ছাত্রজীবন: প্রাইমারি পর্ব

মত-মতান্তর

ফোরকান ওয়াহিদ | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, রবিবার
আমরা যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম তখন আমাদের সরকারি স্কুলটি ছিল বাঁশের বেড়ার তৈরি। প্রথম শ্রেণিতে বসার বেঞ্চ চেয়ার ছিল না বলে মাটিতে বসেই পড়তে হতো। প্রথম শ্রেণিতে থাকতে একটাই স্বপ্ন ছিল কবে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠব আর বেঞ্চে বসতে পারবো। উপরের শ্রেণির ভাইয়া-আপুরা যখন বেঞ্চ এ বসে সামনের টেবিলে খাতা রেখে লিখতো প্রচণ্ড ঈর্ষা হতো।
তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণিতে উঠার পর স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি অবৈতনিক দপ্তরির দায়িত্বটাও আমাকেই পালন করতে হতো। শিক্ষকদের ছোটখাট ফুটফরমাশ শোনা থেকে শুরু করে স্কুলের ঘণ্টা বাজানো, নানা কাজ। পরম আনন্দ নিয়েই করতাম কাজগুলো।
স্কুলে নিরানন্দের কাজ ছিল একটাই পড়াশোনা। তবে ওটা নিয়ে ছাত্র-শিক্ষক কারও খুব বেশি মাথাব্যথা ছিল বলে মনে হয় না।
আমাদের সময়ে শিক্ষকদের প্রিয় কাজ ছিল দুটো, ক্লাসে ঘুম এবং ছাত্র পেটানো। শিক্ষকরা মার দিয়ে এবং ছাত্ররা মার খেয়ে বিমল আনন্দ পেতেন। এ খনকার সময়ের মতো শিশু অধিকার, শিশুর মনসিক বিকাশ নিয়ে কারও কোন মাথাব্যথা ছিল না তখন। শিক্ষকদের আমরা একই সঙ্গে ভয় পেতাম আবার শ্রদ্ধাও করতাম। অন্যদিকে শিক্ষকরাও আমাদের একই সাথে ঘৃণা এবং স্নেহ করতো।
আমাদের সময়ের শিক্ষকদের একটা আশ্চর্য গুণ ছিল। ৩০০-৪০০ শিক্ষার্থীর জন্য ৩-৪ জন শিক্ষক তবুও প্রায় প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীকেই শিক্ষকরা ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। আর ক্লাসে একটু ভালো ছাত্র কিম্বা অতিমাত্রায় দুষ্টু ছাত্র হলেতো কথাই নেই। খুব কম বেতনের চাকরি করা শিক্ষকদেরও দেখেছি হাট-বাজারে দেখা হলে ছাত্রকে একটা জিলাপি কিংবা কলা কিনে খাওয়াতে। একজন শিক্ষকের কথা মনে আছে, খুব ভালো পড়াতেন এটা বলা যাবে না কিন্তু ছাত্রদের উৎসাহ দেয়ার প্রচণ্ড ক্ষমতা ছিল উনার। ক্লাসে প্রায়ই একটা অংক করতে দিয়ে ঘোষণা দিতেন যে অংকটা সবার আগে করতে পারবে তাকে হয় কলা না হয় চকলেট খাওয়াবেন। এ রকম ঘোষণায় সবার আগে অংক করে গৌরবমিশ্রিত লজ্জাবনত মুখে অন্য ছাত্রদের সামনে কলা কিম্বা চকলেট খাওয়ার সৌভাগ্য দুয়েকবার আমারও হয়েছিল।
স্কুল ত্যাগের বহু বছর পরও যখনি শিক্ষকদের সাথে দেখা হয়েছে খোঁজ-খবর নিতেন। পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আপনি যতবড় ব্যবসা কিংবা চাকরিই করেন না কেন সম্বোধন কিন্তু সেই আপাত্যস্নেহ মিশ্রিত ‘তু?ই’। শিক্ষকদের ভালোবাসা কিংবা ছাত্রকে ইচ্ছামতো বেত মারার স্বাধীনতা দেখে ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে শিক্ষক হবো। মনের ইচ্ছা পূরণে কিছুদিন শখের শিক্ষকতা করেছি। ছাত্রজীবনে শিক্ষকদের কাছে যে স্নেহ মমতা পেয়েছি তার কিছুটা শোধ করতে না করতেই বর্তমান চাকরি। সবার কপালে সুখ সয় না!
আমাদের সময়ে স্কুলে পরীক্ষার সময় ৫-১০ টাকা ফি ছাড়া আর কোনো টাকা খরচ হয়েছে বলে জানা নেই। এখনকার মতো ভর্তি ফি, সেশন ফি, উন্নয়ন ফি, খেলাধূলা ফি, বিবিধ ফি আমাদের সময়ে চিন্তা করা যায়নি।
এখন আমার ছেলে প্রাইমারি লেভেল শেষ করেছে। পাকা দালান, পরিপাটি করে সাজানো চেয়ার টেবিল, মাথার উপর ফ্যান... লোভনীয় ক্লাস রুম। অল্পক’জন ছাত্রের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক শিক্ষিকা। স্কুলে যাওয়ার জন্য স্কুলবাস। মোটা অংকের বেতন নেয়া স্কুলেতো ছাত্রদের পেটানোর প্রশ্নই উঠে না। ছাত্র-শিক্ষকদের সম্পর্ক কত নিবিড় হওয়ার কথা। সেদিন ছেলের সঙ্গে কথোপকথনে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম ছেলে তার প্রাইমারি স্কুলের দুইজন শিক্ষকেরও নাম বলতে পারে না। শিক্ষকরাও মনে রাখে না তাদের ছাত্রদের। কে পরীক্ষা দিলো কিংবা কে দিলো না তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র বেতন পরিশোধ করেছে কিনা? কোনো ছাত্র স্কুল ছেড়ে যাওয়ার আগে আমরা শিক্ষকদের পা ছুঁয়ে সালাম করতাম। শিক্ষকরাও পরম আদরে আমাদের বুকে টেনে নিতেন। ছাত্র-শিক্ষক উভয়েরই চোখ ছলছল করতো ভালোবাসার অশ্রুতে। এখন ছাত্র স্কুল থেকে বিদায় নেবে শুনলে শিক্ষক প্রথমেই দেখেন লেজার বুক। কোন ছাত্রের কত পাওনা বাকি আছে। করপোরেট জগতে ছাত্রকে বুকে টেনে নেয়া কিংবা স্কুল থেকে ছাত্রের বিদায়ে অশ্রু বির্সজন করার সময় কোথায়।
কর্পোরেট স্কুলের কর্পোরেট ছাত্র-শিক্ষক। এরপর কর্পোরেট আমলা। আমরা ক্রমশই একটা কর্পোরেট জাতি হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

শফি কামাল

২০১৭-০৭-২৯ ১৯:০০:৩৬

প্রাইমারি স্কুলের কথা আমারও সব মনে আছে।কিছুই ভুলিনি।সেই মেঝেতে বসে ক্লাস করা আর বেতের বাড়ি সব মনে আছে।লেখাটা আমাদের সবারই সেই জীবনের কথা মনে করে দিল। ধন্যবাদ।

আপনার মতামত দিন

সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ

বিশ্ব সুন্দরীর মুকুট মানসী চিল্লার-এর

তবুও কুমিল্লার কাছে হারলো রংপুর

খেলার মাঠে দেয়াল ধসে দর্শক যুবকের মৃত্যু

‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মৃত্যু ঘটেছে’

কুমারিত্বের দাম ৩ মিলিয়ন ডলার!

ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক আকরাম ৮ দিনের রিমান্ডে

১৫৪ টার্গেট গেইল-ম্যাককালামের

বাড়ি ফিরেছেন নিখোঁজ ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায়

শিক্ষার্থীদের মাথা ন্যাড়ার শর্তে এসএসসি’র ফরম পূরণ!

ইতিহাস বিকৃতিকারীদের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে জাগ্রত হতে হবে

একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ

‘সমাবেশে জোর করে লোক আনা হয়েছে’

সিরিয়া ইস্যুতে আবারো রাশিয়ার ভেটো

ইরাক ও ইসরায়েল সুন্দরী একসঙ্গে সেলফি তুলে বিপাকে

‘বিএনপিকে দূরে রেখে নির্বাচনের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে’