মাতৃভাষা রক্ষায় প্রয়োজন গবেষণা ও কার্যকরী উদ্যোগ

মত-মতান্তর

মনিরা আক্তার | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৬
ফেব্রুয়ারি  মাস আসলেই আমরা যেন একটু নড়েচড়ে উঠি। বাংলা ব্যবহারে একটু বেশি সচেতন হয়ে উঠি। সারা দেশ উৎসবমুখর হয়ে উঠে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দেখা যায় পাড়ায়, মহল্লায়, প্রত্যন্ত গ্রামে, পাহাড়ে শহীদ মিনার নির্মান করে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানায়। এ বোধ মা, মাটি ও ভাষার সম্মানে। বাংলার মানুষের এ বোধ কারো শিখিয়ে দেয়া না, এ তার অন্তরের টান।
এ টানের সাথে এখন যুক্ত হয়েছে, প্রাণের বই মেলা। বাংলাভাষার বাইরেও বাংলাদেশের অন্যান্য সব ভাষার মানুষ একবার হলেও বইমেলায় ঘুরে যান। ফেব্রুয়ারিকে বলা হয় ভাষার মাস। যদিও ভাষা কোন নির্দিষ্ট মাস বা দিনের নয়। জন্মের পর থেকেই পৃথিবীর সব প্রাণী মাতৃভাষার চর্চা করে আসছে কিন্তু ভাষা ব্যবহারে মানুষে আর অন্য প্রাণীতে বেশ পার্থক্য আছে। মানুষ নামে এক হলেও স্থান, কাল, পাত্র, দেশ, সংস্কৃতি ও ভৌগলিক কারণে ভাষার ভিন্নতা সব সময় আছে এবং থাকবে। মানুষের বিচরণ যেহেতু বিশ্বব্যাপি এবং মানুষ যেহেতু অনুকরণ প্রিয় তাই মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি মাঝে মাঝে হারিয়ে যাওয়ার হুমকির মুখে পড়ে। পৃথিবীর বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এই পরিবর্তন আগে ধীর গতিতে চললেও বর্তমানের প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে সাথে মানুষের চলাচল, যোগাযোগ, বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের কারণে ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার গতিও বেড়ে গেছে। ইউনেস্কোর এক সুত্র থেকে জানা যায়, পৃথিবী থেকে  প্রতি ১৪ দিনে একটি বিপন্ন ভাষা হারিয়ে যায়।   
মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে বাঙ্গালী ছাড়া এখন পর্যন্ত আর কোন জাতির সন্ধান পাওয়া যায়নি। ‘বাহান্নর’ ভাষা আন্দোলন শুধু বাঙ্গালীর  ভাষার জন্য আন্দোলন ছিলোনা এ ছিলো বাঙ্গালীর অস্তিত্বের আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের পটভুমি মূলত  রচিত হয় পঞ্চাশের দশকে বৃটিশ শাসনের শেষ পর্বে এবং মূলত সে সময়কার পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজে বাংলাকে আপন মাতৃভাষা হিসাবে বরণ করে নেওয়ার মনোভাব গড়ে ওঠে। ১৯২৬ সালে সৃষ্টি হয় প্রগতিশীল সংগঠন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর। এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন সে সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক  সৈয়দ অবুল হোসেন, এবং ঢাকা কলেজের ছাত্র আব্দুল কাদির ও অধ্যাপক কাজী আব্দুল ওদুদ ছিলেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সুধী মহলে এ প্রতিষ্ঠানের নেতৃবর্গ ‘শিখা গোষ্ঠি’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিরিশের দশকে এসে  ড. কাজী মোতাহার হোসেন এবং আবুল ফজল সহ অনেকেই এর সাথে যুক্ত হয়ে একে শক্তিশালী করে তোলেন। এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বেন্দ্র করে ভাষা আন্দোলনের বীজ বপন হতে থাকে। বাংলাকে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন দু‘টি পর্যায়ে সংঘটিত হয়। প্রথমটি ১৯৪৮ সালে এবং দ্বিতীয়টি ঘটে ১৯৫২ সালে এবং ৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে সংগঠিত হয় চুড়ান্ত পর্যায়ের আন্দলোন। ২১শে ফেব্রুয়ারি  ভাষা আন্দলোনের ইতিহাসের বিশেষ দিন। মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রাণ দেয় সালাম, রফিক, শফিক, বরকত সহ আরো অনেকে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি হয় শহীদ দিবস। অনেকের আত্মত্যাগের ফসল। ২১ শে ফেব্রুয়ারি  আজ তাই সারাবিশ্বে পালিত হচ্ছে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে।
বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বাইরেও আছে আরো প্রায় ৩২টি মাতৃভাষা  (নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি)। বাংলাদেশে ছোট ছোট আরো প্রায় ৩২ টি জাতি গোষ্ঠির বাস আছে যারা আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা অনেক নামেই পরিচিত। যে নামেই পরিচিত হউক না কেন? তারা সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের নাগরিক। বৃটিশদের শোষণ অত্যাচার এবং তৎকালিন পাকিস্তানের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁদের অনেকেই সোচ্চার হয়েছিলো। ৭১ এর মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশ মাতৃকার টানে, নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষায় পাকিস্তানের শোষণ নিপিড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে।
বাংলাদেশের বৃত্তর ময়মনসিং, টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ এলাকার গারো, হাজং, কোচ, খড়িয়া। উত্তর বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে সাওতাল,ওঁরাও, মালো, পাহান, বুনো, কড়াসহ আরো অনেক ছোট ছোট জাতি সত্তার বাস। সিলেট এলাকায় মনিপুরী, খাসিয়াদের সাথে সবাই পরিচিত। তিন পার্বত্য এলাকা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি এলাকায় রয়েছে চাকমা, মারমা, খুমি, খেয়াং, চাক, বোম, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, লুসাই, ¤্রাে বা মুরং সহ ১২টি জনজাতির বাস সমুদ্র উপকুলীয় এলাকায় রয়েছে রাখাইদের বাস এ সব জাতির প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজ নিজ মাতৃভাষা। আমাদের এই ছোট্ট দেশে ভাষা ও সংস্কৃতিতে আমরা অনেক সমৃদ্ধ। কিন্তু বর্তমানের বিশ্বায়নের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের টিকিয়ে রাখতে গিয়ে এসব ভাষা ও সংস্কৃতি প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে আজ বিপন্ন হতে বসেছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহারের বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা। বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া অন্যান্য অনেক ভাষার মত বাংলাদেশেরও এ সব ভাষা দিন দিন হারিয়ে যাওয়ার হুমকির মুখে পড়েছে। ইউনেস্কো ইতিমধ্যে বিশ্বকে অনেকবার সতর্ক করে বলেছে, প্রতি ১৪ দিনে ১টি করে বিপন্ন ভাষার মৃত্যু ঘটছে। কোন ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ হাজারের নিচে নেমে গেলেই ঐ ভাষাটি বিপন্ন হয়ে পড়ে। সে দিক থেকে বাংলাদেশের অনেক ভাষাই আজ বিপন্নের পথে। কারণ মায়ের মুখের ভাষা যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করবে সেই নতুন প্রজন্ম অর্থাৎ শিশুদের মাতৃভাষায় কথা বলা এবং প্রথম পাঠ হিসাবে পড়া এবং লেখার সুনির্দিষ্ট উদ্দোগ না থাকা। তার পাশাপশি প্রত্যেক জাতির ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণার অভাব। যারা কিছু কিছু চর্চা করছেন তারা তা নিজের ভাষায় করছেন না।
বাংলাদেশের আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি যাতে হারিয়ে না যায় এবং বাংলা ভাষার মানুষের সাথে আমাদের অন্যান্য ভাষার মেলবন্ধন সৃষ্টি করার জন্য আমি নিজেই উদ্যোগী হয়ে ‘আমার দেশ আমার ভাষা’ নামে টিভি অনুষ্ঠান করতে গিয়ে প্রকট ভাবে ভাষা উদ্ধারের সমস্যায় পড়ি। কারণ প্রায় সব আদিবাসী জনজাতির মধ্যেই অন্য ভাষার ব্যবহার এত বেড়ে গেছে য়ে, তারা নিজের ভাষায় শব্দ খুঁজে পেতে প্রবীণদের শরনাপন্ন হতে হচ্ছে। এ প্রবীণ মানুষগুলো সময়ের সাথে হারিয়ে যাবে, আর তার সাথে সাথে আমরাও অনেক ভাষা হারিয়ে ফেলবো।  তার মানে ভাষাগুলি বিলুপ্ত হতে আর বেশি দেরী নেই। এর জন্য আদিবাসী নেতৃস্থানীয় এবং যারা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা করেণ তারা তাদের দায় এড়াতে পারেন না। প্রায় প্রতিটি জনজাতির সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা হচ্ছে বাংলা ভাষায়। তাদের মধ্যে  যারা হাহাকার করেন ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে বলে, সে হাহাকার ও চিৎকার করেন বাংলা ভাষায়। তাও আবার কিছু নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ গন্ডির ভিতরে। টিকে থাকার জন্য যে চর্চার প্রয়োজন তার কোন উদ্দ্যোগ গ্রহণে তারা উদ্যোগী নন। এক সময় শোনা গিয়েছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগুলোকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য শিশুদের প্রথম পাঠ মাতৃভাষায় করা হবে। দু একটির জন্য সরকারী বা বেসরকারী ভাবে উদ্দ্যোগ গ্রহণ করতেও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু, বছর যায় মাস যায় সে উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনা। ফলে বাংলাদেশের আদিবাসী শিশুদেরও তাদের প্রথম পাঠ মাতৃভাষায় শিখতে বা পড়তে পারছে না। এর কারণে শিশুদের মধ্যে স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ অনেক কম। যদিওবা যায় মাঝপথে ঝরে প্রড়ার প্রবণতা দেখা যায় আশঙ্কাজনক হারে। অনেককেই বলতে শোনা যায় মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণের মত সব গোষ্ঠির নিজস্ব বর্ণমালা নেই আবার অনেকের ভাষার বর্ণমালা ঠিকমত ব্যবহার না করার ফলে হারিয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারীভাবে উদ্দ্যোগ গ্রহণ করে হারিয়ে যাওয়া বর্ণমালা উদ্ধার করা সম্ভব আর যাদের নেই তাদের জন্য গবেষক নিয়োগ করে বর্ণমালা তৈরী করে নির্দিষ্ট কারিকুলামে ভাষাগুলোকে ধরে রাখা সম্ভব এবং এ কাজটি হতে পারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনিষ্টিটিউট এর মাধ্যমে।  
বাংলাদেশের পাশাপাশি সারা বিশ্বে ২১শে ফেব্রুয়ারি  আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয় পৃথিবীর সব মাতৃভাষার সম্মানার্থে এবং ভাষা হারিয়ে যাওয়া রোধ করতে। কিন্তু আমার দেশেরই বৈচিত্রপূর্ণ মধুর মাতৃভাষাগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে অসচেতনতা ও অবহেলায়।  শুধু প্রচার প্রপাগান্ডা জন্য নয়, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও আন্তরিকতা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারীভাবে সে দিকে আমাদের এখনই নজর দেয়া জরুরী। তা না হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে দুরদর্শীতা ও গতিশীলতা নিয়ে জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের জন্য সংগ্রাম করেছেন তা নিজের দেশ থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও তথ্যচিত্র নির্মাতা

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

হলিউডে যৌন নির্যাতন ও একটি হ্যাসট্যাগ

আমাজন স্টুডিওর প্রধান কর্মকর্তার পদত্যাগ

চট্টগ্রামে মহাসড়কের পাশে নারীর লাশ

চট্টগ্রামে হোটেলে জুয়ার আসর, ব্যবস্থাপকসহ আটক ৬২

‘আওয়ামী লীগ ইসিকে স্বাধীনতা প্রদান করেছে’

বাংলাদেশেও সেখানকার মতো বিচার ব্যবস্থা দেখতে চান

ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে আহত দুই পুলিশ

‘দর্শকরা একজন শিল্পীর কাছে সব সময় ব্যতিক্রমী কিছু দেখতে চায়’

অস্ট্রেলিয়া গেলেন প্রধান বিচারপতির স্ত্রী সুষমা সিনহা

বিতর্কে নয়া রসদ

মৌলভীবাজারে শোকের মাতম

বিয়ানীবাজারের খালেদের দুঃসহ ইউরোপ যাত্রা

১১ দফা প্রস্তাব নিয়ে ইসিতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ

‘প্রধান বিচারপতি ফিরে এসেই কাজে যোগ দিতে পারবেন’

খালেদা জিয়া ফিরছেন আজ

ব্লু হোয়েলের ফাঁদে আরো এক কিশোর