উষ্ণ ভালোবাসায় সিক্ত সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা

বাংলারজমিন

প্রতীক ওমর, বগুড়া থেকে | ১২ জানুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার
নুরজাহান, সাদিয়া, মেঘা রাণী, জয়ন্তি রাণী, সৌরভ, পিংকী, গোলাপী, মিষ্টি, রোজিনা তাসলিমা, জান্নাতি, মাসুমা ও পরিমল চন্দ্র দাস। এরা সবাই শিশু। এদের বাস বগুড়ার চেলোপাড়ার বস্তিতে। কারো বাবা নেই, কারো মা নেই। অনেকের আবার দুইজনের কেউই নেই। অনাদর, অবজ্ঞা, অবহেলায় কেটে যাচ্ছে ওদের শিশুকাল।
মৌলিক চাহিদা অন্নই যখন তাদের ভাগ্যে সহজে জোটে না তখন বস্ত্র নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই। ছেঁড়া-ময়লা একটা হলেই বছর চলে যায়। কিন্তু শীতের তীব্রতা কি করে সহ্য করবে ওরা? প্রতিবার শীত এলে ওরা তাকিয়ে থাকে বিত্তবানদের দিকে। কেউ হাতে গরম কাপড় তুলে দিলে কোনো রকম কেটে যায় শীতের সময়টা। সবাই যে গরম কাপড় পায় তেমন না। এদের অনেকেই বঞ্চিত থেকে যায়। দেশের অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে উত্তরের এই অঞ্চলে প্রতিবার শীতের মাত্রা বেশি থাকে। এর পরেও যখন শৈত্যপ্রবাহ নামে তখন এদের কষ্টের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ছিন্নমূল এসব শিশু পেটের ক্ষুধার কাছে অসহায়ত্ববোধের পাশাপাশি শীতের কাছে বরাবরই হেরে যায়। সম্প্রতি বগুড়ার খোন পার্কে ওদের সঙ্গে কথা হয়। শীতের গরম পোশাক নেয়ার জন্য ওরা জড়ো হয়েছিলো পার্কটিতে। স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ফেসবুক ফ্রেন্ডস সোসাইটি বগুড়ার উদ্যোগে শিশুদের মাঝে ওই দিন শীতের পোশাক বিতরণ করেছে।
সুমি, জয়ন্তি রাণীরা গল্পের ফাঁকে ফাঁকে বললো, শীত এলেই এরা চেয়ে থাকে গরম কাপড়ের আশায়। এদের চার পাশের হাজারো শিশু মায়ের কোলে, বাবার কোলে বিভিন্ন রঙের ও ঢঙের গরম কাপড় পরে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য তারা শহরের ব্যস্ত রাস্তার ধারে বসে বসে অবলোকন করে। এদের মনেও তখন ইচ্ছে জাগে, যদি বাবা থাকতো, মা থাকতো তাহলে তারাও অবহেলিত থাকতো না। এসব ভেবে ভেবে চোখ ভরে যায় পানিতে। ধুলিমাখা গায়ে প্রস্থান করে রেললাইনের দুই ধারে গড়ে ওঠা বস্তিতে। দুপুরে মায়ের আসার অপেক্ষায় ঝুপরি ঘরের আশেপাশে বসে অপেক্ষা করে। অন্যের বাড়িতে রান্না করে নিজের খাবার বাঁচিয়ে তার জন্য আনবে মা। একটু পরে মা আসে। করতোয়ার দূষিত পানিতেই গা ধুইয়ে দেয় মেয়ের। তারপর বাটিতে করে আনা ভাত তরকারির সঙ্গে মিশিয়ে খাইয়ে দেয়। তারপর রাতের রান্না করার জন্য পড়ন্ত বিকালে আবার চলে যায় মা মানুষের বাড়িতে। আবারো অপেক্ষা রাতের ভাতের। এভাবেই কেটে যায় বস্তির অবহেলিত শিশুদের দিন-রাত।
এরকম সুবিধাবঞ্চিত হাজারো শিশু আমাদের দেশের আনাচে কানাচে অবস্থান করছে। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের মধ্যে অল্প সংখ্যক ব্যক্তি তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছেই এসব শিশু অবহেলিত। কিছু এনজিও ও সামাজিক সংগঠন ছিন্নমূল শিশুদের নিয়ে কাজ করলেও পরিমাণের তুলনায় সে কাজ অতি নগণ্য।
অপরদিকে আমাদের দেশের বেশির ভাগ এনজিও ওই সব শিশুদের কাজে লাগিয়ে প্রজেক্ট প্রফাইল তৈরি করলেও বেলা শেষে নিজেদের উন্নয়ন হলেও অবহেলিতরা থেকে যায় অবহেলাতেই। শিশুরা বরাবরই নিষ্পাপ। পরিবেসের কারণে কেউ দালান ঘরে, কেউ কুঁড়েঘরে জন্মায়। কুঁড়েঘরের শিশু আর দালান ঘরের শিশুদের পার্থক্য সৃষ্টি করে কেউ মহা আদরে আবার কেউ অবহেলায় অযত্নে বড় হচ্ছে। শিশুদের নিয়ে সরকারের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সবাইকে ভাবতে হবে। তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ সৃষ্টির জন্য কাজ করতে হবে। শিশুরা না থাকলে পৃথিবী এতোটা সুন্দর হতো না। সেই শিশুদের জীবন সাজাতে তাদের পাশে দাঁড়ানোর বিকল্প কোনো কিছু নেই। বগুড়ার স্বেচ্ছাসেবি অনলাইনভিত্তিক সামাজিক সংগঠন ‘ফেসবুক ফ্রেন্ডস সোসাইটি’ ২০১৪ সালের ২৫শে জুলাই অবহেলিত শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করে। তখন থেকেই প্রত্যেক ঈদে এবং শীতে বগুড়ার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের  পোশাক দিয়ে আসছে।
এছাড়াও একাধিক বার বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দুর্যোগকবলিতদের পাশেও দাঁড়িয়েছে সংগঠনটি। পর্যায়ক্রমে বগুড়া অঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টে গরিব অসহায় রোগীদের কাছে গিয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানও করছে সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবী কর্মীরা। সোসাইটির সভাপতি আরিফুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোঘল বলেন, আমাদের চারপাশে যে পরিমাণ অবহেলিত শিশু আছে তারচেয়ে অনেক বেশি বিত্তবান মানুষ আছে। প্রত্যেক বিত্তবান ব্যক্তি যদি একজন করে অবহেলিত শিশুর জীবনধারা পাল্টে দেয়ার দায়িত্ব নিতো, তাহলে বগুড়া শহরে একটি শিশুও অবহেলিত থাকতো না। তারা আরো বলেন, বিবেকের তাড়না থেকে সংগঠনটির যাত্রা শুরু। নিজের সংসারের টাকা বাঁচিয়ে ছিন্নমূল শিশুদের কল্যাণে ব্যয় করেন তারা। সোসাইটির সহ-সভাপতি আবুল কাসেম আমিন, প্রভাষক মহররম আলী, ডা. ইমরান রাসেদ, প্রতীক ওমর, মাছুমা আক্তার, আফরুজা সাদিয়া, মৌসুমী আক্তার মৌ, সোসাইটির আব্দুল গাফ্‌ফার, গোলাম মোস্তফা, আর কে রশিদুল, নিরব মিয়া, সবুজ মিয়া, আতিকুর রহমান আতিকসহ আরো অনেক সদস্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে শিশুদের নিয়ে। এসব নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবী কর্মীদের হাতে হাত মিলিয়ে আরো শক্তির যোগান দিলে বগুড়া শহরে অবহেলিত শিশু খুঁজে পাওয়া যাবে না। বগুড়ার এসব উদ্যমী তরুণদের দেখে দেশের অন্যপ্রান্তের যুবকরা উদ্বুদ্ধ হবে বলে আশাবাদী এসব তরুণরা।


 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

কানাডার উন্নয়নমন্ত্রী আসছেন মঙ্গলবার

ব্যক্তির নামে সেনানিবাসের নামকরণ মঙ্গলজনক হবে না: মওদুদ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহায়তার প্রস্তাব জাপানের

পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে নাম আসা ব্যক্তিদের তথ্য প্রকাশের দাবি সংসদে

সমাপনীতে অনুপস্থিত ১৪৫৩৮৩ শিক্ষার্থী

ঈদ-ই মিলাদুন্নবি ২ ডিসেম্বর

দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য তারেক রহমানকে দরকার: এমাজউদ্দিন

দল থেকে বরখাস্ত মুগাবে

দেখা হলো, কথা হলো কাদের-ফখরুলের

আখতার হামিদ সিদ্দিকী আর নেই

ইইউ প্রতিনিধি ও তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন

‘এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই’

নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে না শেখ হাসিনার সরকার-নৌ মন্ত্রী

‘আমি ব্যবসায়িক প্রতিহিংসার শিকার’

সেনা মোতায়েন নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি : সিইসি

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!