শ্রীমঙ্গলে ভেঙে পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা

বাংলারজমিন

এম ইদ্রিস আলী, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) থেকে | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের চরম অবহেলা, গাফিলাতি ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে বিদ্যালয়গুলোতে সরকার নির্ধারিত ক্যালেন্ডারের সময়সূচি অনুযায়ী পাঠ দান করা হচ্ছে না। নির্ধারিত সময়ের আগেই শিক্ষার্থীদের পাঠদান চুকিয়ে স্কুল ছুটি দেয়া হচ্ছে। এমনকি শিক্ষাবিভাগের কর্মকর্তারা বিদ্যালয়গুলো সঠিক তদারকির অভাবে সময়মতো শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও প্রস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ দায়সারা শিক্ষাদানের ফলে স্কুলগুলোতে ছাত্র উপস্থিতির হার দিন দিন কমছে। আর এসব কারণে শিক্ষার্থীদের অভিভাবক মহলে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় শ্রীমঙ্গল উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়বে।
সরজমিন মঙ্গলবার উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের কয়েকটি স্কুলে গিয়ে এ চিত্র ফুটে উঠেছে। ওই দিন দুপুর দুটায় গর্ন্ধবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় মোট ১৮২ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৬ জন অনুপস্থিত ছিল। ১ম শ্রেণির ছাত্র সংখ্যা ২৩ জনের মধ্যে উপস্থিতিতে ১৮ জন, ২য় শ্রেণি ৩৪ জনের মধ্যে ৩০ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৪৪ জনের মধ্যে ২২ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৩৩ জনের মধ্যে ২৪ জন ও ৫ম শ্রেণিতে ২৪ জনের ১২ জন শিক্ষার্থী উপস্থিতি ছিল। অর্থাৎ বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী ১৮২ জনের মধ্যে ৫৬ জন শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি পাওয়া যায়। যার শতকরা হার ৬৯ পারসেন্ট। কিন্তু ওই বিদ্যালয়ের জানুয়ারি মাসের উপজেলা শিক্ষা অফিসে দেয়া মাসিক বিলে দেয়া তথ্যে দেখা যায় ৯১ পারসেন্ট শিক্ষার্থী ওই মাসে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ছিল।
ওই বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক নীলিমা রানী দাশ রায়সহ অন্যান্য শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মান যাচাইকালে দেখা যায়। বিদ্যালয়টির পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী পূর্ণিমা সরকারকে বলা হয়েছিল  ‘জাতীয় সঙ্গীত’ বানান বোর্ডে লিখতে সে লিখে ‘জাতীয় সংয়’। একইভাবে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জয় দাশকে দ্বিতীয় শ্রেণি লিখতে বলা হলে সেও বানান ভুল করে বসে ‘দ্বিতয় শ্রেণি’। একই দিনে নতুন বাগান এলাকার ওয়াজিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুর তিনটায় গিয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায়। এ এলাকার বাসিন্দা ভূনবীর দশরথ উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র হোসেন মিয়া বলল ‘এ স্কুল ১১টার সময় খুলে, লাগায় তিনটায়। মাস্টরে আধা পড়ায় আর খালি ঘুরে।’এ সময় একই অভিযোগ তুলেন এ এলাকার বাসিন্দা আলী আকবর। বিদ্যালয়টির লেখাপড়ার অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে নতুন বাগানের মুরব্বি কাজী আবুল হাসেম সাংবাদিক পরিচয় জেনে ক্ষোভ প্রকাশ বললেন, ‘এই স্কুল, এইটার কোনো টাইম টেবিল নেই। যে সময় মনে চায় খুললো, আর না হলে নেই। আমি সকাল নয়টায় বের হয়ে যাই দেখি স্কুল বন্ধ। আবার বিকেল তিনটার সময় আইয়া দেখি স্কুল বন্ধ। এই স্কুল যে কোন সময় খোলে; আর বন্ধ করে কোন সময়- এইটা আল্লায়ই কইতে পারে। আর পারে এলাকার মানুষ’। এ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র কবির মিয়া বলল ‘আজকে বিকেল ৩টার সময় ছুটি অইছে। প্রতিদিন সকাল ১১টায় স্কুল খুলে। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র কে দুপুর ১২টায় ছুটি দেয়। আর তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছাত্রীকে তিনটার সময় ছুটি দেয়’ এই ভাবে প্রতিদিন আমাদের স্কুল ছুটি হয়’।
একই দিন বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে শাসন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলতে দেখা যায়। বিকাল তিনটা ৪৫ মিনিটে পাত্রিকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় স্কুলটির দরজা জানালা সবই খোলা। কিন্তু বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রী নেই। তবে বিদ্যালয়ে প্রবেশকালে সহকারী শিক্ষিকা ঝুমা রাণী পালকে যানবাহনের অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার কাছে স্কুল কখন ছুটি হয়েছে জানতে চাইলে মুখ মলিন করে নিশ্চুপ থাকেন।


তবে ওই স্কুলের দপ্তরি কনাই মিয়া বলেন,‘প্রধান শিক্ষক শর্বাণী রানী দেব অফিসের কাজে দুপুরে চলে যান। এর জন্য সহকারী শিক্ষকরা তিনটা ৪৫ মিনিটে ছুটি দেন। বিকেল চারটায় আলিশারকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়। ওই স্কুলটিও তালা বন্ধ। সাংবাদিকের উপস্থিতি দেখে ওই স্কুলের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র আব্দুল আজিজ ও ৫ম শ্রেণির ছাত্র নুরুজ্জামান এগিয়ে আসে। বিদ্যালয়টি কখন ছুটি হয়েছে জানতে চাইলে তারা দু’জন বলে আজকে একটু তাড়াতাড়ি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। আর এমনিতে প্রায় দিনই চারটার আগে স্কুল ছুটি হয়ে যায়। স্কুলটির ওই দুই ছাত্রের বাবা ডা: আব্দুল আজিজ বললেন, ‘এই স্কুলের পার্শ্বের বাড়ি আমার। প্রায় দিনই শিক্ষকরা দশটা এগারোটায় আসেন। আজও (মঙ্গলবার) দুজন শিক্ষক বারোটার সময় স্কুলে আসেন।  এই স্কুলে ভাল লেখাপড়া হচ্ছে না। স্কুলে এসেই শিক্ষকদের কানে খালি মোবাইল আর মোবাইল। গপ আর গপ। পড়াইতা কোন সময়। ইতার কোনো খবর নাই’।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সুত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় রয়েছে মোট ১৩৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। চলতি বছরের সরকারি বিধি অনুযায়ী সকাল ৯টায় স্কুল খুলতে হয়। ৯টা ১৫ মিনিটে সমাবেশ। সাড়ে নয়টা থেকে ক্লাস শুরু। দুপুর ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত টিফিনের সময় বাদ দিয়ে ২টা থেকে একটানা বিকেল ৪টা ১৫ পর্যন্ত ক্লাস চলবে। বিকেল সাড়ে চারটায় স্কুল বন্ধ করতে হবে।  
এ ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জোতিষ রঞ্জন দাশ বলেন, ‘সরকারি নীতিমালায় শিক্ষকদের স্কুলে সকাল ৯টায় বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকার কথা। আর বিকেল সোয়া ৪টায় ছুটি দেয়ার নিয়ম রয়েছে। কি কারণে দেরিতে বিদ্যালয়ে আসে আর সময়ের আগে ছুটি প্রদান করেছে তাদেরকে মৌখিক সতর্ক করেছি। দায় দায়িত্ব তো আমার উপরই আসবে।  যেহেতু আমি সরকারি বেতন খাই’।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘এ বিষয়গুলো খুবই খারাপ। এরকম হলে তো আমাদের ভাবমূর্তির বিষয় এটা। যে সব বিদ্যালয়ে অনিয়ম পাওয়া গেছে তাদের শোকজ করা হবে। এছাড়া আগামী সমন্বয় সভায় সকল শিক্ষককে সতর্ক করে দেয়া হবে যাতে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন