ধরাছোঁয়ার বাইরে সেই সিরিয়াল কিলার

শেষের পাতা

রুদ্র মিজান | ১১ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৫৮
আতঙ্ক কাটেনি। এখনো ভয়ে শিউরে উঠেন এলাকার লোকজন। বাসা ভাড়া নিতে আগ্রহীদের সঙ্গে কথা বলতে অনেক সাবধানতা অবলম্বন করেন বাড়ির মালিকরা। রাজধানীর উত্তরার দক্ষিণখান এলাকায় একের পর এক হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটানো সেই সিরিয়াল কিলারের সন্ধান এখনও পায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটার পর টনক নড়ে দক্ষিণখান থানা পুলিশের। শুরু হয় তল্লাশি। সংগ্রহ করা হয় ৩০টি ভিডিও ফুটেজ। এর মধ্যে দুটি ফুটেজেই ওই ঘাতকের উপস্থিতি রয়েছে। এতকিছুর পরও এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে সিরিয়াল কিলার। গত তিন মাসেও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি তার পরিচয়ও জানা যায়নি। তবু হাল ছাড়েনি পুলিশ। যেখানেই থাকুক সিরিয়াল কিলারকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
গত ৭ই সেপ্টেম্বর দক্ষিণখানের আশকোনার গাওয়াইর দক্ষিণ পাড়ার সোহরাব মজুমদারের স্ত্রী ওয়াহিদা আক্তার সীমাকে (৪৪) হত্যা করে এই কিলার। ওয়াহিদা আক্তার সীমার মেয়ে শারমিন আক্তার জানান, ওই ঘটনার পরপরই বাসায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। অচেনা কাউকে বাসায় ঢুকতে দেয়া হয় না। তবু ভয়ে আছেন তারা। কিলার গ্রেপ্তার না হওয়ায় একটা আতঙ্ক সবসময় কাজ করছে বলে জানান তিনি। একইভাবে ওই কিলারের হামলায় গুরুতর আহত দক্ষিণখানের আজমপুর মুন্সিমার্কেটের ৮১/৩৯ নম্বর বাড়ির জেবুন্নিসা চৌধুরীর ছেলে কাওসার আহমেদ বাপ্পী জানান, তারা থানায় মামলা করেছেন। কিন্তু কিলার গ্রেপ্তার হবে দূরে থাক তার পরিচয়ও উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। যে কোনো সময় তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। কি কারণে তার মায়ের ওপর হামলা হয়েছে এ বিষয়ে তিনি নিশ্চত না। যে কারণেই শঙ্কাটা বেশি বলে জানান কাওসার আহমেদ বাপ্পী।
দক্ষিণখান এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ‘টু লেট’ ঝুলানো বাসাগুলোর সামনের ফটকে একাধিক তালা লাগানো। আশকোনার মেডিকেল রোডের একটি বাসায় দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি করেও কারও দেখা মিলেনি। পরবর্তীতে ‘টু লেট’ লেখা সম্বলিত সাইনবোর্ডে দেয়া ফোন নম্বরে কল দিলে মমতাজ আক্তার নামে এক নারী তা রিসিভ করেন। বাসা ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাসায় পুরুষ মানুষ নেই। বিকাল ৪টার পরে আসেন।
সিরিয়াল কিলিংয়ের পর থেকে এই আতঙ্ক পেয়ে বসেছে দক্ষিণখানের বাসিন্দাদের। দক্ষিণখান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ রোকনুজ্জামান বলেন, বাসা ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে বা অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলতে বাড়ির মালিকদের সাবধানতা অবলম্বন করতে পুলিশের পক্ষ থেকেই পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাসা ভাড়ার জন্য কোনো অচেনা ব্যক্তি বাসায় ঢুকতে চাইলে পরিবারের একাধিক পুরুষ সদস্যের উপস্থিতিতে কথা বলতে বলা হয়েছে। যে কারণে বাড়ির মালিকরা আগের চেয়ে সচেতন বলে জানান তিনি।
দক্ষিণখান এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, মেডিকেল রোড, আজমপুর মুন্সি মার্কেট, আশকোনা গাওয়াইর এলাকায় পুলিশের টহল রয়েছে। এলাকাবাসী জানান, দেড়-দু ঘণ্টা পরপর পুলিশ টহল দেয়। যখন একের পর এক সিরিয়াল কিলার হামলা চালিয়েছিল তখনও পুলিশের টহল ছিল এলাকায়। এর মধ্যেই ঘটনাগুলো ঘটেছে। তবে দক্ষিণখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তপন কুমার সাহা বলেন, সিরিয়াল কিলিংয়ের পর থেকেই ওই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মোবাইল টিম ও পেট্রল ডিউটি বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি। কিন্তু মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও সিরিয়াল কিলার গ্রেপ্তার না হওয়া প্রসঙ্গে ওসি বলেন, কাউন্টার টেররিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সিরিয়াল কিলারকে গ্রেপ্তার করতে তৎপরতা চালাচ্ছে। ভিডিও ফুটেজে প্রাপ্ত ছবি লিফলেট আকারে এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে তাকে ধরিয়ে দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়াও এক ঘণ্টা পরপর মোবাইল টিম বিভিন্নস্থানে ডিউটি করছে। কোর্টবাড়ি এলাকায় ২৪ ঘণ্টা চেকপোস্ট বসানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশের তৎপরতার কারণে সিরিয়াল কিলার এলাকা ছেড়েছে বলেই মনে করছে পুলিশ। তবে কিলার যেখানেই থাকুক তাকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানান ওসি তপন কুমার সাহা।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণখান এলাকায় দুটি হত্যাকাণ্ড ও চারটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি হামলা ঘটেছে একই কায়দায়। বাসা ভাড়া নেয়ার অজুহাতে বাড়িতে ঢুকে মধ্য বয়সী নারীদের কুপিয়েছে এক যুবক। ফর্সা, লম্বা ওই যুবকের পরনে শার্ট-প্যান্ট ও কাঁধে থাকতো ঝুলানো ব্যাগ। ভদ্রবেশী ওই সিরিয়াল কিলারকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন হামলার শিকার নারীদের স্বজনরা।
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন