকার সমার্থক।  একে এতটাই ভয়াবহ ভাবা হতো যে, খোদ হিটলারেরও তার প্রতিপক্ষ মিত্রবাহিনীর ওপর এটি ব্যবহারের সাহস হয়নি। কিন্তু সাদ্দাম কী করেছিলেন? তিনি হালাবজায় কুর্দিদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলেন। কিন্তু সিরিয়ান বাহিনীও কি নিজ জনগণের ওপর এই অস্ত্র প্রয়োগ করবে?
পরিস্থিতি দৃশ্যত মীমাংসিত। ভয়াবহ। ভয়ানক। কিন্তু আমাদের এও মনে করতে হবে পূর্বাঞ্চলীয় আলেপ্পোর ওই আড়াই লাখ বেসামরিক মানুষের কথা। তারা দেড় লাখে নেমে আসেন। এরপর ৯০ হাজারে। বিশ্বের বুকে যত সংঘাত চলছে তার মধ্যে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ নিয়ে সবচেয়ে সংবাদ জানা গেছে। এর দরুন কতজনের মৃত্যু হয়েছে? ৪ লাখ? সাড়ে ৪ লাখ? নাকি ৫ লাখ? গ্যাস হামলায় মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা আমরা কীভাবে পূরণ করি? সিরিয়ার সরকারকে বিশ্বাস করে?
দামেস্কে যখন রাসায়নিক হামলা হয়েছিল, জাতিসংঘ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে এক সংক্ষিপ্ত অংশে বলা হয়, বিভিন্ন স্থানে সরানোর সময় রাসায়নিক গোলা অন্যদের হাতে পড়েছিল।
এরপর আমরা আসি রাশিয়ানদের কাছে। সিরিয়ার সরকারের কাছে থাকা সমস্ত রাসায়নিক অস্ত্র সরানোর চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল রাশিয়া। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্রের ওপর বিমান হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন রাশিয়ানরাই এগিয়ে এসেছিল। পরে ওবামা ওই হুমকি প্রত্যাহার করেন।
এখন রাশিয়ানরা দেখেছে ট্রাম্পের যদি মনে হয় গ্যাস হামলা হয়েছে তাহলে তিনি কী করবেন। আর আমাকে বলা হয়েছে, রাশিয়ানরা অনেক আগ থেকেই সিরিয়ার বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন হামলা সম্পর্কে জানতো। তারা কি সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে কোন বিমান সত্যিই রেখে দিত? তারা কি রানওয়েতে এমন কোন অস্ত্র রেখে দিত? বা মাটির নিচের ব্যাংকারে?
বাস্তবতা হলো, সিরিয়ায় আমেরিকার হামলা থেকে আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে যতটা বোঝা যায়, তার চেয়ে বেশি বোঝা যায় ট্রাম্প-পুতিন সম্পর্ক। (মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসনের জন্য এটি একটি সমস্যা। আর বাশার আল-আসাদের জন্যও। নিশ্চিত থাকুন, রাতে দামেস্ক ও মস্কোর মধ্যকার ফোনকলগুলো অনেক দীর্ঘ হবে।
(রবার্ট ফিস্ক মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সবচেয়ে খ্যাতনামা বৃটিশ সাংবাদিক। তার এই নিবন্ধটি বৃটিশ পত্রিকা দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে অনূদিত।)
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন