মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ধরপাকড় শিশু সহ আটক ৪ শতাধিক

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ১৮ মার্চ ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:৪৮
বিদ্রোহীদের সহযোগিতা করার অভিযোগে ১০ বছর বয়সী শিশুসহ শ’ শ’ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। দেশটির পুলিশের নথিপত্রের বরাতে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশে দেশটির কড়া নিরাপত্তা অভিযানের বিস্তারিত তথ্য জানা যাচ্ছিল না। কারণ, সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তাই এই নথিপত্র ওই অভিযান সম্পর্কে সামান্য হলেও বিস্তারিত ধারণা দিয়েছে।
এতে দেখা যায়, ৯ই অক্টোবর রাখাইনে বাংলাদেশ-সীমান্ত সংশ্লিষ্ট ৩টি পুলিশ চৌকিতে বিদ্রোহীদের হামলার পর থেকে ৪ শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করেছে কর্তৃপক্ষ। এদের মধ্যে রয়েছে ১৩ জন কিশোরও। রয়টার্স বলেছে, পুলিশের এই নথিতে তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ৭ই মার্চ। পুলিশ বলেছে, আটককৃত শিশুদের কয়েকজন বিদ্রোহীদের সঙ্গে কাজ করার কথা স্বীকার করেছে। তাদেরকে বয়স্ক সন্দেহভাজনদের থেকে আলাদা কক্ষে আটক রাখা হয়েছে।
সরকারের একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন সেনাবাহিনীর অভিযানে শিশুদের আটক করা হয়েছে। কিন্তু তিনি দাবি করেছেন, এ সময় দেশের আইনকানুন মেনেই তাদেরকে আটক করা হয়েছে। তবে তিনি বলেছেন, ৫ জন শিশু আটক থাকার কথা জানা আছে তার।
রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু মুসলিমদের হত্যা, গণধর্ষণ ও গণগ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন নির্যাতন নিয়ে চাপের মুখে আছেন মিয়ানমারের নেত্রী নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি। মাত্র এক বছর হলো তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। প্রায় ১১ লাখ মানুষ মৌলিক সেবা বঞ্চিত বন্দি জীবনযাপন করছেন। তবে রাখাইন অভিযানে আটক শ’ শ’ রোহিঙ্গার ব্যাপারে বা তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, তা নিয়ে এতদিন তেমন কিছুই বলেনি সরকার। রয়টার্সের দেখা নথিতে ৪২৩ জন আটককৃত রোহিঙ্গার তালিকা রয়েছে। এদেরকে উপনিবেশিক আমলের অবৈধ সহযোগিতা আইনের অধীনে আটক করা হয়েছে। এদের সকলেই পুরুষ। গড়ে তাদের বয়স ৩৪। তবে সবচেয়ে বয়স্ক বন্দির বয়স ৭৫। আর সবচেয়ে কমবয়সী বন্দির বয়স ১০। এদের একজনের নাম তালিকা থেকে কেটে দেয়া হয়েছে। পাশে লেখা হয়েছে মৃত।
সহিংসতার কেন্দ্রে থাকা জেলা মংদুর দুই পুলিশ কর্মকর্তা ১১ পৃষ্ঠার এই নথির সত্যতা স্বীকার করেছেন। পুলিশ ক্যাপ্টেন থান শোয়ে বলেন, ‘হামলাকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন যে কাউক আমাদের আটক করতে হয়। শিশু হোক আর না হোক। কিন্তু আদালত সিদ্ধান্ত নেবে তারা দোষী কিনা। আমরা পারবো না।’
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এমন শিশুদের বাড়তি সুরক্ষা দেয়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে মিয়ানমার। রয়টার্স জানতে পারেনি, আন্তর্জাতিক কনভেনশনের ওই বিধানসমূহ এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়েছে কিনা। পাশাপাশি এ শিশুদের আইনজীবী আছে কিনা, তা-ও জানা যায়নি। প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের এই অবৈধ সহযোগিতা আইন নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুদিন সমালোচনা করে আসছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অভিযোগ, বাছবিচারহীন গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে এ আইনটি ব্যবহার করা হয়েছে।
এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে দেয়া এক বিবৃতিতে মিয়ানমার বলেছে, এই সহিংসতা নিয়ে ৫২৬ ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এর মধ্যে ৮ বন্দি কারাগারে নিহত হয়েছে। রাখাইন রাজ্যের জ্যেষ্ঠ বিচারিক কর্মকর্তা এডভোকেট জেনারেল কয় হ্লা তুন বলেছেন, সরকার এদের বিচার দ্রুত করতে দুইটি ‘বিশেষ আদালত’ গঠন করেছে। তাদের আইনজীবী পেতে সরকার বাধা দেবে না। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার দূত ইয়াংহি লি রোহিঙ্গাদের আটক রাখা বিভিন্ন কারাগারে গিয়ে দেখেছেন বেশির ভাগ বন্দিরই কোনো আইনজীবী নেই। তারা পরিবারের সঙ্গেও দেখা করতে পারেনি। বন্দি হয়েছেন পরে ছাড়া পেয়েছেন এমন অনেকেই পরে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। দিদার (২২) নামে এমন এক রোহিঙ্গা বলেছেন, তিনি ১০ দিন একটি সামরিক শিবিরে বন্দি ছিলেন। নভেম্বরের মাঝামাঝি তার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। তার মতে ৩০০ জনের মতো আটক হয়েছেন। এদেরকে সবসময় হাতকড়া পরিয়ে রাখা হতো। জিজ্ঞাসাবাদের সময় পেটানো হতো। তিনি নিজে দু’জনকে মারা যেতে দেখেছেন। তবে তার বক্তব্যের সত্যতা নিরূপণ করতে পারেনি রয়টার্স। গত বছরের নভেম্বরে সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রায় ৭৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন