(পর্ব- ৩)

রাখাইনে কী ঘটেছিল

মত-মতান্তর

মানবজমিন ডেস্ক | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৬:২৭
গত অক্টোবরে মিয়ানমারের রাখাইনের এক সীমান্ত ফাঁড়িতে হামলার ঘটনায় ৯ পুলিশ নিহত হওয়ার পর সেখানে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্সের শুরু। তবে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা বা জেনোসাইড চলেছে কিনা তা নিয়ে মত-দ্বিমত রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অফিস অব দ্যা ইউএন হাইকমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস (ওএইচসিআর) গত ৩রা ফেব্রুয়ারি ৪৩ পৃষ্ঠার একটি ফ্ল্যাশ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে ফুটে উঠেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত মৃত্যু ভয়াল বিভীষিকা। এই রিপোর্টের নির্বাচিত অংশের অবিকল তরজমার তৃতীয় কিস্তি ছাপা হলো আজ।

৬.৫ পিটিয়ে হত্যা
নিরাপত্তাবাহিনী এবং রাখাইন গ্রামবাসীরা রোহিঙ্গাদের পিটিয়ে হত্যারও অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে। নারী, পুরুষ ও শিশুরা অনেকক্ষেত্রে লাঠি, বন্দুকের বাঁট, রড, কিংবা কিছুক্ষেত্রে বুটের আঘাতে নিহত হয়েছে।
তাদের কাউকে মাথার পেছনে, বুকে ও মুখে আঘাত করা হয়েছে। যার ফলে প্রচুর রক্তক্ষরণ ও অন্যান্য গুরুতর আঘাতে তাদের মৃত্যু ঘটেছে। কতিপয় ভিকটিম উল্লেখ করেছেন যে, সেনাবাহিনী বা রাখাইনরা তাদেরকে বেদম প্রহার করেছে। তারপর তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করতে রাস্তার পাশে ফেলে রেখেছে।
ওএইচসিআরকে লং দন এলাকার জনৈক বাসিন্দা জানিয়েছেন, ‘আমিসহ আরো প্রায় ৮৫ জন গ্রামবাসীকে মিলিটারি ঘিরে ফেলে। তারা আমাদের হাত পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলে। আমাদেরকে একটি খোলা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাদের প্রত্যেকের শরীর বাঁকিয়ে মাটির দিকে মুখ করে অবস্থান নিতে বাধ্য করা হয়। তখন তারা রাইফেলের বাঁট, কাঠের লাঠি দিয়ে আঘাত হানে, সেই সঙ্গে কিল, ঘুষি ও লাথি তো ছিলই। যা প্রত্যেকের শরীরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। আমাদের চোখের সামনেই সেনাবাহিনীর পাঁচজন অফিসারের নির্যাতনের ফলে এক বৃদ্ধ গ্রামবাসীর মৃত্যু ঘটে।
৬.৬ শিশু হত্যা
ওএইচসিআর টিম কিছুসংখ্যক জবানবন্দি সংগ্রহ করেছে; যেখানে বিভিন্ন বয়সী শিশু যাদের মধ্যে নবজাতক থেকে কিশোররাও রয়েছে, নিরাপত্তাবাহিনী তাদেরকে হত্যা করেছে। শিশুরা তাদের বাড়িতে বুলেট, কিংবা ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময়, কিংবা মাঠে-ঘাটে তারা নিহত হয়েছে।
কিছুক্ষেত্রের বিবরণ হৃদয়বিদারক। কারণ মায়েরা তাদের শিশুদের ছুরিকাঘাতে হত্যা করার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন।
ইয়ে খাট গ চং সান এলাকার ২৫ বছর বয়সী একজন নারী বলেছেন, তারা আমার স্বামীকে প্রথমে প্রহার ও পরে ছুরি দিয়ে হত্যা করে। এরপর তারা আমাদের ঘরে প্রবেশ করে। তাদের ৫ জন আমার কাপড় খুলে নেয়। এবং আমাকে ধর্ষণ করে। আমার ৮ মাস বয়সী ছেলে আমার বুকের দুধের জন্য তাদের উপস্থিতিতেই কান্নাজুড়ে দিয়েছিল। সুতরাং তার কান্না থামাতে একটি ছুরি দিয়ে তাকে জবাই করে। আমি ভেবেছিলাম, আমি মারা যাবো। কিন্তু আমি বেঁচে গিয়েছি।’
পিন্ট পু চং এলাকার ৪ সন্তানের এক জননী বলেন, ‘আমি আমার ৪ সন্তানকে নিয়ে পালিয়েছিলাম। আমি সব থেকে ছোট দুটিকে কাঁধে নিয়ে চলছিলাম। সবার বড় ১০ বছরের ছেলে এবং তার ছোট ৬ বছর বয়সী আমার মেয়ে ছিল আমার পেছনে। সশস্ত্র ব্যক্তিরা যখন আমাদের ধাওয়া করছিল, তখন একটা ঝোপঝাড়ের আড়ালে নিজেকে লুকিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমার বড় দুই সন্তানকে ধরে ফেলে এবং হত্যা করে। তারা তাদের হত্যা করতে এমন একটা ছুরি ব্যবহার করেছে, আমরা যা ছাগল কাটার কাজে ব্যবহার করি। আমি যেখানে লুকিয়ে ছিলাম, সেখান থেকে আমি এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করি।’
কিয়েট পাইন এলাকার তিন সন্তানের জননী বলেন, ‘তারা আমাকে শক্তভাবে বেঁধে ফেলে এবং তাদের একজন আমাকে ধর্ষণ করে। এসময় আমার ৫ বছর বয়সী মেয়ে আমাকে রক্ষা করার চেষ্ট করেছিল। সে ভয়ে চিৎকার করছিল, তখনই দেখলাম তাদের একজন একটা লম্বা ছুরি বের করলো। এবং তাকে গলা কেটে হত্যা করলো।’
অন্য একটি ঘটনায় গার চার কু এলাকার ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী প্রত্যক্ষ করেছেন কিভাবে এক নবজাতককে হত্যা করা হয়েছে। ওই তরুণীর বর্ণনায়, ‘কিয়েট ইয়ে পাইন এলাকায় আমি দেখেছিলাম মিলিটারি কিভাবে আমার এক নিকটাত্মীয়ের নবজাতককে হত্যা করেছে। যেদিনটায় মিলিটারি গ্রামে ঢুকেছিল, তখনই সেটা ছিল তার গর্ভপাতের সন্ধিক্ষণ। আমরা সবাই বাড়ির ভেতরেই ছিলাম। কিন্তু মিলিটারি আমাদেরকে বাইরে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করলো। আমার আত্মীয়টির তখন প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি বেরিয়ে আসতে পারেননি। মিলিটারি তাকে টেনেহিঁচড়ে ঘরের বাইরে বের করে আনলো। এবং তারা একটি মোটা লাঠি দিয়ে তার পেটে আঘাত করলো। এরপর গর্ভস্থ শিশুটিকে তারা তাদের হেভি বুট দিয়ে পিষে হত্যা করলো। পরে তারা পুরো ঘরটাতেই আগুন জ্বালিয়ে দেয়।’ কথিতমতে, বেশকিছু সংখ্যক শিশু নিহত হয়েছে, যখন সেনাবাহিনী তাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এমনকি কিছুক্ষেত্রে যখন শিশুরা বাড়ির বাইরে যেতে চেয়েছে তখন নিরাপত্তাবাহিনী তাদের বাধা দিয়েছে। শিশুরা কিছুক্ষেত্রে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে বহমান নদীতে ডুবে মারা গেছে। এটা ঘটেছে যখন উত্তর রাখাইনে যারা হামলা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটাই রিপোর্ট করা হয়েছে যে, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ভাসমান নৌকা লক্ষ্য করে গুলি করেছে। আর তখন তারা পানিতে ডুবে মারা গেছে।
ইয়ে টুইন কুন এলাকার একজন ৪৬ বছর বয়সী বাসিন্দা বলেছেন, ‘এক রাতে আমি, আমার পরিবারের সদস্যবর্গ এবং অন্য রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে দুটি মাছ ধরার নৌকায় চেপে বসি। আমরা তখন ছিলাম নদীর মাঝখানে। আর তখনই মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী আমাদের নৌকা দুটিকে উদ্দেশ্য করে গুলি চালায়। নৌকা ডুবে যায়। এবং আমরা সবাই নদীতে নিমজ্জিত হই। দুই থেকে চার বছর বয়সী আমার তিন চাচাত ভাই নদীতে ডুবে মারা যায়। অপর নৌকাটিতে কয়েকটি শিশু ছিল। তারাও ডুবে যায়। বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী এবং মাঝিরা আমাদের বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলো।’
৭. পদ্ধতিগত গুম (এনফোর্স ডিজএপিয়ারেন্টস)
২০১৬ সালের ৯ই অক্টোবর থেকে শত শত রোহিঙ্গা মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী কর্তৃক ‘ধৃত কিংবা পাকড়াওয়ের’ শিকার হন। ওএইচসিআর ২০৪ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে। এরমধ্যে ৯১ জন (৪৫%) জানিয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের বেশিরভাগেরই একাধিক আত্মীয়স্বজনকে নিরাপত্তাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। এবং এরপর থেকে তারা নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও অনেক সাক্ষাৎকারদাতা তাদের অনেক প্রতিবেশী এবং দুঃসম্পর্কীয় পারিবারিক সদস্যদের নাম ও তালিকা দিয়েছেন। যাদেরকে নিরাপত্তাবাহিনী তুলে নিয়ে গিয়েছিল এবং তারপর থেকে তাদের কোনো হদিস নেই। ১১৫ জন (৫৬%) সাক্ষাৎকারদাতা সবাই গুমের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন।
পুরুষদেরকে পুলিশ ও সেনাবাহিনী স্থানীয় স্কুল, মসজিদ, মাদরাসা, পুলিশ স্টেশন এবং ক্ষেত-খামার থেকে তুলে নেয়ার পর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অজ্ঞাত গন্তব্যে। অনেককে তাদের বাড়ি, খামার, রাস্তার ধার এবং গ্রাম থেকে তুলে নেয়া হয়েছে।
১৭ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ব্যক্তিদের বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছে। কারণ তাদেরকে শক্ত-সামর্থ্য বিবেচনা করা হয়েছে। ভাবা হয়েছে, তারাই সেনাবাহিনী ও  কর্তৃপক্ষের জন্য উল্লেখযোগ্য হুমকি হতে পারে। গ্রেপ্তারকালে পুরুষদেরকে সাধারণত তাদের হাত পিঠমোড়া করে অথবা মাথার পেছনে ঘুরিয়ে বাঁধা হয়েছে।
নারী ও উঠতি বয়সী মেয়েদের পাকড়াও করা হয়েছে। পুরুষদের থেকে তাদের আলাদা করা হয়েছে। এবং তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
পাকড়াও করা ব্যক্তিদের গাড়িতে (প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী বৃহৎ আয়তনের সামরিক ট্রাক থেকে ছোট ধরনের মিনিবাস ব্যবহার করা হয়েছে) তুলে অন্যত্র পাঠানোর আগে দেহ তল্লাশি করা হয়েছে। কারো কাছে কোনো অর্থ বা দামি সামগ্রী পেলে নিরাপত্তাবাহিনী সেটা কেড়ে নিয়েছে। যাদেরকে ধরা হয়েছে তাদের প্রতিটি গ্রুপের লোকসংখ্যা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের মধ্যে তারতম্য রয়েছে। কোথাও ১০-১৫ জনের ছোট গ্রুপ, আবার কোথাও ৭০-১৫০ জনের কোনো গ্রুপকে একসঙ্গে গাড়িতে পুরে চালান করা হয়েছে। অনেক সাক্ষাৎকারদাতা উল্লেখ করেছেন যে, তাদের ডজন ডজন পারিবারিক সদস্য ও প্রতিবেশী যাদের বেশিরভাগই পুরুষ, তাদেরকে ওইভাবে পাকড়াওয়ের পর থেকে তাদের আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
 ভিকটিমদের অন্যতম হলেন, ইয়ে টুইন কুন এলাকার একজন ব্যক্তি। যিনি সেনাবাহিনীর কবল থেকে পালাতে গিয়ে আহত হয়েছেন। তার ভাষায়, ‘তারা নারী-বালিকা এবং পুরুষদেরকে আমাদের গ্রামের একটি বড় খেলার মাঠে নিয়ে জড়ো করেছে। তারা সেই মাঠে প্রায় পুরো গ্রামের লোকজনদেরই হাজির করে। এরপর তাদের মধ্যে থেকে ১৭ জন গণ্যমান্য ব্যক্তি, যারা গ্রামবাসীদের শ্রদ্ধার পাত্র, তাদেরকে আলাদা করে এবং অজ্ঞাত গন্তব্যে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত ওই ১৭ জনের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তারা অবশ্য ৬ জন সুন্দরী তরুণী ও নারীকেও নিয়ে গিয়েছিল।’
 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ

উৎসবের আমেজে সারাদেশ

জনগণের দেয়া রায় মেনে নেবে বিএনপি: ফখরুল

কংগ্রেস সভাপতি পদে রাহুল গান্ধীর আনুষ্ঠানিক অভিষেক

দুই নারীর একজন স্বামী, অন্যজন স্ত্রী

আ’লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ১৫

নওগাঁয় যুবককে কুপিয়ে হত্যা

গার্মেন্টে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করছে এইচ অ্যান্ড এম

নাশকতার অভিযোগে ২০ শিবিরকর্মী আটক

বিএনপির বিজয় র‌্যালিতে যুবলীগ-ছাত্রলীগের হামলা

বিজয় উৎসব পালন করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ মুক্তিযোদ্ধাসহ আহত ৯

আমৃত্যু এক যোদ্ধার কথা

ছাত্রদলের পুষ্পস্তবক ছিঁড়লো ছাত্রলীগ

বঙ্গবন্ধুর গৃহবন্দি পরিবারকে যেভাবে উদ্ধার করেছিলেন কর্নেল তারা

ভারতে তিন তালাক বিরোধী খসড়া আইনে সরকারের অনুমোদন