পাঠ্যবইয়ে ভুল নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ে হ-য-ব-র-ল

প্রাথমিকের ভুল, দায়িত্ব নিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় এনসিটিবিতে সিন্ডিকেট

দেশ বিদেশ

নূর মোহাম্মদ | ১১ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার
প্রাথমিক পর্যায়ের বইয়ে ভুল। এসব বইয়ের কারিকুলাম অনুমোদন দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর ভুল সংশোধনের দায়িত্ব নিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, ভুল ধরা ও সংশোধন করতে উদ্যোগীও হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গঠন করা হয়েছে অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি। গতকাল শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে বক্তব্যও তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চোখে পড়ার মতো কোনো তৎপরতা নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি পাঠ্যপুস্তকে ভুল ধরার পর দুই মন্ত্রণালয়ের চরম দায়িত্বহীনতা ও সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে। সম্প্রতি প্রাথমিক পর্যায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হওয়ার জেএসসি পরীক্ষার দায় পড়ে প্রাথমিক মন্ত্রণালয়ের ওপর। কিন্তু পরীক্ষার দশদিন আগে পরীক্ষা না নেয়ার কথা জানায় তারা। এই নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়েল মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। পরে শিক্ষামন্ত্রী নিজে সংবাদ সম্মেলন করে জেএসসি পরীক্ষা নেয়ার দায়িত্ব নেন। এবার পাঠ্যপুস্তকের ভুলের বিষয়টি নিয়ে সেরকম অবস্থা চলছে। কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পাঠ্যপুস্তকে ভুলের দায় প্রথমে কেউ নিতে চায়নি। বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিজ দায়িত্বে ভুল সংশোধন এবং পরিমার্জনের দায়িত্ব নেয়। এরই অংশ হিসেবে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা কারিকুলাম তৈরি করে দেন। কিন্তু ছাপানোর পুরো দায়িত্ব এনসিটিবি’র। সেখানে কোন লাইন বাদ পড়লো, কোন শব্দ যোগ বাদ পড়লো বা বানান ভুল হলো এর পুরো দায়িত্ব এনসিটিবির। তারা কোনো ভুল করলে তাদের শাস্তি দেয়ার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এখানে সব কর্মকর্তার পোস্টিং দেন তারা। তাদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই আমাদের। এই অবস্থায় পাঠ্যপুস্তকে যে ভুল ধরা পড়েছে তার দায়-দায়িত্ব এনসিটিবিকে নিতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দোষারোপ করছেন প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। তাদের অভিযোগ, কারিকুলার অনুমোদন করেই দায়িত্ব শেষ করতে চান তারা। এরপর প্রুফ দেখাসহ নানা কাজ থাকে যেগুলোতে কোনো ধরনের সহযোগিতা প্রাথমিক মন্ত্রণালয় করে না। এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রতি বছর যে বই ছাপায় এনসিটিবি তার প্রায় অর্ধেক প্রাথমিকের। কিন্তু এনসিটিবিতে আমাদের বিষয় বিশেষজ্ঞ লোক নেই। তিনি বলেন, এনসিটিবির প্রাথমিক শাখার ২৪টি পদের মধ্যে ২০টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দখলে। অর্থাৎ আমাদের যোগ্য লোক থাকার পরও সেখানে যেতে পারছেন না শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতার কারণে। এই অবস্থায় দায়ভার আমরা কেন নেব? তবে বইয়ের যেসব ভুল ধরা পড়েছে তাতে আমরা বিব্রত। এনসিটিবির সূত্রে জানা গেছে, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক দুটি সম্পাদনা শাখায় রয়েছে। প্রাথমিক উইং ২৪টি পদের বিপরীতে মাত্র চারজন কর্মকর্তার জায়গা হয়েছে। বাকি পদগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় দখল করে রেখেছে। প্রাথমিক স্তরের বইয়ের সম্পাদন করার জন্য কাউকে দেয়ার সুপারিশ করলে সেটাও বাতিল হয়। উদাহরণ দিয়ে তারা বলেন, ঝিনাইদহের পিটিআই সুপার সালমা নার্গিস (বর্তমানে রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন প্রকল্পের উপ-পরিচালক) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠ্যক্রমের উপরে ডক্টরেট করেছেন। তাকে এনসিটিবির প্রাথমিক উইং এ নিয়োগ দিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতামত চাইলে তারা তা নাকচ করে দেয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের মতো করে অযোগ্য লোকদের এখানে বসিয়েছে শুধু তাদের (কর্মকর্তাদের) ঢাকায় থাকার জন্য। এনসিটিবিতে প্রাথমিক মন্ত্রণালয় শুধু নিধিরাম সর্দার। অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় দেরিতে পাণ্ডুলিপি জমা দেয়ার তা যাচাই-বাছাই না করেই ছাপাখানায় পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন তারা। দেরিতে পাণ্ডুলিপি দেয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে গিয়াস উদ্দিন বলেন, প্রাথমিকের বই ছাপানোর সঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও কিছু জটিলতা ছিল। এজন্য পাণ্ডুলিপি জমা দিতে একটু দেরি হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, যা বলার মন্ত্রী বলছেন।
এনসিটিবির সিন্ডিকেট ভাঙ্গার দাবি: এনসিটিবিতে শক্ত একটা সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞতা নেই অথচ বছরের পর বছর এখানে পড়ে রয়েছেন। এর মধ্যে অনেকেই শুধু ঢাকায় থাকতে এজন্য এনসিটিবিতে ওএসডি বা প্রেষণে কাজ করছেন ডজনখানে কর্মকর্তা। তাদের কোনো কাজ নেই অথচ কাজ জানা লোক তাদের জন্য এখনে আসতে পারছে না। সোমবার বইয়ের ভুলের দায়ে ওএসডি হওয়ার এসটিসির প্রধান সম্পাদক প্রীতিশ সরকার ও ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ লানা হুমায়রা খানকে ওএসডি ও আর্টিস্ট কাম ডিজাইনার সুজাউল আবেদিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ। অর্থাৎ এই বিষয়ে অভিজ্ঞ না হওয়ার পর অধ্যাপক প্রীতিশ সরকার ও লানা হুমায়রা এখানে কাজ করতেন। তারা ছাড়াও আরো ডজনখানে কর্মকর্তা আছেন যাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু বহাল তবিয়তে আছেন এখানে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওএসডি হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ২০১০ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বেসরকারি কলেজ শাখার উপ-পরিচালক। আওয়ামী লীগ দলীয় একজন এমপির আত্মীয়ের কাছ থেকে এমপিওভুক্তির জন্য পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ায় ওই এমপি প্রীতিশের বিরুদ্ধে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেন। তাৎক্ষণিক ওএসডি করা হয় প্রীতিশকে। তারা বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ঢাকার বাইরের একটি কলেজে বদলি করা হলে কয়েক মাসের মধ্যে আবার চলে আসেন এনসিটিবির ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ হিসেবে। তৎকালীন প্রধান সম্পাদক প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেলে ২০১৩ সালে প্রধান সম্পাদক পদে আসীন হন প্রীতিশ। লানা হুমায়রা আওয়ামী লীগ দলীয় একজন নেতার মেয়ে ও ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী। ঢাকায় থাকা জরুরি, তাই তাকে ঢাকায় রাখার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে পদায়ন করা হয়েছে।
সূত্র বলছে, পাঠ্যবইয়ের কারিকুলাম তৈরি, রচনা, মুদ্রণ-এসব টেকনিক্যাল কাজের সঙ্গে অতীতে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলে এসব কর্মকর্তা এখানে দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু ঢাকায় থাকতে লবিং করে এখানে পোস্টিং নিয়েছেন। এনসিটিবির নিয়োগের ক্ষেত্রে পাঠ্যবই সংশ্লিষ্ট পূর্ব অভিজ্ঞতা আমলে নেয়া হতো বিধি থাকলেও গত তিন মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে সেটি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। যারা কর্মজীবনে কখনোই এনসিটিবিতে চাকরি করেননি, এমন লোকেরা পর পর তিন দফায় চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন। আবার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে করতেই তাদের অবসরে চলে যেতে হয়েছে। এ কারণে নির্ভুল পাঠ্যবই মুদ্রণের বিষয়টি বারবারই হোঁচট খাচ্ছে।

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন