মেয়ে জন্মানোর ‘অপরাধে ’কেরোসিন ঢেলে খুন বধূকে

রকমারি

| ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৪৪
পণের দাবিতে প্রাণ দিতে হয়েছিল উলুবেড়িয়ার মিতা মণ্ডলকে৷ মেয়ে হওয়ার ‘অপরাধে ’ খুন হয়েছিলেন ধুবুলিয়ার পায়েল পাল৷ তার পর চার মাসও কাটেনি৷ ফের নৃশংস ভাবে বধূ হত্যার ঘটনা সামনে এল রাজ্যে৷ এ ক্ষেত্রে ছাড় পায়নি বধূর সাড়ে তিন বছরের শিশুকন্যাও ! শৌচাগারে বন্ধ করে গায়ে কেরোসিন ঢেলে দু’জনকেই আগুনে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ উঠল শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে৷ মৃত মনিরা বেগম (২৭ ) ও তাঁর মেয়ে কুলসুনা খাতুন মেমারি ১ ব্লকের আমাদপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজরা গ্রামের বাসিন্দা৷ বুধবার রাতে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় দু’জনের৷ রাতেই মেমারি থানায় মেয়ে -নাতনিকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে ডায়রি করেন মনিরার বাবা নুরুল্লা মিয়া৷ ঘটনার তদন্তে নেমে বৃহস্পতিবার সকালে মনিরার শ্বশুর শেখ সামাদ ও শাশুড়ি তহমিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷ দেহ দু’টি পাঠানো হয়েছে ময়নাতদন্তের জন্য৷ মনিরার স্বামী কুরবান শেখ কাজের সূত্রে হায়দরাবাদে থাকেন৷ পুলিশ জেনেছে , স্ত্রী -মেয়ে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি শুনে বুধবারই ট্রেনে চেপেছিলেন তিনি৷ তবে পথেই মনিরাদের মৃত্যু এবং বাবা -মায়ের গ্রেপ্তারির খবর পেয়ে গা ঢাকা দেন৷ পুলিশের কাছে কুরবানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছেন মনিরার বাবা৷ জানিয়েছেন , স্ত্রীর উপর অত্যাচার হত জেনেও মা -বাবার বিরুদ্ধে কোনও দিন রুখে দাঁড়াননি কুরবান৷ উল্টে মনিরা কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার পর থেকে মারধর শুরু করেন তিনিও৷ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দ্যুতিমান ভট্টাচার্য বলেন , ‘মৃতার শ্বশুর -শাশুড়িকে ইতিমধ্যেই গ্রেন্তার করেছি আমরা৷ পুলিশ এলাকায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চালাচ্ছে৷ ধৃতদের কাল , পড়শুর মধ্যেই আদালতে তোলা হবে৷ মৃতার স্বামী পলাতক , তাঁর খোঁজ চলছে৷ ’মেয়ে এবং একরত্তি নাতনিকে হারিয়ে এদিকে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে মনিরার বাপের লোকজন৷ বাবা নুরুল্লা বলছিলেন , ‘কাল সকাল দশটা নাগাদ মেয়ের শ্বশুর -শাশুড়ি আমায় ফোন করে বলল , নাতনিকে নিয়েই গায়ে তেল ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে মনিরা৷ মেমারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ওদের৷ খবর পেয়েই মেমারি ছুটে যাই আমি৷ গিয়ে শুনি , বর্ধমান মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মনিরাদের৷ সেখানে মনিরা নিজেই এতদিন ওর উপর যা যা অত্যাচার হয়েছে , সব বলে আমায়৷ জানতে পারি , ক’দিন আগেও আমার কাছ থেকে ১২ হাজার নিয়ে যাওয়ার জন্য মেয়ের উপর চাপ দিয়েছিল ওরা৷ মেয়ে আমার সাংসারিক অবস্থার কথা জানে৷ কোনও দিন তাই মুখ ফুটে দাবিদাওয়া করেনি৷ নির্বিচারে অত্যাচার সয়ে গিয়েছে৷ যদি এসবের এতটুকু আঁচ পেতাম , ঘটিবাটি বিক্রি করে হলেও মেয়েকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করতাম আমি৷ আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেনি৷ ওর শ্বশুর -শাশুড়িই গায়ে কেরোসিন ঢেলে বাথরুমে ঢুকিয়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল৷ মেয়ে -নাতনির চিত্কারে গ্রামের লোকজনই ওদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে৷ ’ অর্থাভাবে মেয়েকে তেমন সুখ -স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারেননি৷ বিয়ের পর মনিরা যাতে আরামে থাকে তার জন্যই ‘বড় ’ ঘরে মেয়ের সম্বন্ধ করেছিলেন পাণ্ডুয়া পঞ্চায়েতের মাগুড়া এলাকার প্রান্তিক চাষি নুরুল্লা মিয়া৷ বিয়ের পাঁচ বছরের মধ্যেই এমন পরিণতি হবে , তা হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি৷ মনিরা বেগমের উপর লাগাতার শারীরিক , মানসিক অত্যাচারের কথা জানিয়েছেন পাড়াপড়শিও৷ শেখ জামসেদ নামে এক প্রতিবেশীই এদিন বলেন , ‘বিয়ের পর থেকেই অত্যাচার চলত মেয়েটার উপর৷ শ্বশুর -শাশুড়ি রোজই প্রায় মারধর করত৷ মাঝেমধ্যে খেতেও দিত না ওকে৷ মনিরার স্বামী কুরবান গ্রামে এলে তাকে সে কথা সম্প্রতি জানাই আমরা৷ গ্রামের সবাই মিলে ওর শ্বশুর -শাশুড়িকেও সতর্ক করেছি বারবার৷ কোনও ফল হয়নি৷ কিন্ত্ত শেষপর্যন্ত মেয়েটাকে যে ওরা পুড়িয়ে মারবে , এমনটা কেউ ভাবিনি আমরা৷ ’ আর এক পড়শি সাবিনা বিবি বলেন , ‘মনিরার উপর অত্যাচার আরও বাড়ে ওর মেয়েটা হওয়ার পরেই৷ কুরবান বাড়ি ফিরলে মা -বেটা মিলে মারধর করত মনিরাকে৷ খালি বলত , আব্বুর ঘর থেকে টাকা নিয়ে আয়৷ মেয়ের জন্ম দিয়েছিস , বিয়ে দেবে কে ?’

সুত্রঃ এই সময়
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন