নাসিক নির্বাচন: ভেতর থেকে দেখা

মত-মতান্তর

মো. নুরুজ্জামান তালুকদার | ৪ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার
২২ ডিসেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার। নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি  উল্লেখযোগ্য দিন বলা যায়। কারণ, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই দিনে। এই নির্বাচনের পরের  কয়েকদিন বিশেষ করে ২৩, ২৪, ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত দৈনিক কাগজের অনেকগুলি আমি সংগ্রহ করেছিলাম, সবগুলোতেই নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। ভালো লাগার মতো অনেক প্রশংসা বাণী আছে যাতে করে আগামিতে আরো বেশি আগ্রহ ভরে কাজ করবেন নির্বাচন কর্মকর্তারা-সন্দেহ নেই। কঠিন পরিশ্রম করে কাজ করলে প্রশংসা পেতে কার না ইচ্ছা করে? আর আমার জন্য এতটুকু প্রশংসা অনেক বড়।
কারণ, নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ এই নির্বাচন পরিচালনার জন্য আমাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ভেতর থেকে যেভাবে দেখেছি, সে ভাবেই লিখছি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটের দিন এবং আগের রাতে টানা হেঁচড়া করে অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার প্রবণতা বেশ কিছু নির্বাচন থেকে পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে তা সামান্য, কিছুকিছু এলাকায় এবং কিছু কিছু প্রার্থীর দ্বারা হয়েছে। এগুলো আগেই অনুমান করা যায়। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলার বাহিনীর স্বল্পতা, কেন্দ্রের স্থায়ী নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তা রক্ষার কৌশল ও সমন্বয় না থাকা, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাগণ নিরাপত্তা কৌশল না জানায় ভালো ভোটগ্রহণ কখনও বা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এর কোনটিও হতে দেওয়া হয় নাই। ভোটকেন্দ্রে একটি মাত্র প্রবেশ ও বাহির পথ স্থাপন, পর্যাপ্ত চেকিং, ভোটের আগের দিন সন্ধ্যার পর ভোটকেন্দ্রের বাইরের কাউকে কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা, কেন্দ্রে নিয়োজিত বাহিনী আগের রাতে আংশিক বা পালাক্রমে দায়িত ¡পালন করবেন, যেন ভোটের দিন পূর্বের রাত জাগার ক্লান্তি ভর না করে, ভোটের দিন কোন কক্ষে কেউ ব্যালট পেপারে অবৈধ হস্তক্ষেপ করলে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা তা প্রতিরোধকরবেন এবং জোরে চিৎকার করে আইনশৃংখলা বাহিনীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন এবং প্রয়োজনে দুস্কৃতকারীদের পেছনে ধাওয়া করে আইনশৃংখলাবাহিনীকে চেনাতে সহায়তা করবেন ইত্যাদি বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছিল। মোট কথা সাহস এবং সমন্বয়ের জন্য সংশ্লিষ্টদের যেভাবে অনুপ্রাণিত করে চেয়েছিলাম সেভাবেই কাজ হয়েছে।
যে কোন নির্বাচনেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীগণকে আস্থায় রাখা রিটার্নিং অফিসারের অবশ্য কর্তব্য। কাজে এবং কথায় ২০১ জন প্রার্থীকে আমার আস্থায় রাখার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছি এবং তা পেরেছি। প্রার্থীগণকে বলেছিলাম বেআইনি কাজ করলে কাউকেই রেহাই দেওয়া হবেনা এবং আমিও রেহাই পাবোনা। মিছিল করা আচরণবিধিমালার পরিপন্থী। শুধু প্রার্থীদের সংগে কথা বলেই কয়েকটি মিছিল থামাতে এবং নি:শব্দ করতে পেরেছিলাম।
এই নির্বাচনে আমি সরব থাকার চেষ্টা করেছি। কারণ অনেকগুলি অমূলক, ভিত্তিহীন অভিযোগের শিকড় গভীরে প্রোথিত হয়েছে যেগুলি কিনা ভালো নির্বাচনকেও সন্দেহযুক্ত করে এবং অনেকক্ষেত্রে সাধারণ ভোটারগণকে বিভ্রান্ত করে। যেমন আরচণবিধিমালা ভেঙ্গে দোয়া চাওয়া, টাকা দিয়ে ভোট কেনা এবং সবার অজান্তে লুঙ্গি-শাড়ী দিয়ে ভোটকেনা ইত্যাদি। আমার কাছে যখনই কেউ এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন বা জানতে চেয়েছেন তৎক্ষণাৎ আমি বলেছি আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থায় দোয়ায় কাজ হয় না। ব্যালট পেপারে গোপনে সীল দিয়ে ব্যালট বাক্সে ফেললেই কেবল ভোট দেওয়া বুঝায়। এমনকি দেশের ১৬ কোটি মানুষও যদি কোন প্রার্থীর জন্য দোয়া করেন কিন্তু নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ভোট না দেন, তবে আসল কাজের কাজটি হবেনা। ব্যালট পেপার থাকে রিটার্নিং অফিসারের নিকট এবং ভোটের দিন প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে, পক্ষান্তরে ভোটার ভোট দেবেন গোপন পদ্ধতিতে। কাজেই ভোট কেনা বা বেচার ভিত্তিহীন অভিযোগ দীর্ঘদিন বাতাসে ভাসছে এবং তা বাতাসেই মিলিয়ে যাবে আশা করি। কিছু কিছু মৌখিক বা লিখিত অভিযোগ পেয়েছিলাম যে লুঙ্গি-শাড়ি বিতরণ হচ্ছে। যেহেতু ঘটনা সবার অজান্তে কাজেই অভিযোগকারীই বা বিষয়টি জানলেন কিভাবে। ভিত্তিহীন আপত্তিগুলির পেছনে দৌড়ঝাঁপ করে খুব একটা লাভ হয়না। টাকা বা ক্ষমতা থাকলেই যে একজন ভোটারের ভোটাধিকার (সর্বোচ্চ নাগরিক অধিকার) কেনা উচিৎ নয় এবং এরূপ চেষ্টা করা জঘন্য অপরাধ, তা প্রার্থীদের সম্মেলনে অনেকবার বলেছি, হয়তো আমার কথা দু’একজন মেনেছেন- এটিই মূলত কাজের কাজ।
    আমাদের দেশের জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোর ফলাফল নির্ধারণ পদ্ধতি একই- সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ফার্স্ট পাস্ট দি পোস্ট বা সংক্ষেপে এফপিটিপি। একজন প্রার্থী পেলেন ১ লক্ষ ভোট আরেকজন ১ লক্ষ ১টি। পরেরজনই জিতবেন। প্রার্থীদেরকে সাহসী হতে বলেছিলাম। সাহসী প্রার্থীগণই কেবল এফপিটিপিতে অংশ নিতে পারেন। প্রার্থীরা শুনেছেন, পরাজয় মেনে নেওয়ার সাহস দেখিয়েছেন। এজন্য নির্বাচন পরবর্তী ঝুটঝামেলা নাই বললেই চলে। বিজয়ী প্রার্থীগণ মিষ্টি নিয়ে পরাজিত প্রার্থীদের বাড়িতে গেছেন, কুশল বিনিময় করেছেন, মহানগরীর উন্নয়ন কাজে সহায়তা চেয়েছেন, অন্যদের কাছ থেকে সহায়তার অংগীকার পেয়েছেন এবং তা সবই প্রকাশ্যে। আশাকরি অংগীকার বাস্তবায়িত হবে, নারায়নগঞ্জ মহানগরবাসীর মুখে হাসি ফুটবে।
    সম্মানিত ভোটারগণকে সাহসী হতে বলেছিলাম, ভোটের দিন উৎসবের দিন হিসাবে উদযাপনের জন্য আহ্বান করেছিলাম। একাজে অনেক হাজার লিফলেট মুদ্রণ করে আমি এবং আমার সহকর্মীরা যতখানি সম্ভব ভোটারগণের কাছে গেছি। মহিলা ভোটারগণকে ভোটের দিন সাংসারিক কাজের তালিকা খুবই কম রাখতে বলেছিলাম। বলেছিলাম ভয় নাই, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রাখার জন্য যা করা দরকার তাই করবো। প্রয়োজনে ছোট ছোট দল বেঁধে ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য ভোটারগণকে যে আহবান করেছিলাম তার সবগুলোই কাজে লেগেছে। শুধু প্রার্থীদের নয়, ভোটারগণকেও আস্থায় রাখতে পেরেছি। পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরেছি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকায় অতিবৃদ্ধ এবং শারিরীক প্রতিবন্ধীরাও ভোটদিয়েছেন। পত্রিকার ছবিগুলি দেখে আনন্দে কেঁদেছি। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সবসময়ই কামনা করি।
    পরিশেষে বলবো, নির্বাচন অনেকটা যুদ্ধের মত। কেউ একা জেতেনা এবং কেউ একা হারেও না। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিক ছিলেন, প্রবল ইচ্ছা ছিল বড় কাজের অংশীদার হবার। পরে পত্রিকার সম্পাদকীয়তেও লেখা হয়েছে ‘সদিচ্ছার জয় হয়েছে’। যে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার জন্য আমরা নির্বাচন কর্মকর্তারা প্রস্তুত আছি। আপনারা সবাই সদিচ্ছা দেখাবেন তো?

লেখক: উপ-সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আন্তর্জাতিক নির্বাচনী দায়িত্বে কম্বোডিয়া (১৯৯৩), কসোভো (২০০০), শ্রীলংকা (২০০৪), লাইবেরিয়া (২০০৫) ও অষ্ট্রেলিয়ায় (২০১২) কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এ কর্মকর্তার।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

কানাডার উন্নয়নমন্ত্রী আসছেন মঙ্গলবার

ব্যক্তির নামে সেনানিবাসের নামকরণ মঙ্গলজনক হবে না: মওদুদ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহায়তার প্রস্তাব জাপানের

পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে নাম আসা ব্যক্তিদের তথ্য প্রকাশের দাবি সংসদে

সমাপনীতে অনুপস্থিত ১৪৫৩৮৩ শিক্ষার্থী

ঈদ-ই মিলাদুন্নবি ২ ডিসেম্বর

দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য তারেক রহমানকে দরকার: এমাজউদ্দিন

দল থেকে বরখাস্ত মুগাবে

দেখা হলো, কথা হলো কাদের-ফখরুলের

আখতার হামিদ সিদ্দিকী আর নেই

ইইউ প্রতিনিধি ও তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন

‘এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই’

নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে না শেখ হাসিনার সরকার-নৌ মন্ত্রী

‘আমি ব্যবসায়িক প্রতিহিংসার শিকার’

সেনা মোতায়েন নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি : সিইসি

২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!