এ যেন সুখী এক পরিবার

এক্সক্লুসিভ

মান্না চৌধুরী, কলম্বো, শ্রীলঙ্কা থেকে | ২০ মার্চ ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৫৪
 বাংলাদেশ শিবিরে তুমুল উত্তেজনা। একটু পরপর টিভি ক্যামেরা খুঁজে ফিরছিলো সাকিব, সৌম্যদের উজ্জ্বল মুখ। হাসিখুশিতে ভরা হাথুরুসিংহের সুখী এক পরিবার। কতদিন হয় এই ছবি দেখে না বাংলাদেশ। রঙ্গনা হেরাথের বল সুইপ করে মিরাজ দুইবার প্রান্ত বদল করলেন মুশফিকের সঙ্গে। সৌম্য, রুবেলদের তখন আটকায় কে? উসাইন বোল্টের গতিতে ডাগ আউট থেকে ছুটে গেলেন পি সারার মাঝ উইকেটে। আবেগে, উত্তেজনায় একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরেন, মুশফিক-মিরাজকে ঘিরে চললো উৎসব। প্রেসবক্স থেকে বাংলাদেশের সাংবাদিকরাও ছুটলেন সেদিকেই। আসলে এ এমন এক পাগুলে দিন যেখানে পেশাদারিত্ব আর বাধার দেয়াল পেরিয়ে আবেগটাই চলে আসে আগে। ক্রিকেটার, সাংবাদিক, দর্শক শততম টেস্ট জয়ের উৎসবে সবাই তাই মিলেমিশে একাকার। মেহেদী হাসান মিরাজ দুই বল খেলে ২ রান নিয়েছেন। সংখ্যা বিচারে এই রান হয়তো তেমন কিছু নয়, কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় এই দুই রানই অমর হয়ে থাকবে। থাকবে সাকিবের সেঞ্চুরি আর ৬ উইকেট। মুশফিক, সৌম্য, মোসাদ্দেক, তামিমের লড়াকু ফিফটি আর মোস্তাফিজের দারুণ এক স্পেল। এসব মিলিয়েই তো ইতিহাস, শততম টেস্টে ৪ উইকেটের জয় বাংলাদেশের।
খেলার ফল তখনও অনেক দূরের পথ। কেবল জয়ের সুবাসটাই পাচ্ছে বাংলাদেশ। ফেসবুকে শুরু হয়ে গেল স্ট্যাটাস আর কমেন্টের ঝড়-পারবে তো বাংলাদেশ, জয় এখন ১৯১ রান দূরে, অপেক্ষার প্রহর গুনছি প্রিয় বাংলাদেশ আরো কত কি! আবেগের নদীতে তখন কত আশা, কত স্বপ্নের ঢেউ। পারলে যেন পুরো বাংলাদেশই এসে হাজির হয় দূরের শ্রীলঙ্কায়। তারপরও অদৃশ্য সুতোর টানে পি সারায় ১১ জনের সঙ্গে জড়িয়ে যেন ১৬ কোটি। যাদের নেশায়, মননে, মগজে এখন কেবলই ক্রিকেট। যে ক্রিকেট হাসানোর চেয়ে কাঁদিয়েছেই বেশি। তারপরও বাঙালির আবেগ, ভালোবাসার সবটুকু জুড়েই এখন সাকিব, মুশফিকরা। যারা স্বপ্ন দেখে আর দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষের দিল জিতে নিয়েছেন অনেক আগেই। কাল আরেকবার জিতলেন টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম জয় দিয়ে। যে জয়ে ১৭ বছরের অপেক্ষার অবসান বাংলাদেশের। আর সেটিও আসলো এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ শততম টেস্টের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। মুশফিকুর রহীম নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতেই পারেন। মধুর জয়টা তো এলো তার নেতৃত্বেই।
দিলরুয়ান পেরেরা আর লাকমল দুঃস্বপ্নের পর জয়ের জন্য ১৯১ রানের টার্গেট বাংলাদেশের সামনে। তামিম ইকবাল-সৌম্য সরকার প্রথম ইনিংসের মতোই শুরু করেছিলেন। তবে সেই শুরু রঙ্গনা হেরাথের মাত্র দুই বলের ধাক্কায় এলোমেলো। ইনিংসের অষ্টম ওভারে দলীয় ২২ রানে ছেলেমানুষি শটে সৌম্যর আউটের পরের বলেই ইমরুল কায়েস এসে ক্যাচ দেন স্লিপে। বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্ন তখন অনেকটাই শঙ্কায়। ফিরে আসলো গল আর ক্রাইস্টচার্চ বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের স্মৃতি। অনেক আশার সকালই যে এভাবে বদলে গেছে হতাশার বিকালে! তাহলে কি শততম টেস্টেও? তামিম ইকবাল শঙ্কা দূর করলেন সাব্বির রহমানকে সঙ্গে নিয়ে। তৃতীয় উইকেটে দুজনের ১০৯ রানের জুটি হতাশার কালো মেঘ দূর করে আশার আলো দেখায়। ১২৫ বলে ৮২ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে তামিম যখন আউট হন তখন জয় বাংলাদেশের হাতের মুঠোয়ই ছিল। তবে সাব্বির, সাকিব আর মোসাদ্দেকের তিন পাগলামি আউটে আরেকবার ধাক্কা বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্নে। শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক মুশফিক মিরাজকে নিয়ে এনে দিলেন স্বপ্নের জয়। সাব্বিরের ব্যাট থেকে আসে ৪১ রান। মুশফিক অপরাজিত থাকেন ২২ রানে।
কলম্বো টেস্ট কত রূপই না দেখিয়েছে এই পাঁচদিন। সময়ে সময়ে রঙ বদল হওয়া ম্যাচে সম্ভাবনা ছিল দু’দলেরই। তবে চতুর্থ দিন শেষে ড্রাইভিং সিটে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে ২৬৮ রানে শ্রীলঙ্কার ৮ উইকেট ফেলে দিয়ে জয়ের রাস্তা তৈরি করেন সাকিব, মোস্তাফিজরা। কিন্তু সেই রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে দেন শ্রীলঙ্কার লেজের দিকের দুই ব্যাটসম্যান। দিলরুয়ান পেরেরা আর সুরঙ্গ লাকমল যেন খুঁটি গেড়ে বসে যান উইকেটে। মোস্তাফিজের পেস, সাকিব-মিরাজের স্পিন সবকিছুর বিরুদ্বেই সাবলীল ছিল তাদের ব্যাট। দুজনেই ছিলেন আক্রমণাত্মক। বাংলাদেশের কাছের জয়টা যখন দূরে চলে যাচ্ছে তখনই ভাগ্যের ছোঁয়ায় দিলরুয়ান আউট। মিরাজের বল ডিফেন্স করেন দিলরুয়ান। কাভারে শুভাশিষ মিস ফিল্ডিং করলে লাকমলের সঙ্গে প্রান্ত বদলের চেষ্টা দিলরুয়ান পেরেরার। কিন্তু দিলরুয়ান উইকেটে পৌঁছার আগেই শুভাশিষের থ্রো ধরে বেল ফেলে দেন মিরাজ, শততম টেস্ট জয়ে ভাগ্যের কি দারুণ সহায়তা বাংলাদেশের। আগের দিন ১২৬ বল খেলে ১২ রানে অপরাজিত ছিলেন দিলরুয়ান, কাল আরো ৩৮ রান যোগ করেন মাত্র ৪৮ বল খেলে। টেস্টে তার চতুর্থ ফিফটি বাংলাদেশের জয়কে দূরের পথ বানিয়েছে। এরপর শেষ কাঁটা লাকমলকে আউট করেন সাকিব। আগের দিনের ২৬৮ রানের সঙ্গে আরো ৫১ যোগ করে শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংস ৩১৯ পর্যন্ত নিয়ে যান দিলরুয়ান-লাকমল জুটি। দ্বিতীয় ইনিংসে দুর্দান্ত এক ফিফটি করে কলম্বো টেস্টের সেরা তামিম ইকবাল। আর সিরিজ সেরা বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন