হতাশায় গাছ কেটে ফেলছেন রাবার বাগান মালিকরা

বাংলারজমিন

আলাউদ্দিন কবির, কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) থেকে | ১২ জানুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সহ সারা দেশে ‘সাদা সোনা’ নামে পরিচিত রাবার শিল্প আজ ধ্বংসের প্রায় দ্বারপ্রান্তে। বিগত ৫-৬ বছর থেকে লাগাতার দরপতনে এই হতাশা প্রকট আকার ধারণ করেছে চাষীদের মাঝে। ফলে এ শিল্প এখন চাষীদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাবার বিক্রি করে বাগান মালিকদের লাভ তো দূরের কথা শ্রমিকদের  বেতন দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতি কেজি রাবার প্রক্রিয়াজাত করে বাজার উপযোগী করতে বিক্রয় মূল্য থেকে প্রায় ৯০ টাকা বেশি খরচ হয়। ফলে বাধ্য হয়ে কুলাউড়ার কোনো কোনো মালিক বাগানের গাছ কেটে ফেলেছেন, কেউবা বাগান বন্ধ রাখছেন। এদিকে রাবার কাঁচামাল কৃষি পণ্য হওয়া সত্ত্বেও শিল্প পণ্য হিসেবে  দেশের বাজারে ভ্যাট দিতে হচ্ছে ১৫ শতাংশ। রাবার বাগান মালিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে কুলাউড়ার ভাটেরায় সরকারিভাবে শুরু হয় রাবার চাষের। ২৮০০ একর জমি ও ২৩১ জন স্থায়ী ও ৫০০ জন অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে ভাটেরায় রাবার চাষের যাত্রা শুরু হয়। যার তত্ত্বাবধান করছে বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন। স্বায়ত্তশাসিত এ বাগানকে অনুকরণ করে কুলাউড়ায় বিভিন্ন কোম্পানি চা বাগানের পাশাপাশি রাবার বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। সেই তালিকায় রয়েছে এইচআরসি, ফিনলে, ডানকান এবং সিলেটের রাগীব আলীর কোম্পানি। আর ব্যক্তি মালিকানায় ছোট-বড় ২০-২২টি রাবার বাগান গড়ে উঠে। এসব রাবার বাগানে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করতো। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার রাবার  কেনাবেচা হতো। এই শিল্পকে ঘিরে মানুষের স্বপ্নের পরিধিও বাড়তে থাকে। ২০১০-১২ সালে রাবারের দাম ছিল কেজি প্রতি ২৯০-৩২০ টাকা, ২০১৩-২০১৪ সালে দরপতনে তা ১২০-১৩০ টাকা হয়। কিন্তু গত বছর থেকে হঠাৎ করে রাবারের দরপতনের ফলে বাগান মালিকদের মনে জন্ম নিয়েছে চরম হতাশা। সেই হতাশার মাত্রাটা এতই বেশি যে, রাবার মালিকরা নিজেদের বাগানের গাছ কেটে তাতে অন্য  কোনো গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করছেন।
রাবার বাগান মালিক বরমচালের আলহাজ  মো. আব্দুস সহিদ, শাকির আহমদ ও জয়চণ্ডীর আরকে রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের অন্যতম পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, অনেক প্রতিকূল পরিবেশে আমরা রাবার বাগান প্রতিষ্ঠা করেছি। প্রতিষ্ঠা পরবর্তীতে রাবারের দাম উঠানামা করেছে। প্রতি কেজি রাবার সর্বোচ্চ ৩৭৫ টাকায় বিক্রি করেছি। আর এখন সেই দাম নেমে এসেছে ৭০ থেকে ৯০ টাকায়। অথচ  দেশের বাগানগুলোয় রাবার উৎপাদনের পর তা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে বিক্রির উপযোগী করতে খরচ হয় প্রায় ১৬০ টাকা। এতে লাভ তো দূরের কথা বাগান শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন দেয়াও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এই লোকসান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতটা দরপতন আমরা কখনো দেখিনি। তারা আরো জানান, একদিকে বাগানকে ভতুর্কি দিয়ে চালাতে হচ্ছে। অপরদিকে রাবার কাঁচামাল কৃষিপণ্য হওয়া সত্ত্বেও সরকার এ শিল্পকে বাজারে শিল্পপণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করায় ভ্যাট দিতে হয় ১৫ শতাংশ, “এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা”। কুলাউড়া উপজেলা রাবার বাগান মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ নজিব আলী ও সাধারণ সম্পাদক একেএম শাহজালাল জানান, একসময় রাবার কৃষিপণ্য হিসেবে বিপণন হতো। এরপর তা কৃষিপণ্য থেকে বাদ দিয়ে তাতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট সংযুক্ত করা হয়। কুলাউড়ায় গড়ে উঠা ছোট-বড় সবক’টি রাবার বাগান মানুষের অনেক কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সরকার থেকে এসব বাগান মালিককে ব্যাংক ঋণ দিয়েও কোনো ধরনের সহযোগিতা করা হয়নি। রাবার বাগান মালিকদের এই চরম দুর্দিনে সরকার যদি সুদৃষ্টি দিয়ে না তাকায় তাহলে বাগান কেটে  ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন