কবি ইরিনা যেভাবে মুক্তি পেলেন

রকমারি

| ৮ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:০৫
তিরিশ বছর আগে রাশিয়ার সশ্রম কারা শিবির থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন ভিন্নমতাবলম্বী কবি ইরিনা রাতুশিনস্কায়া। কবিতা লেখার জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিল কারা শিবিরে।
বিবিসির কাছে সেসময়কার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ইরিনা বলেন কবিতা লিখতে শুরু করার পর থেকেই তিনি জানতেন যে তার মৃত্যু অবধারিত।
রুশ গুপ্তচর সংস্থা কেজিবি যখন ইরিনাকে আটক করে তখন তার বয়স ২৮।
তার নিজের শহর ওদেসায় যখন ইরিনা ছাত্রী ছিলেন, তখন কেজিবি তাকে মেয়েদের একটি দলে যোগ দিতে বলেছিল। ওই দলের মেয়েদের কাজ ছিল বিদেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা এবং তাদের সম্পর্কে খবরাখবর কেজিবিকে পৌঁছে দেওয়া।
ইরিনা সে কাজ করতে চাননি।
"এটা ছিল অনেকটা একধরনের যৌনকর্মী হিসাবে কাজ করার মত -দেহব্যবসা করে গুপ্তচরবৃত্তি। আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছিলাম আমি সহযোগিতা করতে পারব না। তখন থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম কেজিবি - আজ হোক‌- কাল হোক- আমার পিছনে লাগবে।"
ইরিনা পড়াশোনা করেছিলেন পদার্থবিদ্যা নিয়ে। এবং কিছুদিন প্রাথমিক স্কুলে পড়িয়েওছিলেন। কিন্তু তার প্রথম প্রেম ছিল কবিতা।
ইরিনা ঘরে বসে কবিতা লিখতেন- লিখতেন প্রেম, সৃজনশীলতা আর তার খ্রিস্টান ধর্মবিশ্বাস নিয়ে। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সরকারি লেখক তিনি হবেন না- অর্থাৎ যারা কম্যুনিস্ট পার্টির অনুমোদনপ্রাপ্ত লেখক - তাদের দলে তিনি যোগ দেবেন না। ফলে তার কবিতা ছাপানোর কোন সুযোগ ছিল না।সোভিয়েত ইউনিয়নে সরকারের কড়া সেন্সরশিপ ছিল ।
"আমি কখনও তা ভাঙতে চেষ্টাও করিনি। কিছু লোক ছিল -যাদের বলা হতো সামিযদাৎ- এরা সেন্সরশিপের কড়াকড়ি এড়াতে হাতে লিখে নিজেদের পছন্দের কবিতা বা সাহিত্য চারিদিকে ছড়িয়ে দিত। আমি তাদের দলে পড়ে গেলাম- কাজেই আমাকে গ্রেপ্তার করার জন্য সেটাই হল যথেষ্ট।"
ইরিনা এবং তার স্বামী ইগর- যাকে ইরিনা চিনতেন ছেলেবেলা থেকে- তারা দুজনেই প্রখ্যাত সোভিয়েত পরমাণু পদার্থবিদ আন্দ্রেই সাকারফের মুক্তির জন্য গোপনে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন।
এর দুবছর পর, ১৯৮২র সেপ্টেম্বর মাসে কেজিবি ইরিনাকে খুঁজতে শুরু করে।
তারা যখন তাদের গ্রামে ছিলেন আপেল চাষের কাজে, তখন সেখান থেকে কেজিবির লোকজন তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। প্রথমে কেজিবির দপ্তরে, পরে সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়ে কিয়েভের জেলখানায়।
"সেখানে নিয়ে ওরা আমাকে ক্ষমা চাইতে বলেছিল, বলেছিল তুমি তোমার ধর্মবিশ্বাস ত্যাগ করো- প্রতিজ্ঞা করো আর কখনও কবিতা লিখবে না- কখনও কারও মানবাধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন করবে না। আমি কেজিবির কথার কোন জবাব দিই নি। এরপর যখন ওরা তদন্ত চালাল- তখনও আমি কোনো কথা বলিনি।"
ইরিনা রাতুশিনস্কায়ার বিরুদ্ধে সোভিয়েত বিরোধী আন্দোলন ও প্রচারণার অভিযোগ আনা হয়।
তিনি বলছেন তিনি কখনও রাজনীতি নিয়ে কবিতা লেখেন নি। কিন্তু যেহেতু তার কবিতায় ঈশ্বরের উল্লেখ ছিল, কিন্তু সোভিয়েত শাসকদের কোনো উল্লেখ ছিল না, তাই কর্তৃপক্ষের কাছে এসব কবিতা ছিল সোভিয়েত বিরোধী।
১৯৮৩-র মার্চ মাসে ইরিনাকে বিচারের জন্য তোলা হয় আদালতের কাঠগড়ায়- তার ২৯ বছরের জন্মদিনে।
ইরিনাকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়। বারাশিভোর সশ্রম কারা শিবিরে ৭ বছরের কারাদণ্ড - এরপর দেশের ভেতর ৫ বছরের নির্বাসন। মস্কোর তিনশ মাইল দক্ষিণে বারাশিভোর কারা শিবির তৈরি করা হয়েছিল স্টালিনের আমলে।
সেখানে জীবন ছিল খুবই কঠিন- তাপমাত্রা শূণ্যের নিচে- তুষারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হতো ঘন্টার পর ঘন্টা। আর খাওয়াদাওয়াও ছিল সামান্যই।
"খাবার এমনভাবে দেওয়া হতো যাতে কখনই তা যথেষ্ট না হয়। আমি আর আমার বান্ধবীরা যখন মূল ব্যারাকে ছিলাম, তখন আমাদের ড্যান্ডিলায়ন নামে একধরনের আগাছা খেতে দেওয়া হতো। একদিক দিয়ে সেটা মন্দ ছিল না- কারণ আর কোনো তাজা সব্জি বা ফল আমাদের দিত না- দিত শুধু রুটি আর স্যুপ। স্যুপ বলতে প্রচুর জলের মধ্যে শুধু ময়লা মাছের ক'টা টুকরো।"
ছেলে রাজনৈতিক বন্দীদের মধ্যে চারভাগের একভাগই ওই কারাশিবিরের জীবন সহ্য করতে না পেরে মারা যায়।
কারাবাসের দিনগুলোতে ইরিনা গোপনে কবিতা লিখতেন- বিপদ জেনেও। সাবানের উপর দেশলাই কাঠি দিয়ে তিনি লিখতেন-তারপর তা মুখস্থ করে সাবানের লেখা ধুয়ে ফেলতেন।
"আমার স্বামী বিশেষ কাগজে- রাইস পেপারে- আমাকে চিঠি লিখতেন। কাগজটা বেশ শক্ত হলেও পাতলা ছিল। আমি তার কোণাগুলো কেটে তাতে কবিতা লিখে গোপনে বাইরে পাঠিয়ে দিতাম। বেশ কিছু লোক আমাকে সাহায্য করত।"
ইরিনা বলেছেন সোভিয়েত সশ্রম কারা শিবিরের অন্ধকার সেই দিনগুলোতে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল তার কবিতা।
"আমার অবশ্যই কবিতা লেখার অনুমতি ছিল না। যদি ধরা পড়তাম, আমার সাজা আরও দশ বছর বাড়িয়ে দেওয়া হতো। যে সেলে আমাকে বন্দী রাখা হয়েছিল সেটা ওরা প্রায় প্রতিদিন তল্লাশি করত। কাজেই আমাকে খুব সাবধান থাকতে হতো।"
চারবছর কারাবাসের সময় ইরিনা লিখেছিলেন দুশো থেকে আড়াইশ কবিতা। এগুলোর মধ্যে তিনি বন্দী থাকাকালীনই বেশ কিছু কবিতা ছাপা হয়েছিল পশ্চিমে।
"আমি কবিতাগুলো গোপনে বাইরে পাচার করে দেবার পর কী হয়েছিল আমি জানতাম না। কাজেই যখন জানলাম আমার কবিতাগুলোর ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে ছাপা হয়েছে, আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম।"ওই কবিতার বই প্রকাশ পাবার পর ইরিনার মুক্তির জন্য পশ্চিমে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।
১৯৮৬র অক্টোবরে গ্লাসনস্তের নতুন আদর্শ সামনে নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের নতুন নেতা মিখাইল গর্বাচফ রেইকাভিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রেগানের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বৈঠকে বসার আগে ঘোষণা করেন যে তিনি ইরিনা রাতুশিনস্কায়াকে মুক্তি দেবার নির্দেশ দিয়েছেন।
"পরে জেনেছিলাম আমার ব্রিটিশ বন্ধু আমার মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছিলেন- হাজার হাজার মানুষ আমাকে বড়দিনে জেলে কার্ড পাঠিয়েছিল। আমি অবশ্য সেসব কার্ড হাতে পাইনি। কিন্তু কেজিবি কার্ডের সংখ্যা দেখে হয়ত ভেবেছিল এত লোক আমার বন্দী হওয়ার খবর জানে! তাই হয়ত মুক্তি দেওয়াই ভাল!"
মুক্তি পাওয়ার পর সাহায্য ছাড়া ইরিনা হাঁটতে পারতেন না।
তিনি তাঁর স্মৃতিকথা লিখেছিলেন গ্রে ইস দ্য কালার অফ হোপ নামে- আশার রং ধূসর।
বইটিতে অন্য বন্দীদের মুক্তির প্রচারণা চালিয়েছিলেন ইরিনা। ১৯৯১ সালে সব বন্দীকে মুক্তি দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।
চিকিৎসার পর ইগর আর ইরিনার দুই যমজ ছেলে হয়েছিল। তারা প্রথমে আমেরিকা, পরে ইংল্যান্ডে কিছুদিন থাকার পর ১৯৯৮ সালে ফিরে যান মস্কোয়।
ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্ব পরিবেশন করেছেন মানসী বড়ুয়া।

সুত্রঃ বিবিসি বাংলা
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন