(পর্ব-২)

তারা জবাই করে এবং জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করেছে

মত-মতান্তর

মানবজমিন ডেস্ক | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৬:২৮
গত অক্টোবরে মিয়ানমারের রাখাইনের এক সীমান্ত ফাঁড়িতে হামলার ঘটনায় ৯ পুলিশ নিহত হওয়ার পর সেখানে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্সের শুরু। তবে রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা বা জেনোসাইড চলেছে কিনা তা নিয়ে মত-দ্বিমত রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অফিস অব দ্য ইউএন হাইকমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস (ওএইচসিআর) গত ৩রা ফেব্রুয়ারি ৪৩ পৃষ্ঠার একটি ফ্ল্যাশ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে ফুটে উঠেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত মৃত্যু ভয়াল বিভীষিকা। এই রিপোর্টের নির্বাচিত অংশের অবিকল তরজমার দ্বিতীয় কিস্তি ছাপা হলো আজ।

৬.২ কাছ থেকে করা গুলিতে মৃত্যু
রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী এবং শ্রদ্ধাভাজন সদস্য বিশেষ করে শিক্ষক, ইমাম, ধর্ম বিশারদ এবং কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ কথিতমতে নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন। বেশ কিছু ঘটনায় সেনাবাহিনী বাড়ি-ঘর, দোকান, কিংবা গ্রামে প্রবেশ করেই খুুব কাছ থেকে গুলি করে এ ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে বেশ কয়েকজন ভিক্টিম উল্লেখ করেছেন যে, অনেক সময় সেনাবাহিনী এবং তাঁদের বেসামরিক রাখাইন দোসরদের নিয়ে একটি গ্রামে এসে পৌঁছল। অনেক সময় সংখ্যায় তাঁরা ৪শ পর্যন্ত ছিল। এরপর তারা ছয় থেকে দশজনের গ্রুপে ভাগ হয়ে রোহিঙ্গা নিধনে তাঁদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে। কিছুক্ষেত্রে হত্যা করার আগে কথিতমতে, ভিক্টিমদের কাছে ‘অনুপ্রবেশকারী’ কিংবা ‘বাংলাদেশ থেকে আসা লোকজনের’ বিষয়ে অথবা অস্ত্র সম্পর্কে এবং অন্যকিছু ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্নত্তোরে না গিয়ে খুবই ক্লোজ রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গা খু ইয়া এলাকার একজন ব্যক্তির বর্ণনা, ‘মিলিটারি আমাদেরকে প্রায় দশদিন তালাবদ্ধ করে রেখেছিল। আমি খাদ্য সংগ্রহের জন্য পালিয়েছিলাম। কারণ আমার তিনটি বাচ্চা অনাহারে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়েছিল। পরিস্থিতি আমার কাছে অসহনীয় এবং চরম হয়ে উঠেছিল যে, আমি নিকটবর্তী একটি খালে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। আমি যখন খালটিতে পৌঁছাই সেখানে আমি আরো দুই গ্রামবাসীকে মাছ ধরতে দেখি। অকস্মাৎ দুজন পুলিশ কর্মকর্তা ধেয়ে আসেন। এবং আমাদের দিকে রাইফেল তাক করেন। আমাদেরকে নিল ডাউন হতে বলা হয়। আর তখন তারা তাঁদের রাইফেলের বাঁট দিয়ে আমাদের আঘাত করে। কিছুক্ষণ প্রহার করার পরে পুলিশ খুব কাছ থেকে ওই দুই গ্রামাবাসীকে গুলি করে। তাঁরা উভয়ই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এরপর তাঁরা অব্যাহতভাবে আমাকে লাথি ও ঘুষি মারতে থাকে। আর চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘এখন তোমার আল্লাহকে ডাকো। এবং তোমাকে বাঁচাতে বলো।’ প্রায় দশমিনিট প্রহারের পরে তাঁরা আমাকে নিশানা করে। আমার পেছনে একটি বুলেট এসে লাগে এবং আমি পানিতে পড়ে যাই। তাঁরা আমার ওপরে গুলি চালাতে থাকে আমি টের পাই দ্বিতীয় বুলেট এসে আমার কাঁধে আঘাত করেছে। আমার মৃত্যু ঘটেছে ভেবে পুলিশরা চলে যায় (ওএইচসিআর এই বুলেটবিদ্ধ ব্যক্তির আলোকচিত্র ধারণ করেছে)।
৬.৩ ছুরিকাঘাতে হত্যা
প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভিক্টিমদের কাছ থেকে এরকম জবানবন্দিও পাওয়া গেছে যে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা গলাকেটে হত্যার শিকার হয়েছেন। সেনাবাহিনী তাঁদের বহন করা ছুরি দিয়ে গলা কেটেছে। অনেক সময় পশু জবাই করার যে লম্বা ছুরি তাও তারা গলা কাটায় ব্যবহার করেছে।
এধরনের বহু হত্যাকা- নিহতদের পারিবারিক সদস্য, বন্ধু, প্রতিবেশী এবং নিকটবর্তী প্রতিবেশীদের সামনেই ঘটেছে (এরপরের অংশে শিশু হত্যার বিষয়টি দেখুন)। ১৪ বছরের এক কিশোরী তাঁর বাড়ি ইয়ে খাট চুং গা সান এলাকায়। সে ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনী দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে। এ কিশোরী লক্ষ্য করে যে, সেনাবাহিনী তাঁর মাকে পিটিয়ে পিটিয়ে এবং তাঁর দুই বোনকে চুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘যখন আমার ৮ ও ১০ বছর বয়সী দুই বোন বাড়িতে সেনাবাহিনী আসছে দেখে পালিয়ে যাচ্ছিল তখন তাঁদেরকে হত্যা করা হয়। তাঁদেরকে গুলি করে মারা হয়নি। ছুরি দিয়ে জবাই করা হয়েছে।’
১৮ বছর বয়সী আরেক তরুণীর বাড়ি কিয়েট ইয়ো পাইন এলাকায়। তিনি কীভাবে তাঁর মাকে হারিয়েছেন তার বিবরণ দিয়েছেন, ‘আমার মায়ের বয়স হয়েছিল ৬০ বছরের বেশি। তাই মিলিটারি যখন বাড়িতে আসে তখন তিনি ভালোভাবে দৌড়াতে পারেননি। আমরা আমাদের চোখের সামনেই দেখলাম মিলিটারি তাঁকে ধরে ফেলল। এবং একটি লম্বা চুরি দিয়ে তাঁকে গলা কেটে হত্যা করল।’
যখন পুলিশ সেনাবাহিনী কিংবা তাঁদের রাখাইন বেসামরিক দোসররা তাঁদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে তখন প্রতিটি বাড়ির সদস্যরা যে যেদিকে পারে সাধারণত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন তাঁরা একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরকমের একটা বিশৃঙ্খলা, ভীতি এবং বিভ্রান্তির মধ্যে কোনো একটি পরিবারের কিছু সদস্য সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে। অন্যেরা নিকটবর্তী পাহাড়, গ্রাম, কিংবা ধান খেতে নিজেদেরকে লুকিয়ে ফেলতে পেরেছে। এর মধ্যে যারা সেনাবাহিনী চলে গিয়েছে বুঝতে পেরে আবার নিজেদের বাড়ি-ঘরে ফিরে আসতে পেরেছে, তাঁরা এসে দেখেছেন সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়া তাঁদের আত্মীয়-স্বজনকে গুলি কিংবা ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। ইয়ে খাট গ চং সান এলাকার একজন মহিলা বলেছেন, ‘আমি আমার বাবাকে নিয়ে বাস করতাম। আমার বাবাকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি একজন পরহেজগার মানুষ ছিলেন।’
৬.৪ পুড়িয়ে হত্যা
হত্যাকা- সংঘটনের অন্য বড় কারণের আরেকটি হচ্ছে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া। কিয়েট ইয়ো পাইন, ইয়ে খাট গ চং সান, দার গাই জার এবং পিন্ট পু চং-এর মতো গ্রামগুলো থেকে আসা ব্যক্তিদের জবানবন্দি থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সেনাবাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে কোনো পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে রয়েছে এটা জেনেই তাঁরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এবং অন্যকিছু ক্ষেত্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া ঘরের ভেতরে রোহিঙ্গাদের ঢুকতে বাধ্য করেছে। যারা এই আগুনে পুড়িয়ে মারার হত্যাযজ্ঞ থেকে নিজেদেরকে প্রাথমিকভাবে পালিয়ে বাঁচাতে পেরেছিল, তারাও পরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
এমন কিছু ঘটনার জবানবন্দি গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে সেনাবাহিনী অথবা রাখাইন গ্রামবাসী একটি পুরো পরিবারকে আটকে ফেলতে পেরেছিল। একটি ঘরের ভেতরে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং প্রতিবন্ধীরাও তার মধ্যে ছিলেন। তাঁদের সবাইকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। ইয়ে খাট গ চং সান এলাকার একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, ‘সেনাবাহিনী আমার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তখন সেখানে আমার বৃদ্ধ শাশুড়ি ছাড়াও ননদ ছিলেন। এই ননদ এক মানসিক প্রতিবন্ধী। সুতরাং আগুন লাগানোর পরে পালানোর সময় আমরা তাঁদেরকে সঙ্গে নিতে পারিনি। ওএইচসিআর ইয়ে খাট গ চং সান এলাকার আরেকটি বিবরণ রেকর্ড করেছে। সেখানে জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের ঘর থেকে বের করে একটি খোলা চত্বরে জড়ো করা হয়। এবং তারপর তাঁদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়, ‘মিলিটারি আমার দাদা ও দাদিকে তাঁদের ঘরের বাইরে বের করে আনে। প্রথমে তারা তাঁদেরকে বেদম প্রহার করে। তারপর দুজনকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলে। মিলিটারি তখন শুকনো কাঠ এনে চারপাশে তাদের স্তূপ করে এবং  এরপর আগুন ধরিয়ে দেয়।
কিছুক্ষেত্রে সেনাবাহিনী এমনকিছু ব্যক্তির দেহ ভস্মীভূত করেছে, যারা বুলেট কিংবা ছুরিকাঘাতে মারা গিয়েছিল। এসব বিকৃত মরদেহ, যাদের অনেককেই আর শনাক্ত করা যায় না, তাঁদের আলোকচিত্র ও ভিডিও ওএইচসিআরের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে (যদিও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এই টিম এর সত্যতা যাচাই করার সুযোগ পায়নি)। পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন যে, বহু ঘটনায় মৃতদেহ এতটাই খারাপভাবে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে যে, তখন তাঁদের শনাক্ত করার একমাত্র চিহ্ন হিসেবে চুড়ি কিংবা ঘড়ির মতো বিষয় অবশিষ্ট থেকেছে।
গার সার কু এলাকার ১৮ বছর বয়সী তরুণী স্মৃতিচারণ করেন এভাবে, তখন ভোররাত ঘড়িতে প্রায় ৩টা বাজে। আমরা ঘুমাচ্ছিলাম। তখন মিলিটারি আমাদের গ্রামে আক্রমণ করল। আমরা আতঙ্কে ছুটতে শুরু করলাম। বাড়িতে রেখে এসেছিলাম ৫ বছরের ভাইটিকে। মিলিটারি আসল। ঘরটিতে আগুন দিল। আর তাতে আমার ভাই জীবন্ত পুড়ে মারা গেল। মিলিটারি গ্রাম ত্যাগের পরে আমরা সকালে তাঁর পুড়ে যাওয়া মৃতদেহ উদ্ধার করলাম।
সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং রাখাইন গ্রামাবাসীদের দ্বারা মানুষ ও তাঁদের সহায় সম্পদ পোড়ানোর ঘটনায় যে সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, তাতে দৃশ্যত এই ইঙ্গিত মিলে যে এসব তৎপরতা ছিল সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত।
ইয়ে খাট গ চং সান এলকার ১১ বছর বয়সী কিশোরী বলেছে, ‘আমাদের ঘরে ঢোকার পরে সেনাবাহিনী আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা আমার মাকে মাটিতে লুটিয়ে ফেলল। তারা তাঁর বস্ত্র কেড়ে নিল। এবং ৪ জন কর্মকর্তা তাঁকে ধর্ষণ করল। আর আমার মাকে ধর্ষণ করার ঠিক আগেই আমার বাবাকে  জবাই করে হত্যা করল। আমার বাবা ছিলেন একটি মসজিদের ইমাম। এর কয়েক মিনিট পরে তারা একটি রকেট দিয়ে ঘরটিতে আগুন ধরিয়ে দিল। আমার মা তখন ঘরের ভেতরেই ছিল। এসব ঘটনাবলী আমার চোখের সামনেই ঘটল।’

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Mohammed

২০১৭-০২-২০ ২০:২৮:৪১

Where are those western humanists who are always busy to find anti human activities in Muslim majority countries where such incidents never takes place?

আপনার মতামত দিন