পোশাকশিল্প শ্রমিকদের সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি

মত-মতান্তর

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল | ২৬ মার্চ ২০১৭, রবিবার
আশির দশকের গোড়ার দিক থেকে শুরু করে গুটি গুটি পায়ে এগুতে এগুতে আজ বিশ্বমাঝে একটি শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প। জাতি হিসেবে এটা আমাদের একটি বড় অর্জন নিঃসন্দেহে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় চল্লিশ লাখ শ্রমিক ও তাদের পরিবার। এর সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ শ্রমিকের অবদানকে কেউ অস্বীকার করবেন বলে আমি মনে করিনা। আর তাই তাদের ভাল থাকা না থাকার উপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের এই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ।
মানুষ যখন ভূমিষ্ঠ হয় সে তখনই দুনিয়া সম্পর্কে সবকিছু জানবে এটা ভাবা অবান্তর। কিন্তু সে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে সে অভিজ্ঞতা অর্জন করে তার সাথে সাথে তার চাহিদাও বাড়ে এটাই স্বাভাবিক। আমরা যদি পাকস্থলির কথা ধরি- একটি ছোট শিশুর ক্ষুধা নিবারণে যে পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন একজন প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে তা যে ঢের বেশী হবে এটাই স্বাভাবিক।
তো উন্নয়নশীল দেশে দ্রব্যমুল্যের ঊর্ধ্বগতির সাথে সাথে অন্যান্য আনুসাঙ্গিক চাহিদা পূরণে প্রত্যেক মানুষের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা অতীব জরুরী একটা বিষয়। সে দিকটি বিবেচনা করলে প্রত্যেকের বেতনবৃদ্ধির যাচনা থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেসব বিষয়ে আলোকপাত করার জন্য অনেক গুণী ও বুদ্ধিমান লেখকেরা রয়েছেন। আমাদের জীবনযাত্রা ও শ্রমিকদের জীবন যাত্রার তুলনা করলে অন্তর থেকে একটি বেদনাসূচক অভিব্যক্তি আসতেই পারে!
ধরুন গাজীপুরে আপনি ১৫০০ স্কয়ার ফিট একটি ফ্লাট ভাড়া নিয়ে থাকেন যার মাসিক ভাড়া  ১৫০০০ টাকার বেশী নয়, যেখানে আপনি ২/৩ রুম, রান্নাঘর, ২/৩ টি টয়লেটসহ আরও বেশকিছু সুবিধা পাচ্ছেন। অপরদিকে একজন শ্রমিক ৩০০০ টাকা দিয়ে ২০০ স্কয়ার ফিটের একটি রুমে থাকছে, পাচ্ছেনা আলাদা টয়লেট, আলাদা রান্নাঘর এ সবই অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করতে হয়। এখন ধরুন আপনি ১০ টাকা স্কয়ার ফিট হারে অর্থ দিয়ে যে সুবিধা পাচ্ছেন একজন শ্রমিক কিন্তু ১৫ টাকা দিয়েও সেই সুবিধা পাচ্ছেননা। সেই ঘর থেকে কিন্তু প্রথম পাওয়া না পাওয়ার হিসেবটা আসছে!

এখন আসি মুল কথায়, আমাদের মধ্যে একটা বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যা হল শ্রমিকরা শুধু বেতনের জন্য কাজ করে। কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয় বেতন হল তার পরিশ্রমের ফসল , তার ন্যায্য অধিকার তাই সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু সবসময়ই তারা শুধু টাকার কথা চিন্তা করে এই ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আসুন একটু ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা করি। যদি আমি নিজের কাছে কিংবা আপনার কাছে জিজ্ঞাসা করি যে, আমাদের চাহিদাগুলো কি? তবে নিশ্চয় উত্তর আসবে নিয়মিত বেতনবৃদ্ধি, সম্মান, পরিবারের ভবিষ্যৎ, চাকুরীর স্থায়িত্ব, সুস্বাস্থ্য ইত্যাদি, তাই নয়কি? তাহলে আপনার আমার চাহিদা যদি এই হয় তবে মানুষ হিসেবে একজন শ্রমিকের চাহিদাও তাই হবে এটাই স্বাভাবিক। সবকিছুতে যদি আমরা নিজেদের ভাবনা কিংবা চাহিদাগুলো দিয়ে তুলনা করি তবে এসবকিছু আমাদের কাছে পানির মত পরিষ্কার হয়ে যাবে। আচ্ছা আমি-আপনি কি শুধু টাকার জন্য চাকুরী করি? সম্মানের প্রয়োজন আছে কিনা? যদি হ্যা হয় তবে মানুষ হিসেবে শ্রমিকদের চাহিদাও একই হবে, তারাও সম্মান নিয়েই কাজ করতে চায়। আমাদের মত তাদের কাছেও টাকা সবসময় মুখ্য বিষয় নয়। যদি টাকাই মুল বিষয় হত তবে অদ্যাবধি যে সব ফ্যাক্টরী শ্রমিকদের অন্যান্য ফ্যাক্টরীর চেয়ে বেশী সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন, অনেক ধরনের ইনসেন্টিভ চালু করেছেন,যেখানে শ্রমিকরা আশেপাশের অন্যান্য শ্রমিকদের চেয়ে বেশী অর্থ আয় করছে , সে ফ্যাক্টরীতে শ্রমিক অসন্তোষ থাকবে কেন? বলতে পারেন বাইরে থেকে কারোও ইন্ধন, সকল ক্ষেত্রে এটা সত্য নয় বা সত্য ভাবাও ঠিক নয়। যদি তাই ধরে নিই সেক্ষেত্রে ধরুন পরিবারে আপনাদের ভাইয়ে ভাইয়ে মিল নেই সেক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষ কেউ আসতেই পারে। তাকে আটকাতে পারবেন না। আপনি না আনুন আপনার ভাই ডেকে নিয়ে আসবে। এটাই বর্তমান প্রেক্ষাপট যেখানে মধ্যস্ততাকারী থাকবেই। এখন আপনি যদি তৃতীয় কাউকে অপছন্দ করেন সেক্ষেত্রে নিজের ঘরকে আগে সামলাতে হবে, ঠিক নয় কি?
এখন ঘরের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করুন। আমরা সমস্যাগুলোকে সবসময় উপর থেকে দেখি যা উপসর্গ মাত্র এর গভীরে যে অসন্তুষ্টি লুকিয়ে আছে তা কোথা থেকে আসলো আমরা কি কখনো চিন্তা করেছি? সমস্যার মুল কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখবেন এর পিছনে শ্রমিকদের চাহিদা লুকিয়ে আছে। এখন আবার আসছি চাহিদা কি শুধু অর্থের! এর আগে আমাদের নিজেদের চাহিদাগুলো নিয়ে লিখেছি আমাদের মত শ্রমিকদের চাহিদাগুলোও তাই। আর সেই চাহিদার জিনিস অথবা বিশয়গুলি পাওয়া না পাওয়া থেকে আসছে দুঃশিন্তা আর দুশ্চিন্তা থেকে আসছে অসন্তুষ্টি। শ্রমিকদের চারিপাশ ও কর্মকাণ্ড চিন্তা করলে দুশ্চিন্তাগুলো আসে টার্গেট, দক্ষতা, সম্মান, কর্ম পরিবেশ, বেতনবৃদ্ধি, পরিবারের সমস্যা, দুর্ঘটনা, কোন সজনের মৃত্যু, স্বাস্থ্যগত সমস্যা সহ আরও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেখানে দেখা যাচ্ছে অনেকগুলোর মাঝে বেতনবৃদ্ধি না হওয়া একটি সমস্যা মাত্র কিন্তু  এর বাইরেও আরও অনেক সমস্যা আছে। এখন এই দুশিন্তাগুলো আপনি কিভাবে খুঁজে বের করবেন? এক্ষেত্রে আপনার কারখানায় একটি শক্ত যোগাযোগ মাধ্যম থাকা জরুরী। এখন সেই যোগাযোগ মাধ্যম কিভাবে শক্ত হবে আর কারাই বা থাকবে? একটি যোগাযোগ মাধ্যম তখনই শক্ত হবে যখন আপনার কারখানায় সকলের সমন্বয়ে একটি সুন্দর কর্ম পরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে সকল মাধ্যমগুলো তাদের দায়িত্ব বুঝবে ও অন্যকে সম্মান দিতে জানবে। এ বিষয়ে না হয় অন্য কোন সময় লিখবো। এখন এই যোগাযোগ মাধ্যমে যারা আছে তাদের সাথে শ্রমিকের সম্পর্ক কেমন এটা জানাও বিশেষ জরুরী! যদি সম্পর্ক ভাল না থাকে তবে সেখানে ভাল কিছু আশাকরা অবান্তর নয়কি?
অনেকের মতপার্থক্য থাকতেই পারে কিন্তু আমি যা লিখছি তা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই লিখছি। ধরুন একটি ফ্যাক্টরীতে একজন সুপারভাইজার একজন শ্রমিকের সাথে খারাপ আচরণ করেছেন সেটি তার অসন্তুষ্টির কারণ, অপরদিকে কল্যান কর্মকর্তার সাথে একজন শ্রমিক কথা বলতে চাইলো তিনি গুরুত্ব দিলেন না এটা আরেকজনের অসন্তুষ্টি, এইচআর ম্যানেজারের কাছে একজন শ্রমিক ছুটি না পেয়ে অভিযোগ জানাতে আসলো তিনি আমলে নিলেন না, টার্গেট না হওয়ার জন্য সকালে প্রোডাকশন ম্যানেজার সাহেবের রুমে প্রতিদিন ৩/৪ জন শ্রমিক বকুনি খাচ্ছে তাদের অসন্তুষ্টি, এবার সেই ফ্যাক্টরীর ৫০ জন শ্রমিক একত্রিত হয়ে বলল তাদের দুপুরে বিনে পয়সায় খাবার দিতে হবে। খাবারের  অর্থ সেই ফ্যাক্টরী বেতনের সাথে দিচ্ছেন জেনেও তারা এই আবদার করে বসলো।সেক্ষেত্রে অন্যান্য যে শ্রমিকগুলো বিভিন্ন কারণে অসন্তুষ্ট তারাও এদের সাথে একত্রিত হবে কিনা? তা যে হবে এটাই স্বাভাবিক। পুঞ্জিভূত ক্ষোভ একদিন বড় ধরনের ঝড় বয়ে নিয়ে আসে তার উৎকৃষ্ট উদাহরন বহু রয়েছে। এখন এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি? উপায় হল নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা। শ্রমিকরা কখন বুঝবে আপনি আমি স্বচ্ছ? ঠিক তখনই যখন ফ্যাক্টরীতে একটি শক্ত অভিযোগ সংগ্রহের পদ্ধতি থাকবে যা প্রতিটি সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভুমিকা রাখে। তো এসবের পরও সবথেকে বড় বিষয় হল আপনি শ্রমিকের সন্তুষ্টির জরিপ করেন কিনা। আর যদি করে থাকেন তা কতটা কার্যকরী! মোট কথা আপনি শ্রমিকদের চাহিদা বোঝেন কিনা? চাহিদা না বুঝলে আপনার সন্তুষ্টি জরিপের মানদণ্ড কি হবে? কর্মক্ষেত্র,  পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে একজন শ্রমিক কি চাইছে সকলের জ্ঞাতার্থে তা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক;
শ্রমিকদের মুল তিনটি চাহিদা যা আমাদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়, সেগুলো হলঃ
১. নিয়মিত আয় যা বৃহৎ অর্থে ধরলে নিয়মিত কাজ, নিরাপদ জীবন এবং ন্যায় ও যুক্তিসংগত মজুরী
২. সম্মান ও স্বীকৃতি তথা মত প্রকাশের সুযোগ থাকা এবং তার মতামতের প্রতি অন্যের শ্রদ্ধা
৩. পরিবারের ভবিষ্যৎ যার সাথে সম্পর্কযুক্ত হল ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য সুযোগ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পদোন্নতি,
কর্ম-জীবন এবং ব্যক্তি-জীবনের ভারসাম্য।
ঠিক এই বিষয়গুলির কথা বিবেচনা করে যদি আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানে সন্তুষ্টি জরিপ পরিচালনা করি, তার পরিচালনাকারী যদি হয় নিরপেক্ষ এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য শুধু তখনই আমরা সত্যিকার অর্থে শ্রমিকদের চাহিদা, সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির বিষয়গুলি জানতে পারবো। অতঃপর পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবো।
বিঃ দ্রঃ দীর্ঘদিন ধরে  লেখার ইচ্ছে ছিল তাই আজ লিখলাম। সবাই পাশে থেকে পরবর্তীতে আরও কিছু বিষয় নিয়ে আসবো। আমরা একে অন্যের ভুল ক্ষমা করে সকলের মঙ্গল কামনা করি।

লেখক: মানবসম্পদ প্রশিক্ষক, ইমপ্যাক্ট লিমিটেড
 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

সমাপনীতে অনুপস্থিত ১৪৫৩৮৩ শিক্ষার্থী

ঈদ-ই মিলাদুন্নবি ২ ডিসেম্বর

দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য তারেক রহমানকে দরকার: এমাজউদ্দিন

দল থেকে বরখাস্ত মুগাবে

দেখা হলো, কথা হলো কাদের-ফখরুলের

আখতার হামিদ সিদ্দিকী আর নেই

ইইউ প্রতিনিধি ও তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন

‘এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই’

নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে না শেখ হাসিনার সরকার-নৌ মন্ত্রী

‘আমি ব্যবসায়িক প্রতিহিংসার শিকার’

সেনা মোতায়েন নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি : সিইসি

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

কেয়া চৌধুরী এমপি’র উপর হামলার ঘটনায় মামলা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিকাশমান মধ্যবিত্ত এবং কয়েকটি প্রশ্ন

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

খেলার মাঠে দেয়াল ধসে দর্শক যুবকের মৃত্যু