উৎসবের অর্থনীতি

মত-মতান্তর

নূরুদ্দিন মোহাম্মদ (শহীদ) | ২১ ডিসেম্বর ২০১৬, বুধবার
বলা হয়ে থাকে- বাংলাদেশ উৎসবের দেশ । বার মাসে তের পার্বণ । ঈদ, পুজা, বড় দিন, বৈশাখী মেলা, চৈত্র সংক্রান্তি ইত্যাদি । এসব উৎসবের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে অর্থনৈতিক গুরুত্ব ।আমাদের অর্থনীতি অনেকাংশে আবর্তিত হয় এসব উৎসবকে ঘিরে । নানান ধরনের ধর্মীয় কর্মকান্ডসহ বিয়ে, বৌভাত, সামাজিক অনুষ্ঠানাদি সমাজ কাঠামোর অত্যাবশ্যকীয়তার পাশাপাশি বিপুল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞও সংঘঠিত হয়।

সম্প্রতি দূর্গাপূজা উপলক্ষে বনিকবার্তায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে মোট ৫০,০০০/- পূজা মন্ডপে যদি অনুন্য ১,৫০,০০০/- টাকা খরচ ধরা হয় তাহলে টাকার অংক দাঁড়ায় ৭৫০ কোটি টাকা। মজার বিয়য় হচ্ছে; এটি শুধু মাত্র মন্ডপের খরচের হিসাব করে বলা হয়েছে ।
প্রকৃত মন্ডপের খরচ কিন্ত এর চেয়ে অনেক বেশী হবে; যথা: প্রতিমা তৈরি, অলংকার, আনুসাঙ্গিক খরচ, মজুরী, মন্দিরের পুরোহিত সহ অন্যদের খাবার-দাবার, ডেকোরেশন এবং যাতায়াত সব হিসাব করলে এর পরিমান ২/২.৫ লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে ।তাতে প্রকৃত টাকা প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা হবে।

কথা হচ্ছে, এটাই কি পূজা উপলক্ষ্যে খরচ ? অবশ্যই না । পূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের পরিবারের সদস্যদের জন্য পোষাক-আষাক, ঘর-দোর সাজানো, নিজেদের খাবার-দাবার, অতিথি আপ্যায়ন সব মিলে গড়ে মোট অর্থনৈতিক প্রবাহের পরিমান ৩/৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে । যার সাথে জড়িত রয়েছে মুদি দোকান, পান দোকান, অলংকার ব্যবসা, কাপড় ব্যবসা, গাড়ি-ঘোড়া, মিষ্টি দোকান, মাছ-মাংস, খাবার হোটেল সহ খুচরা-পাইকারী ও আড়ৎদার। আরও রয়েছে নানা ধরনের হকার । সব মিলিয়ে এলাহী কর্মকান্ড।

ঠিক একইভাবে হিসাব করলে বুদ্ধপূর্নিমা, খ্রীষ্টানদের বড়দিন কিংবা মুসলিমদের দুটি ঈদ সহ চৈত্র সংক্রান্তি, ১লা বৈশাখ, ইংরেজী নববর্ষ, পিঠা উৎসব, নবান্ন ইত্যাদি উৎসব কেন্দ্রিক লক্ষ-কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেন-দেন হচ্ছে ।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে এসব অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সুবিধাভোগী কারা ? শুধু কি নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায় ? নাকি সকল শ্রেনী, পেশা, ধর্ম-বর্ণের মানুষ ? সরকারের কি এক্ষেত্রে কোনই লাভ বা ভূমিকা নেই ? কিংবা দেশের অর্থনীতিতে এর কোন ভুমিকা নেই?

কিংবা ধরা যাক; মুসলিমদের সবচেয়ে বড় দু’টি উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ।  আমার নিজের অভিজ্ঞতাই শেয়ার করি। ঈদুল ফিতর বা রোযার ঈদে কাপড় কিনতে গিয়ে কিছু হিন্দু মহিলাদের দেখা পেলাম দোকানে । জিঙ্গাসা করলাম, ”বৌদি আপনারা এখন কেন কাপড় কিনছেন”? হেসে জবাব দিল, ”ঈদ উপলক্ষে যত মডেলের শাড়ী, থ্রি-পিছ বাজারে আসে অন্য সময় তেমন আসে না । তাই পরিবারের পুরো বছরের কাপড় চোপড় সহ পূজার জন্যও শপিংটা এ সময় সেরে ফেলি । দামও থাকে হাতের নাগালে”।  আরেকটি বিষয় এক্ষেত্রে প্রণিধান যোগ্য, এসব জিনিষের বিক্রেতাও কিন্তু সব মুসলিম নন। খুচরা, পাইকারী বিক্রেতা, মিল মালিক-শ্রমিক, হকার, মধ্যস্বত্বভোগী সহ সর্ব পর্যায়ে সব ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেনী-পেশার মানুষ জড়িত।

উপরোক্ত বর্ণনার মাধ্যমে এটা নিশ্চয়ই আমরা স্বীকার করবো যে, যে কোন একটি উৎসব বা উপলক্ষ্য কোন বিশেষ গোত্র, ধর্ম বা বর্ণ বা কোন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করলেও উৎসবের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ দেশের সকল জনগোষ্ঠী ভোগ করে। খুচরা বিক্রেতা, পাইকারী বিক্রেতা, মধ্যস্বত্বভোগী, উৎপাদনকারী, পরিবহন, শ্রমিক-মালিক সহ সকলেই এর সাথে জড়িত থাকে।  আর উৎপাদন বৃদ্ধি মানে আধিক কাঁচামাল, আরো কিছু গোষ্ঠী বা কাঁচামাল উৎপাদনকারী জড়িত হওয়া। সরকারের কোষাগারে অধিক রাজস্ব। সব কিছু অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
 
অর্থনীতির হিসাবে বলতে গেলে, খুচরা পর্যায়ে বিক্রি বাড়লে পাইকারী বিক্রিও বাড়বে । ফলে মিলে উৎপাদন বাড়বে-ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে-আমদানী-রপ্তানী বাড়বে-সরকারী কোষাগারে রাজস্ব বাড়বে। পুন: উৎপাদন, পুন: রাজস্ব । একটি চক্রাকার হিসাবে সকল পর্যায়ে সুবিধা পাচ্ছে। এবং রাষ্ট্র নিজেও এর মাধ্যমে চক্রাকারে রাজস্ব আহরণ করছে। আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রাজস্বের গুরুত্ব আমরা নিশ্চয়ই হাড়ে হাড়ে উপলব্দি করতে পারছি।

তাছাড়া, রোযা উপলক্ষে চাল, ডাল, তেল, চিনি, ছোলা, মাছ-মাংস, তরিতরকারী, সেমাই,
খেজুর, ফল-ফলাদি সহ হরেক রকমের পণ্যের সরবরাহ ও বিক্রি উভয়ই বাড়ে। শুধু বাড়ে বললে কম বলা হবে, রীতিমত ফুলে-ফেঁপে উঠে। ফলত: সেই একই হিসাব;  বেশী বিক্রি, বেশী ব্যবসা, বেশী রাজস্ব, বেশী কর্মসংস্থান।

কোরবানী ঈদের কথাই ধরি। সারা দেশে এবছর যদি ৫০,০০,০০০ পশু কুরবানী হয়ে থাকে; তার মধ্যে ৫,০০,০০০ ছাগল/ভেড়া, ৪৫,০০,০০০ গরু/মহিষ। অন্যান্য পশু অল্প সংখ্যক বিধায় হিসাব থেকে আপাতত বাদ দিলাম। আনুমানিক প্রতি ছাগল/ভেড়া ৭,০০০/-, প্রতি গরু/মহিষ ৫০,০০০/- হিসাব করলে টাকার অংক দাড়ায় ২৩,০০০ কোটি । এর সাথে রয়েছে হলুদ, মরিচ, আদা, মসলা ইত্যাদি। গরু পালন, মোটা-তাজা করণ, খড়-বিচালি, পরিবহন সহ সারাদেশে এ বিশাল কর্মযজ্ঞের সাথে কম করে হলেও ৫,০০,০০০ ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠান জড়িত । তার সাথে রয়েছে বিক্রির জন্য বাজার, ইজারাদার, পরিবহন ইত্যাদি । কুরবানীর দিনে কাজ করার জন্য মজুর, ছুরি-দা-বটি, হাঁড়ি-পাতিল, কাঠ, চট সহ নানা উপকরণের সরবরাহ । যার প্রত্যেকটির অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে । সব হিসাব করলে ৩০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে । তাছাড়া কুরবাণীর জন্য যে গরূ তা তো একদিনে বড় হয়না? আছে গাভী, তার রয়েছে দুধ। সে দুধ এর সরবরাহ মানে আরেকটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। সেটিকে অর্থনীতির টাকায় হিসাব না-ই বা করা হলো। এর সুবিধাভোগী মুসলিমরা যেমন রয়েছে; তেমনি সকল শ্রেনী-পেশার, ধর্ম, বর্ণের মানুষ জড়িত। কারন গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী শুধু মুসলিমরাই পালন করেনা। রয়েছে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং বেশী কর্মসংস্থান মানে বেশী রাজস্ব, গতিশীল অর্থনীতি। যদিও ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, দুর্গাপুজা প্রতিটি অনুষ্ঠানই একদিনের জন্য । কিন্ত এর পূর্বপ্রস্তুতি সহ আনুসাঙ্গিক কর্মকান্ডের ফলে অর্থনীতি সচল থাকে সারা বছর ব্যাপী । এর সাথে জড়িত থাকে ট্যানারী ব্যবসা, যা ঈদ উপলক্ষে সবচেয়ে বেশী চামড়া সংগ্রহ করে থাকে। সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঈদুল আযহা বা কুরবাণীর ঈদের তাৎপর্য কোনভাবেই ফেলনা নয়।

একই অবস্থা বাংলা নববর্ষ উপলক্ষেও হয়ে থাকে। শাড়ী-চুড়ি, গয়না গাটি, বিশেষ ধরণের পোষাক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের ফল-ফলাদি ক্রয়, ঘর-দোর সাজানো, মেলা, পার্বণ, খাবার দাবার, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ী বেড়াতে যাওয়া সব মিলিয়ে  যে বিশাল কর্মযজ্ঞ হয়; তার আর্থিক মূল্যমান হিসাব করলে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা।

এতো গেল অর্থনীতির হিসাব। এর বাইরে উৎসব উপলক্ষে সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। পরস্পরকে চেনা জানার সুযোগ বৃদ্ধি পায়। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের জোয়ার সৃষ্টি হয়। সারা বছরের তিক্ততা, ক্লেদ-গ্লানি ভুলে সকলেই আনন্দে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। সমাজ থেকে হিংসা বিদ্বেষ দূরীভুত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে এসব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানের আর্থ-সামাজিক গুরুত্বও কম নয়।

সুষ্ঠু, সুন্দর, গণতান্ত্রিক ও সহমর্মিতামূলক সমাজ গঠনে এসব অনুষ্ঠানাদি বিশেষ ভুমিকা রাখতে পারে। শুধুমাত্র বিশেষ না-বোধক দৃষ্টিকোন থেকে এর আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব উপলব্ধি করা যাবেনা। একে বুঝতে হলে প্রয়োজন উদার, গণতান্ত্রিক ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভংগী। হিংসা-বিদ্বেষমূলক মানসিকতা, কুপমন্ডুকতা কিংবা সাম্প্রদায়িক নাস্তিক দৃষ্টিভংগী এসব অনুষ্ঠানের মূল ভাবকে কলুষিত করবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মূল নিহিত রয়েছে এসব উৎসবে। তার সাথে রয়েছে বিয়ে-বৌভাত, জন্মদিন, বিবাহ-বার্ষিকী সহ নানা ধরণের পারিবারিক অনুষ্ঠানাদি। এদের কোনটিকে অস্বীকার করার জো নেই। শত শত বছর ধরে এদেশের সকল ধর্ম-বর্ণ, গোত্রের ও শ্রেণী-পেশার মানুষ একে অপরের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পারস্পরিক সহযোগীতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে বসবাস করে আসছে এবং এসব উৎসব অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে পালন করে আসছে। হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এ সংস্কৃতিকে আরও বেগবান করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের  বিকাশ ঘটানোর মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে আরও বেগবান করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে সকল দেশপ্রেমিক নাগরিক যথাযথ ভুমিকা পালন করতে পারেন।

The writer can be reached : nms1967@yahoo.com

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

মসজিদে গুলি ছোড়ার পর পাল্টে গেল এক মার্কিনীর জীবন

দৃশ্যপট একই

আয় বৈষম্য বাড়ায় চাপে মধ্যবিত্ত

নকলা উপজেলা চেয়ারম্যানের লাশ উদ্ধার

রিভিউর প্রস্তুতি

বাংলাদেশির বীরত্বে ধর্ষকদের হাত থেকে রক্ষা পেলো ইতালীয় তরুণী

ঢাবিতে ‘ঘ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁস?

সিলেট টার্মিনালে গুলিবর্ষণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি

রোহিঙ্গা স্রোত থামছে না

বড় দুই দলেই প্রার্থীর ছড়াছড়ি

সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবেছে চট্টগ্রাম

টানা বৃষ্টিতে নগরজুড়ে দুর্ভোগ

নিম্নমানের কাগজে ছাপা হচ্ছে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই

দিনে গড়ে দেড় হাজার মামলা

‘বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে’

পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে রোহিঙ্গাদের উপর আক্রমণ: মতিয়া চৌধুরী