নিজভূমে পরবাসী চা শ্রমিকরা

বাংলারজমিন

রাজীব দেব রায় রাজু, মাধবপুর (হবিগঞ্জ) থেকে | ১১ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার
দু’টি পাতার একটি কুঁড়ির বিভাগ সিলেট। ১৫৬টি চা বাগানের মধ্যে ১২০টির অবস্থান এই বিভাগে। আর এসব বাগানে ১৮০ বছর ধরে বসবাস করছেন চা শ্রমিকরা। সংগ্রামী পেশার এই শ্রমিকরা সকাল-সন্ধ্যা সারাদিন রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করেন বাগানে। বেতন মাত্র প্রতিদিন হাজিরা ৮৫ টাকা। সঙ্গে  রেশন সপ্তাহে ৩ কেজি আটা অথবা চাল দেয়া হয়। এই অল্প তলব/রেশন দিয়ে তাদের জীবন অতি কষ্টে চলে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানীয় জলসহ নানা অভাব অনটনের মধ্যে চলছে এই সংগ্রামী জনগোষ্ঠী। চা বাগানে বসবাস করলেও তারা যেন নিজ ভূমে পরবাসী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চা শ্রমিকদের ভোটাধিকার দিয়ে দেশের স্বাধীন নাগরিক করলেও ভূমি অধিকারের ক্ষেত্রে তারা এখনও পুরোপুরি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছেন না।  সমপ্রতি চানপুর চা বাগানে অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিলে চা শ্রমিকরা আন্দোলনে গড়ে তোলে। ‘আমার মাটি আমার মা কেড়ে নিতে দিব না’ এই স্লোগানে চা শ্রমিকরা চানপুরে মহাসমাবেশ করে। এতে দেশের বহু জাতীয় নেতা অংশগ্রহণ করেন। চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকারের আইনগত জটিলতা রয়েছে। এই জটিলতা নিরসনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ১৯৫০ সনের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ফলে প্রজারা ভূমির উপর মালিকানা ফিরে পেলেও সেই আইনে তিন পার্বত্য জেলা ও চা বাগান এলাকার অধিবাসীরা এ আইনের আওতামুক্ত ছিল। যার কারণে চা বাগান এলাকায় চা শ্রমিকরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ভূমি ভোগ অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে। যে কারণে চা শ্রমিকরা ১৮০ বছর ধরে নিজ ভূমে এখনও পরবাসী। চা বাগানের অধিবাসীরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো পাকা ইমারত অথবা গৃহবাড়ি নির্মাণ করতে পারে না। বাগান এলাকায় কোনো সরকারি স্থাপনা বিশেষ করে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতেও নানা বিপত্তি রয়েছে। সারা দেশে  চা বাগানে দিন দিন চা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়লেও তাদের কর্মসংস্থানের পরিধি সংকোচিত হয়ে পড়েছে। যে কারণে হাজার হাজার নর-নারী কর্মহীন হয়ে দিন কাটাচ্ছে। যে সব শ্রমিক চা বাগানে কাজ করেন তারাই শুধু রেশন/তলব পেয়ে থাকে। এ টাকা দিয়ে চা শ্রমিকদের পুরো পরিবার চালানো তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। চা শ্রমিকদের খাওয়া দাওয়া ও আচার অনুষ্ঠানের মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। প্রায় ১৮০ বছর আগে অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে বৃটিশদের হাত ধরে চা শ্রমিকরা এ দেশে এলেও বিভিন্ন ভাষা গোষ্ঠীর মানুষ শত প্রতিকূলতার মধ্যে তাদের আচার অনুষ্ঠান পালন করার চেষ্টা করছে। একেক জনগোষ্ঠীর বিয়েশাদি, জন্ম-মৃত্যুর আচার অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের। খাবারের বৈচিত্র্য রয়েছে। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে একজন নারী শ্রমিক পরিবারে জন্য খাবার প্রস্তুত করেন। সকাল ৯টায় ঘর থেকে বের হয়। খাবার বলতে লাল চা, শুকনো রুটি । যে নারী শ্রমিকরা চা বাগানে কাজে যান তারা সকালেই কিছু খাবার নিয়ে যান। দুপুরের সময় নারী শ্রমিকরা দল বেঁধে বাগানের ভিতরে খাবারের জন্য বসে পড়ে। এ খাবারের মধ্যে রয়েছে কচি কুঁড়ি চাপাতা, আলু, কাঁচা মরিচ, মুড়ি এগুলো একত্রিত করে কোনো রকম পেটের ক্ষুধা নিবারণ করেন। স্বাস্থ্য ও পুষ্টিজ্ঞান সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই বললেই চলে। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই এই সব সংগ্রামী জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে বেঁচে আছেন।   
চা শ্রমিকদের বসবাস খুবই অস্বাস্থ্যকর। বাগানের দেয়া কুঁড়েঘরে চা শ্রমিকরা একত্রে বসবাস করেন। প্রতি বছর শ্রমিকদের গৃহ নির্মাণের জন্য চুক্তিপত্র থাকলেও মালিকপক্ষ ও সরকার তাদের দাবির প্রতি উদাসীন। চা বাগান এলাকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় চা শ্রমিক সন্তানরা অনেকেই শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে। বাগান এলাকায় সরকারিভাবে হাসপাতাল না থাকায় চা শ্রমিকরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাগান পরিচালিত স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও এর পরিসেবা খুবই সীমিত। জগদীশপুর চা বাগানের শ্রমিক নেতা সাধন সাঁওতাল জানান, চা বাগানে শ্রমিকদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু অভাবে পড়ে তাদের ভাষা ,সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। এগুলো রক্ষায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।  বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা হবিগঞ্জ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ও চা শ্রমিকের ভূমি অধিকার কমিটির নেতা স্বপন সাঁওতাল জানান, ৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে ভূমি শক্রু মুক্ত করতে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে চা শ্রমিকরা তীর-ধনুক নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অনেক শ্রমিক অংশগ্রহণ করেছে। বহু নারী সম্ভ্রম হারিয়েছেন। চা বাগানের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বীরাঙ্গনা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পর স্বাধীন দেশে  সকল মানুষ ভূমি অধিকার পেলেও চা শ্রমিকরা ভূমি অধিকার পাননি।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন