‘সুষ্ঠু নির্বাচন মুখস্থ বিষয় হওয়া চলবেনা, অন্তরে ধারণ করতে হবে’

মত-মতান্তর

মো. নুরুজ্জামান তালুকদার | ১২ জানুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৭:০৬
নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে তাহা গণতন্ত্র চর্চাকারী সকল মানুষেরই আরাধ্য। অভিধানে হাজার হাজার বিশেষণ থাকতেও শুধু এই তিনটি শব্দই কেন নির্বাচনের সংগে আষ্টে পৃষ্ঠে লেগে আছে তা নিয়ে দু’কলম লেখার প্রয়োজন মনে  করছি।
ইংরেজী Fair শব্দেরই বাংলা রুপ হচ্ছে সুষ্ঠু যাহা ন্যায্য বা বৃহত্তর পরিসরে আইনানুগভাবে দায়িত্ব পালন করা বুঝায়। নির্বাচন একটি বিশাল কর্মকান্ড, কিন্তু ধাপে ধাপে আইন ও বিধি বিধান অনুসরণ করতে হয় এবং অবশ্যই তাহা অতি সতর্কভাবে। আমরা জানি প্রধানত দুটি পক্ষ নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে জড়িত হয়। প্রথম পক্ষ নির্বাচন কমিশনের আওতাধীন নির্বাচন পরিচালনাকারি এবং এইরুপ পরিচালনায় সহায়তাকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ। এবং দ্বিতীয় পক্ষ সংশ্লিষ্ট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীগণ এবং তাদের সমর্থকগণ।
এই দুই পক্ষ যখন নির্বাচনের আইন ও বিধি বিধানগুলি পুংখানুপুংখরুপে মেনে চলবে তখন Fair বা সুষ্ঠু নির্বাচনের শর্ত প্রায় শতভাগ পূরণ হবে। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীগণের জন্য প্রণীত নির্বাচন আচরণ বিধিমালা প্রার্থীগণ কর্তৃক অনুসৃত হলে নির্বাচন পূর্ব পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকে, ভোটারদের মনে আনন্দ বিরাজ করে এবং নির্বাচন পরিচালনাকারিদেরকে গলধঘর্ম হতে হয় না।
এবার আসি ‘অবাধ’ শব্দটির বিষয়ে। অবাধ হচ্ছেন সম্মানিত ভোটারগণ, তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগে কোনো বাধা দেওয়া যাবে না, প্রলোভন দেখানো যাবে না, লুঙ্গি, শাড়ি বা টাকা দিয়ে ভোট কেনার বায়না দেওয়া যাবে না, ভীতি প্রদর্শন করা যাবে না এবং বলা যাবে না যে, কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণী, পেশা, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গের ভোটার ভোটকেন্দ্রে না গেলেও প্রার্থী তার/তাদের ভোট পেয়েছেন। ভোটের দিনে প্রার্থীর নিজস্ব বা ভাড়া করা যানবাহনে ভোটারগণকে ভোটকেন্দ্রে আনা নেওয়ার ব্যাপারে যে কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে সেটিরও মূল উদ্দেশ্য ভোটারগণকে শেষ মূহুর্তে তাদের ‘অবাধ’ সত্ত্বায় আপোসহীন রাখা। ভোটারগণ ছাড়া নির্বাচন কর্মকর্তা, প্রার্থী, এজেন্ট, নিরাপত্তা বাহিনী এবং নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত অন্য কারো ‘অবাধ’ হওয়ার বা এরূপ ভাবার বিন্দুমাত্র সুযোগ নাই। পদে পদে এবং ধাপে ধাপে আইন মান্য করাই নির্বাচন পরিচালনা কর্তৃপক্ষের/কর্তৃপক্ষ সমূহের দায়িত্ব।
নিরপেক্ষ শব্দটি বহুমাত্রিক, কখনও কখনও আপেক্ষিক এবং কেউ প্রমাণ চাইলে সহজভাবে প্রমাণ দেওয়া যায় না। নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত সকলকেই নিরপেক্ষ থাকা অতি আবশ্যক। নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাখ্যার জন্য দুটি বিষয় সহজভাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। (ক) নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত সকলেরই (মাননীয় নির্বাচন কমিশন ব্যতিত) পরিচয় বা এক নামে ডাকা হয় নির্বাচন কর্মকর্তা হিসাবে। সেখানে কোনো বিভাগ বা কোনো পদবী বিবেচ্য বিষয় নহে। (খ) নির্বাচন কর্মকর্তাগণ সংশ্লিষ্ট নির্বাচনের প্রার্থীদের পক্ষেও থাকবেন না এবং বিপক্ষেও থাকবেন না। কথায়, কাজে বা ইশারা ঈঙ্গিতে এমন কিছু করা যাবে না যাতে করে নির্বাচনে বিন্দুমাত্র অন্যায্য প্রভাব বিস্তার হয়। প্রার্থীগণ নির্বাচন কর্মকতাগণকে সাধারণত সন্দেহের চোখে দেখে থাকেন। এ জন্য শুধু কাজে নয় কথা বার্তায়, ইশারা ঈঙ্গিতেও সমূহ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয় নির্বাচন কর্মকর্তাগণকে।
বেশি ওজনের কোন সামগ্রী যদি একাধিক কাঁধে বহন করতে হয় তবে বহনকারিদের কাঁধের উচ্চতা মোটামুটি সমান হলে ভার সমানভাবে পড়বে এবং কাজটি করা সহজ হবে। কাঁধের উচ্চতা কম বেশি হলে বাহিত সামগ্রী দোল খাবে এবং বহনকারিগণ অস্বস্তিতে ও কষ্টে ভুগবেন। নির্বাচনের দায়িত্ব এক, একাধিক বা শত কাঁধে নয় বরং হাজার হাজার কাঁধে বহন/পালন করতে হয়। কাঁধ বদলানোর কোন সুযোগ নাই। যে যার দায়িত্ব পালন না করলে অথবা আংশিক পালন করলে  লক্ষ্যে পৌঁছান খুব কঠিন। নির্বাচন ছোট কি বড় সেটি কথা নয়, মূল কথা হচ্ছে নির্বাচনটি সুন্দরভাবে অনুষ্ঠান করা গেল কি না। শুধু মাত্র একজন ভোটারও যদি তার ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হন তবে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিখুত বলা যাবে না। আজকের দিনে মোটামুটি ভাল নির্বাচন জনগণ মানতে চাইবেন না, সম্পূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই কেবল মানুষের মন ভরবে। আসুন সবাই কাঁধ উচু করি, আগামি দিনের নির্বাচনের দায়িত্ব আক্ষরিক অর্থে যার কাঁধে যতখানি থাকার কথা ততখানি গ্রহণ করি। দয়া করে মাঝপথে কেউ কাঁধ সরিয়ে নেবেন না। যার যার দায়িত্ব তার তার মত করে পালন করলে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সবসময়ই সম্ভব।
লেখক: উপ-সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আন্তর্জাতিক নির্বাচনী দায়িত্বে কম্বোডিয়া (১৯৯৩), কসোভো (২০০০), শ্রীলংকা (২০০৪), লাইবেরিয়া (২০০৫) ও অষ্ট্রেলিয়ায় (২০১২) কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এ কর্মকর্তার।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

মসজিদে গুলি ছোড়ার পর পাল্টে গেল এক মার্কিনীর জীবন

দৃশ্যপট একই

আয় বৈষম্য বাড়ায় চাপে মধ্যবিত্ত

নকলা উপজেলা চেয়ারম্যানের লাশ উদ্ধার

রিভিউর প্রস্তুতি

বাংলাদেশির বীরত্বে ধর্ষকদের হাত থেকে রক্ষা পেলো ইতালীয় তরুণী

ঢাবিতে ‘ঘ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁস?

সিলেট টার্মিনালে গুলিবর্ষণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি

রোহিঙ্গা স্রোত থামছে না

বড় দুই দলেই প্রার্থীর ছড়াছড়ি

সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবেছে চট্টগ্রাম

টানা বৃষ্টিতে নগরজুড়ে দুর্ভোগ

নিম্নমানের কাগজে ছাপা হচ্ছে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই

দিনে গড়ে দেড় হাজার মামলা

‘বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে’

পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে রোহিঙ্গাদের উপর আক্রমণ: মতিয়া চৌধুরী