মিয়ানমারকে বাংলাদেশ

রোহিঙ্গাদের ফেরত নিন

প্রথম পাতা

কূটনৈতিক রিপোর্টার ও মানবজমিন ডেস্ক | ১২ জানুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। জটিল ওই সংকট নিয়ে আলোচনায় দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ‘সুফল’ পাওয়ার আশা করছে ঢাকা। স্পর্শকাতর এ ইস্যুতে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় এতদিন অনিচ্ছাই দেখিয়ে আসছিল মিয়ানমার। কিন্তু এবার তারা আন্তর্জাতিক চাপের কারণে কিংবা বিশ্বকে দেখানোর জন্য হলেও খানিকটা নমনীয়! আনুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য মিয়ানমারের কার্যকর নেতা দেশটির স্টেট কাউন্সেলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি’র একজন দূত বর্তমানে বাংলাদেশ সফরে রয়েছেন। তার সঙ্গে আছেন দেশটির একদল কূটনীতিক। গতকাল তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করেছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলাদা আলাদা ওই বৈঠক ও আলোচনায় ঘনিষ্ঠ  প্রতিবেশী মিয়ানমারকে প্রায় অভিন্ন বার্তাই দিয়েছে বাংলাদেশ। সেখানে ঢাকার তরফে দুটি বিষয় বেশ খোলাসা করেই বলা হয়েছে। প্রথমত দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং অনিবন্ধিত মিয়ানমার নাগরিকদের দ্রুত ফেরত নেয়ার প্রতিক্রিয়া শুরু করতে হবে। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশ সীমান্ত লাঘোয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে যাতে হত্যা-নির্যাতন বা প্রাণহানির শঙ্কায় আর কোনো মিয়ানমার নাগরিক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য না হয়। সূত্রের দাবি, এখানে থাকা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এবং রাখাইন সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারকে বেশ ‘কড়া বার্তা’ দিয়েছে বাংলাদেশ। 
সূত্র মতে, কেবল সঙ্কট সমাধানের তাগিদই দেয়নি, মিয়ানমারকে যে কোন ইস্যুতে সহযোগিতা বার্তাও দিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন রাখাইন রাজ্য তথা মিয়ানমারের অশান্ত পরিস্থিতির প্রভাব যে বাংলাদেশের ওপর পড়ে সেটি সূ চি’র দূতকে বলা হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের যে কোন সমস্যার সমাধান যে সম্ভব সেটাও স্পষ্ট করেছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। 
সূ চি’র দূতের বাংলাদেশ সফর নিয়ে গতকাল বার্তা সংস্থা রয়টার্সও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা লিখেছে, সু চির দূত ও দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিউ তিনের চলমান সফর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ‘বিরল’ কূটনীতিক প্রচেষ্টার একটি। দু’দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই কিছুটা বিরূপ উল্লেখ করে ওই রিপোর্টে বলা হয়- রাখাইনে সৃষ্ট সংকটের কারণে বাংলাদেশে নতুন করে (হাজার হাজার) রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রবেশ এবং মিয়ানমার নৌবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশি জেলেদের গুলি করার ঘটনায় সম্প্রতি দুই দেশের সম্পর্ক আরো অবনমন হয়েছে। উভয় দেশই মনে করে রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা মুসলিম সংকটটি অপর দেশের মাথাব্যথা।  রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজেদের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে এ ইস্যুতে সহযোগিতা করতে এতদিন অনিচ্ছা দেখিয়ে এলেও সু চির দূতের বাংলাদেশ সফর মিয়ানমারের সেই অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত। বিশ্লেষকরা এ সফরকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন জানিয়ে রিপোর্টে বলা হয়- তারা মনে করেন, এ সংকট সমাধানে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-পরিচালক আই আই সোয়েকে উদৃত করে রয়টার্সের রিপোর্টে বলা হয়- মিয়ানমার দূতের ৩ দিনের ওই সফরে দুই প্রতিবেশীর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে। মিয়ানমারের তরফে সীমান্ত নিরাপত্তার মতো ‘জটিল’ ইস্যু উত্থাপন করা হবে। মিয়ানমারের রাখাইনে কয়েক মাস ধরে যে অভিযান চলমান রয়েছে তাকে ‘সীমান্ত স্থিতিশীল’ করার অভিযান হিসাবে দেখছে নেপি’ড। যদিও ওই অভিযানে অস্থিতিশীলতা আরো বেড়েছে। গত অক্টোবর থেকে চলা ওই অভিযানে প্রায় শতাধিক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। অভিযানের নামে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক জ্বালাও-পোড়াও করেছে বর্মীবাহিনী। সেখানে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত নারকীয় বর্বরতা ‘গণহত্যা’ থেকে প্রাণে বাঁচতে প্রায় ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এখানে আগে থেকে নিবন্ধিত ৩২ হাজার এবং অনিবন্ধিত প্রায় ৫ লাখ মিয়ানমার নাগরিক অস্থায়ী আশ্রয়ে রয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো সু চি’র বিশেষ দূতের ঢাকা সফর এবং বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের বরাতে রয়টার্সের রিপোর্টে এ নিয়ে শঙ্কা ব্যক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়- প্রথমবারের আলোচনা খুব বেশি ফল বয়ে আনবে বলে মনে করেন না বিশ্লেষকরা। অবশ্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম প্রকাশ না করে রিপোর্টে বলা হয় ওই কর্মকর্তা বলেছেন, মিয়ানমারই তার বিশেষ দূতের ঢাকা সফরের উদ্যোগ নেয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রকাশ্যেই মিয়ানমারকে চাপ দিচ্ছে। তাছাড়া দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে। আগামী ১৯শে জানুয়ারি কুয়ালালামপুরে ওআইসি পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সম্মেলনের কথা রয়েছে। ওআইসির মত আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ যেন মিয়ানমারের ওপর (নতুন করে) চাপ সৃষ্টি না করে সেই পথ বন্ধ করতে সূ চি’র দূতের ওই সফর হতে পারে বলেও মনে করেন বাংলাদেশি ওই কর্মকর্তা। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না করতে পর্দার আড়ালে থেকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বোঝানো ও চাপ দেয়ার কাজ করে আসছে।’ ওই রিপোর্টে বলা হয়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার আলোচনা বেশ জটিল। কারণ, মিয়ানমারে কয়েক দশক ধরে তাদের ওপর নির্যাতন চলছে। অনেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নিজেদের নাগরিক বলেই স্বীকার করে না। উল্লেখ্য, দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নিবন্ধিত প্রায় ৩২ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে প্রত্যাবাসনের কাজটি শুরু করছে না মিয়ানমার। উল্টো নিয়মিত বিরতিতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের ফলে সেখানকার লোকজন এ দেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। এ নিয়ে অতীতে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার কোনো কথাই রখেনি। ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার দুটি চুক্তিতে রাজি হয়েছিল। ওই দুই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের স্পষ্টভাবেই মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আজ অবদি তারা দেশটির নাগরিকত্ব পায়নি। বরং তাদের হাতে যে কার্ড ছিল তা কেড়ে নেয়া হয়েছে। 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন